কোনো একটি দেশ বা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যে কেউ নিজের রাষ্ট্রকে ভালোবাসেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে রাষ্ট্রে যে কটি ভাষা প্রচলিত থাকুক না কেন, প্রতিটি ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। যে কোনো একটি ভাষা-ই রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা বলে গণ্য হয়। আর সে কথার পরিপ্রেক্ষিতে যখন বুদ্ধদেব বসু বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক নই, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নই, আরাম কেদারায় বসেও রাজনীতির চর্চা আমি করি না। এবং আমার মধ্যে দেশপ্রেম নেই।’ কেউ যদি এভাবে নিজের দেশের প্রতি প্রেমে অনীহা প্রকাশ করেন কম বেশি বিভ্রান্ত না হয়ে পারি না। যার ভেতরে দেশপ্রেম নেই, তিনি কি তবে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে বিবেচিত হবেন না কোন যুক্তিতে? অবশ্যই লেখকের কথায় যথেষ্ট ভাবনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি। কবি বুদ্ধদেব বসু তাহলে রাষ্ট্রদ্রোহী? আর এ কথা জানার পর পাঠক নিশ্চয় নড়েচড়ে বসবেন। ‘ভাষা ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধের লেখক শুরুতেই কথাগুলো বলে ফেলেছেন। তারপরও প্রবন্ধটির বিস্তার ঘটেছে। যে কারণে কবিকে রাষ্ট্রদ্রোহীর অভিধায় অভিযুক্ত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কারও মুখে বা কারও লেখায় এমন কথার সন্ধান আছে কি না— জানি না। কবিকে কেউ অভিযুক্ত করেননি তা কবির প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসার কারণে? নাকি কবির মাতৃভাষা আর আমাদের মাতৃভাষা এক বলে? স্বজাত্য-বোধ কি তাহলে অন্ধ করে দেয় মানুষকে?
আসলে কবিকে অভিযুক্ত করতে যতগুলো যুক্তি উপস্থাপন সম্ভব তার চেয়ে দেশের প্রতি কবির প্রেম-হীনতার পক্ষেই আরও বেশি যুক্তি তুলে ধরা যায়। কারণ তিনি যখন তাঁর প্রবন্ধে বলেন—‘কাজের কথা, বুদ্ধির কথা, এমনকী হয়তো মনের কথাও কখনো কখনো অন্য ভাষায় বলতে পারি, কিন্তু প্রাণের কথা বাংলায় ছাড়া বলতে পারি না।’ কবির এ কথা শুনেই পাঠক আবারও দ্বিধান্বিত হবেন বোধ করি। হয়তো বিস্ময় গোপন করতে না পেরে বলেই উঠবেন, কথা তো তিনি মিথ্যে বলেননি এতটুকু!
আমরা বাংলাভাষা-ভাষীই শুধু নয়, যে কোনো ভাষা-ভাষীই যতক্ষণ নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারবেন ততক্ষণ তার বলার আকাঙ্ক্ষা মিটবে না। আমি নিজে বাংলাভাষী হলেও প্রবাসে যখন পশ্চিম বঙ্গের বাংলা ভাষা-ভাষীদের সঙ্গে কথা বলি, তখনই টের পেয়ে যাই ‘প্রাণের ভাষা’ ব্যাপারটি।
প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে যখন সৌদি আরবে আসি, তখন শুরুতেই কিন্তু বাংলাভাষী কাউকে পাইনি। আস্তে ধীরে পরিচিত হয়েছি অন্যান্য স্বদেশীদের সঙ্গে। কখনো অন্যরা এসেছেন আমার সঙ্গে পরিচিত হতে, কখনো বা আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে গেছি পরিচিত হতে। এর পেছনে মনে করি দেশপ্রেম নয়—ছিল ভাষাপ্রেমই। প্রাণ খুলে, মন উজাড় করে অবিরাম কথা বলার প্রশান্তিকর মুহূর্তের আশায়।
মাস খানেক পর আমার রুমে আরেক বাংলাদেশি এলো দূরের কোনো এক প্রজেক্ট থেকে বদলি হয়ে। সে ছিল আমারই জেলার মানুষ। আর আমাদের একই জেলা শুনতে পেয়েই যেন আরম্ভ করেছিল তার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। শুরুতেই সে জানালো—এমন এক জায়গায় সে ছিল, যেখানে প্রায় তিনমাস কোনো বাঙালির সাক্ষাত্ পায়নি। সে সময়গুলোয় তার মনে হচ্ছিলো যে, সে এভাবে আর বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারবে না। আরবি-হিন্দি-উর্দু-ইংরেজির মিশ্রণে এক খিচুরি ভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সে কোনোক্রমে টিকে ছিল বলা যায়। আমার সঙ্গে কথা বলতে পেরে নাকি সে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছিল দীর্ঘদিন পর। আর লোকটির সে অকপট স্বীকারোক্তিতে আমি আরেকবার বুঝতে পেরেছিলাম, কী মধুর এক অনুভূতির নাম মাতৃভাষায় কথা বলতে পারা। সে কারণেই কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আবার বলতে বাধ্য হই—‘মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রধান বন্ধনই হলো ভাষা।’ আর সে কথাটিকেই আরেকটু বিস্তৃত করে কবি নিজেই বলেছেন—‘ধর্ম এক না হতে পারে, ঘর-কন্নার অভ্যাসও ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু যে প্রজা সমূহ এক ভাষায় কথা বলে, তারাই একটা ‘‘দেশ’’ বা ‘‘রাষ্ট্রে’’র স্বাভাবিক অভিজ্ঞান। সেই সহজাত ভাষার উপরেই রাষ্ট্র নামক পরিকল্পনার স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা। এবং রাষ্ট্র ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু ভাষা ছাড়া পারে না।’
ওপরের কথাগুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি অনায়াসে। মানুষ কি তার জন্মভূমি ছেড়ে বা মাতৃভাষা-ভাষী মানুষগুলোকে ছেড়ে ভিন্ন রাষ্ট্রে যায় না? লেখক কি নিজেও মাতৃভূমিতে দীর্ঘকাল ধরে পরবাসী নন? তিনি কি মোটেও বেঁচে থাকেননি? অবশ্যই বেঁচে ছিলেন এবং ভালোভাবেই বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কেন? কারণ তিনি সেখানেও মাতৃভাষার চর্চা করতে পারছেন। কথা বলতে পারছেন প্রাণের ভাষায়। সে কারণেই দেখা যায় প্রবাসে স্বদেশিদের গুরুত্ব বেশি। তা যে কেবল ভাষার জন্যেই, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাষার জন্যে আমাদের আত্মত্যাগও মূলত ভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকেই উদ্ভূত।
প্রবন্ধে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রচলিত ভাষাগুলোর প্রতিও আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধে বাধ্য করেছেন। ভাষাকে ‘আঞ্চলিক’তার নামে বিভক্ত করা তাকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার অপকৌশল মাত্র। কিন্তু ভাষা-প্রেমের কথা বলতে গেলে রাষ্ট্রীয় কৌশল খুব একটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে হয় না। এক সময় আমাদের ওপরও ভাষা আরোপের চেষ্টা হয়েছিল, যা আমরা মেনে নিতে পারিনি। তিনি ভারতের বহু ভাষিক জাতির দিকে ইঙ্গিত করতেও দ্বিধা করেননি।
আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই তাহলে কী দেখি? যেখানে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে এবং দারুণভাবেই আছে, সেখানে যদি কেবল হিন্দি ভাষাকেই রাষ্ট্রীয় ভাষা বলে ঘোষণা করা হয় তাহলে এক অর্থে তা রাষ্ট্রের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ারই নামান্তর। সে হিসেবে যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবতে বসি, তাহলে আমরা কি দেখি না যে, এখানেও বহু ভাষা-ভাষী রয়ে গেছে? আমাদের ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভাষার কারণে অন্যান্য ভাষাগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। কিংবা দিন দিন রাষ্ট্রীয় ভাষার দাপটে অনেক ভাষার লোক রাষ্ট্রের নিয়মের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে নিজের ভাষাটিকেও। আমাদের দেশের উপজাতিদের কথাই যদি ধরি, তাহলে দেখা যাবে তাদের ভাষার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো ভাষার আবার নিজস্ব বর্ণমালাও রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাষার রাষ্ট্রীয় ব্যবহার আর প্রচারের ফলে উপজাতিদের বর্ণমালা আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। ভিন্ন ভাষায় প্রাণের কথা বলতে পারলেও তারা লিখতে পারছে না প্রাণের কথাটি প্রাণের ভাষায়। এটাকে কি আমরা রাষ্ট্রযন্ত্রের আধিপত্যের আওতায় বিবেচনা করব? নাকি রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রয়োগের দিকটির কথাই বলব? অন্যদিকে ভারতের সব ভাষা-ভাষীই যদি তাদের ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার চায় বা তাদের রাজ্যে তাদের ভাষাই ‘রাজ্য ভাষা’ হিসেবে দাবির লক্ষ্যে আন্দোলন করে তাহলে কি রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে? আর সে কথারই যেন খানিকটা পরিবর্তিত প্রয়োগ দেখতে পাই বুদ্ধদেব বসুর কথনে—‘...সেই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে ব্যাহত করে রাজ্যের সীমানা কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে চাইলে মানুষের মর্মস্থলে আঘাত করা হয়। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার কথাটা বড়ো করে ভাবলে চলবে না; কেননা রাষ্ট্র একটা যন্ত্র হলেও তার অন্তর্গত প্রজাসমূহ যন্ত্র নয়—তারা মানুষ।’ আর এভাবেই বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষ বড়, সেই মানুষের আরও বড় আশ্রয় হচ্ছে ভাষা। সেই ভাষাকে কুক্ষিগত করেও কোনো রাষ্ট্রকে টিকে থাকার ব্যাপারেও ততটা নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না হয়তো। আসলে বুদ্ধদেব কতটা সত্য বা আমদের নিজ নিজ ভাবনা কতটা পরিবর্তন যোগ্য তা হয়তো আজ মিলিয়ে দেখার সময় এসেছে। সময় এসেছে আবার নতুন করে চিনতে বুদ্ধদেব বসুকেও।
