বই আলোচনা

কাব্যগন্ধী ভাষার স্বপ্ন বুনন

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:১২
ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ উপন্যাসটির মূল অধ্যায় তেরটি। প্রতিটি অধ্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন কাব্যিক নাম উপন্যাসটির ভিন্নতায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র কাহিনি সরল নয়। এ উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কাব্যগন্ধী ভাষা এবং স্পষ্টতা। উপন্যাসের পরতে পরতে কাব্যময় ভাষিক উপস্থাপন কাহিনির দীপ্তিকে ঔজ্জ্বল্য দান করেছে। গভীর জীবনবোধ, পাঠকের চোখের সামনে প্রকৃতি আর দৃশ্যকল্পকে স্পষ্টকরণ করা হয়েছে এক গতিময় সাবলিল ভাষায়। ভিন্ন-স্বাদের গল্পে পাঠকের সামনে একের পর এক অজানা জগত আর নতুন নতুন তথ্যের দিগন্ত উন্মোচিত হতে থাকে। অথৈ-দিবা ও এলমার জীবনের ঘূর্ণিস্রোতে পাঠক নিজেও নিমজ্জিত হয়। আবার সে চরিত্রগুলোর উত্থান-পতন দেখে আনন্দিত অথবা ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে পাঠক। সাম্রাজ্যবাদ বর্তমান বিশ্বের একটি ভয়াবহ সমস্যা। সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে এবং সে খেলায় মাঝে-মধ্যে ক্ষান্তি দিয়ে জাতিসঙ্ঘের পতাকাতলে কীভাবে শান্তির দাওয়াই ফেরি করে করপোরেট রাজনীতি, তার বিশ্বস্ত দলিল ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’। পুরো উপন্যাসে সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণের চিত্র অঙ্কিত। পাশাপাশি উপন্যাসজুড়ে বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্য অথৈর ভালোবাসা আর গভীর মমত্ব পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। আফ্রিকাসহ পৃথিবীর সব বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা এমন স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে গিয়ে লেখক সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছেন সাহসী এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। যা এই উপন্যাসে যোগ করেছে আরও এক ভিন্নমাত্রা। তিন প্রধান চরিত্র, এলমা-অথৈ-দিবার ত্রিভুজ প্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক বিশেষ কৌশলে। ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র সহজ বাক্যের সুর ছন্দে লুকানো আছে দার্শনিকতা। উপন্যাসের বাক্যগুলো পাঠকের মননকে আলোকিত করতে করতে যেন অন্ধকার এক রহস্যময় জগতে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। উপন্যাসের আরও একটি উজ্জ্বল অংশ হলো সংলাপ। আফ্রিকার লোকবিশ্বাসও উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষকের কাছে অথৈ জানতে পারে আফ্রিকান সমাজের সেই বিভীষিকাময় মৃত্যুবিশ্বাস। তাদের শিশুরাও বিশ্বাস করে মৃত্যুর ছয় সপ্তাহ পর আবার পুনর্জন্ম হয়। এই বিশ্বাসের কারণে বৃদ্ধ হওয়ার চেয়ে মরে গিয়ে তারুণ্য; যৌবন ফিরে পাওয়ার আনন্দ-ভাবনায় মরে যাওয়াটা তাদের জন্য বড় কোনো ঘটনা নয়। তাই তারা এইডস হবে জেনেও এইডস এর প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেয় না। আবার মেয়েরা সোনার অলঙ্কার ব্যবহার করে না এই ভয়ে যে তাদের আর পুনর্জন্ম হবে না! মজার ব্যাপার এই লোকবিশ্বাসগুলো তাদের শোষণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে উন্নত বিশ্বের মানুষদের দ্বারা ছড়ানো। এছাড়া নরখাদক এলাকার উপজাতীয় সংস্কৃতি উপন্যাসটিতে স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। যেমন গর্ভবতী নারীরা পুরুষ মানুষের মুখ দর্শন করলে উপজাতীয় রাজার মৃত্যু হয়,তাই সন্তান না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয় পুরুষ বর্জিত এলাকায় নির্মিত আতুঁড়ঘরে। এ উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র এলমা। স্রোতে ভাসা, বয়ফ্রেন্ড-হান্টে বিশ্বাসী একসময়ের এলমা অথৈর সান্নিধ্যে সত্যিকারের ভালোবাসার স্বরূপ চিনতে পারে। বদলে যাওয়া এলমা অথৈকে বলে ‘তুমি সব উলট-পালট করে দিলে। দিবার প্রতি তোমার গভীর ভালোবাসা, আমাকে প্রতিদিন সত্যিকার ভালোবাসার স্বরূপ চিনিয়ে দিল। প্রতিদিন আমার সত্তাকে জাগিয়ে দিতে থাকল। এ এমন এক আগুন! তার জ্বালায় নির্দিষ্ট সময় পর অন্তর মনে সুস্থির হয়। আমিও সুস্থির হলাম। গভীর ভালোবাসায় অথৈ নামটা আমার হূদয়ে স্থির হয়ে গেল। শুধু তোমাকেই নয়, দিবাকেও ভালোবাসলাম। আমি পূর্ণ হলাম অথৈ।’ এই হলো এলমা। দিবা মরে গিয়ে বেঁচে গেল কিন্তু এলমা অথৈর ভালোবাসায় সারাজীবনের জন্য নিমজ্জিত হলো অথৈ-শূন্যতায়। সব হলাহল পান করে যে নিজের ভালোবাসাকে, প্রেমকে বাঁচাতে চায়। তাই সে অথৈকে শেষ চিঠি লেখে—‘দিবাকে বলে রেখো এ জন্মে ত্যাগটুকু আমার হলেও পরজন্মে পাওনাটুকু আমার। ঐ পারে সে যেন তোমার দিকে কখনোই হাত না বাড়ায়, অনন্তকাল অপেক্ষা করে কাউকে পেলে কী জানি সহ্য মনে করা যায় না।’ একই চিঠিতে এলমা আরও জানায়—‘জানো অথৈ, আমি মা হব! ছেলে হলে ওর নাম রাখব অথৈ। মেয়ে হলে দিবা। আমাকে কোনো ঠিকানায় খুঁজো না। পাবে না। ছোট অথৈ আর আমার নতুন সংসার! সেখানেই আমার অনন্ত অপেক্ষা। তোমার জন্য।’ দিবার তুলনায় এলমা অনেক সক্রিয়। প্রতিদিন চলার পথে অথৈকে দিবার চেয়ে এলমা কাছ থেকে চেনার সুযোগ বেশি পায়। এই চেনাটুকু এলমাকে নিজের কাছে নতুন করে ফিরে নিয়ে যায়। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে পাঠক দিবার চেয়ে এলমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সম্ভবত এলমার ভালোবাসার শক্তির কাছে পাঠকও পরাজিত হয়। বাস্তব জগতের প্রতি নির্মোহ থেকেও যে আবেগে ঔপন্যাসিক ভালোবাসার আকুলতা ছড়িয়ে রেখেছেন ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’য় তার ভাবাবেগ প্রতিটি পাঠককে আচ্ছন্নতায় ডুবিয়ে রাখবে বলেই আমার ধারণা। উপন্যাসের পটভূমির কারণে ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’য় দিবার উপস্থিতি কম। অথৈর জন্য তার ভালোবাসা শরত্চন্দ্রীয় নারীর মতো। তাই কম উপস্থিতি সত্ত্বেও এই চরিত্রটি স্পষ্ট। দিবার মৃত্যুর পর অথৈ তার দেশের বাড়িতে এক পুরাতন ডায়েরি খুঁজে পায়। অথৈর সেই ডায়েরিতে দিবা চুপি চুপি লিখে রেখেছিল একটা কবিতা। উপন্যাসের কাহিনি বাঁক নিয়েছে ফল ব্যাককে উদ্ধার অভিযানে সাসান্দ্রায়। সাসান্দ্রার আগ পর্যন্ত উপন্যাসের কাহিনি একেবারেই সরলরৈখিক। এখান থেকেই ঘটনা অথবা কাহিনি প্রবাহের ইসিজি গতি। ঋজুতা ভেঙে এই বক্রতাই উপন্যাসের বাঁক ফিরিয়েছে। উপন্যাসের কাহিনি, ঘটনাপ্রবাহ, চরিত্র, ভাষা, সবকিছু পাঠককে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।