মোহাম্মদ হানিফ (জন্ম ১৯৬৪) পাকিস্তানি লেখক ও সাংবাদিক। ব্রিটেনের ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। দীর্ঘদিন বিবিসি উর্দু বিভাগে কাজ করেছেন, ছিলেন বিভাগীয় প্রধান। ২০০৮ সালে পাকিস্তানে ফিরে আসেন, স্থায়ীভাবেই। তাঁর দু’টি বিখ্যাত গ্রন্থ:‘অ্যা কেইস অব এক্সপ্লোডেড ম্যাঙ্গো’ এবং ‘আওয়ার ল্যাডি অব এলিস ভাট্টি’। তিনি একজন নাট্যকারও। অনূদিত রচনাটি ৭ আগস্ট ২০০৯ লন্ডনে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। মোহাম্মদ হানিফ যখন লন্ডনের পাট চুকিয়ে স্বদেশে ফিরে যান, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দেশটিতে কেন ফিরে যাচ্ছেন এ প্রশ্ন অনেকেই তাঁকে জিজ্ঞেস করেছেন। বেশ কিছুদিন পর তিনি লিখলেন, বাড়ি ফিরে তিনি আসলে সুখীই হয়েছেন
এক দশকেরও বেশি সময় লন্ডনে বসবাস এবং চাকরি-বাকরি করে এক বছরেরও কিছু সময় আগে আমি পাকিস্তানে ফিরে আসি। এসে শিগগিরই বুঝতে পারলাম যে, পাকিস্তানকে আমি চিনতাম তা দেশান্তরী হয়ে গেছে। চলে গেছে মূলত অভিজাত দন্তচিকিত্সকের ক্লিনিকের ওয়েটিং রুমে সমকালীন বিষয়ের ম্যাগাজিনের মলিন প্রচ্ছদে। বিশ্বের গণমাধ্যম ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, ডুবে যাচ্ছে এমন একটি জাহাজে আমি চড়েছি। টাইম, নিউজউইক, ইকনোমিস্ট দু’ বারেরও বেশি পাকিস্তানের মৃত্যুসংবাদ ছেপেছে। পাকিস্তানের ব্যাপারে যারা একটু বেশি যত্নবান তারা এখনো একটুখানি আশা জাগিয়ে রেখেছে।
কয়েক বছর আগে আমি যখন পাকিস্তানে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম, পাকিস্তান তখন অবশ্যই পৃথিবীর নিরাপদতম গন্তব্য নয়। দেশটি তখন দারিদ্র্য ও তালিবানের প্রেতাত্মা এবং এদের লালনকারী সামরিক একনায়কের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। কিন্তু দেশটি একালের পৃথিবীর অংশ হিসেবেই বিরাজ করছে; রাস্তার কোণায় কোণায় একটি করে নতুন ব্যাংকের শাখা খোলা হয়েছে; নতুন প্রজন্মের গণমাধ্যম ও টেলিযোগাযোগ চালু হয়েছে; পেশাজীবী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রেতারা বাড়তি সময় কাজ করে তাদের ভাগের পাকিস্তান পরস্পরের কাছে বিক্রি করছে। মনে হয়েছে পাশ্চাত্য জগতের বিভিন্ন সম্পাদকীয় পরিষদ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, পৃথিবী ধ্বংসের আর দেরি নেই, আর এর শুরু পাকিস্তান থেকে। লন্ডনে জন্ম ও বড় হওয়া আমার ১১ বছরের ছেলে চন্নন এতে এতোটাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে যে, করাচি এয়ারপোর্টে সাদা মানুষ দেখামাত্র তীব্রস্বরে ফিসফিস করতে থাকে, ‘ওরা এখানে কী করছে? তারা জানে না পাকিস্তান কোন পর্যটকের দেশ নয়। ওরাই তো সব সময় বলছে, পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী দেশ।’
তারপরও আমি পুরনো ধাঁচের একটি ব্রিটিশ ব্যাখ্যা দিতে চাই—পাকিস্তানের আসন্ন মৃত্যুর সংবাদটি অপরিপক্ব। পাকিস্তানের নিজস্ব গণযুদ্ধ আছে। যারা পাকিস্তানের কেয়ামত দেখছেন তারা দরিদ্র শিশুদের পাঠাচ্ছে বোমায় নিজেদের উড়িয়ে দিয়ে অন্যদের হত্যা করতে। কিন্তু চাষি ও শ্রমিকরা যদি তাদের সঙ্গে এই কেয়ামত আতঙ্কের ভাগীদার হতো, তারা ভালো বেতন এবং ভালো কাজের অবস্থা সৃষ্টির জন্য সারাদেশে বিক্ষোভ করে বেড়াত না। আমাদের পাঁচতারা হোটেল এবং মুসুল্লিভরা মসজিদ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও ভয়ঙ্কর কিছু আমাদের আছে। পাকিস্তান সফরে আসা একটি বিদেশি ক্রিকেট টিমের সদস্যদের আক্রমণ। কিন্তু গত দু’বছরে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এখানকার লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্ববৃহত্ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে দৃঢ়-প্রোথিত সামরিক একনায়কত্বের পতন ঘটিয়েছে। (ক্ষমতাচ্যুত জেনারেল পারভেজ মুশাররফ এর মধ্যে লন্ডনের এজওয়ার রোডে একটি বাড়ি কিনেছেন। আপনি যদি কোথাও লম্বা নলের হুক্কা টানতে থাকা কাউকে দেখেন তিনি সাধারণ আরবদের মজলিশে উত্তম মিতাচার নিয়ে নসিহত করছিলেন তার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়া এড়িয়ে চলবেন।)
এখানে করাচিতে মানুষ যখন সন্ধ্যার আড্ডায় বসে, কিছু সমসাময়িক ঘটনার ম্যাগাজিন পাকিস্তানকে মৃত ঘোষণা করায় এখন তাদের কী করা উচিত তা নিয়ে আলাপ করে না। তারা বিদ্যুত্ ঘাটতি ও নির্বিচার শহুরে অপরাধপ্রবণতা নিয়ে কাতরস্বরে কথা বলে। বাসার কাজের মানুষের যৌনজীবন, টিভি নাটকের বেহাল অবস্থা নিয়ে কথা বলে। করাচিতে আমাদের এক বছরে বিদ্যুত্ নিয়ে দাঙ্গা হয়েছে, তিনটি সাধারণ ধর্মঘট হয়েছে আর জাতিগত উত্তেজনা তো রয়েছেই, যা ক্রমান্বয়ে রক্তাক্ত দাঙ্গার রূপ নিয়েছে। আবার অন্যদিকে আমাদের সফল চলচ্চিত্র উত্সব হয়েছে, প্রায় ৪০টি সঙ্গীত কনসার্ট, ২০টিরও বেশি নাটক এবং শত শত বিক্ষোভও হয়েছে।
বহুসংখ্যক অভিবাসীর মত আমি কখনো মাতৃভূমি সম্পর্কে মনের মধ্যে একটি অনাবিল শান্তির চিত্র লালন করতাম না এবং তার জন্য কাতরও ছিলাম না। কারণ প্রথমত আমার মাতৃভূমি কখনোই অনাবিল শান্তির দেশ ছিল না। দ্বিতীয়ত লন্ডনে আমি যে কাজ করতাম তা ছিল পাকিস্তানকে নিয়েই। হ্যাঁ, জায়গা বদলে যায়, যখন নিউজউইক অন্যদিকে নজর দেয়। যেমন, যখন আমি পাকিস্তানে ফিরে আসি পাকিস্তানে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কারও হিজাব এবং বোরকায় নিজেকে ঢেকে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা লজ্জায় আমার কাছ থেকে সরে গেছে এমন নয়, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরব মরুভূমির নারীদের মতো থাকবে। পাকিস্তানি নারীদের পর্দায় অবগুণ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে ক’বছর আগে; কিন্তু দর্শনার্থী হিসেবে আমার মনে হয়েছে এটি মৌসুমী ধর্মানুরাগ ছাড়া আর কিছু না। ...
পারিকারিকভাবে এখন আমরা মূল্যায়ন করতে শুরু করেছি যে দিন আমাদের বসতির কোথাও না কোথাও একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটেনি, সেটি একটি চমত্কার দিন। এমনকী ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুত্ চলে যাওয়ায় আমাদের কাছে সহনীয় হয়ে উঠেছে। লন্ডনে আমরা আবহাওয়ার আলাপ করতাম। বিদ্যুতের ব্যাপারটাও একইভাবে আলাপ হয়, কার কতটুকু বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা তা নিয়ে বড়াই চলে যেন একজন অন্যজনকে ছুটিতে ভ্রমণকালীন তোলা ছবি দেখাচ্ছে। প্রথমদিকে দিনের একটা অংশে বিদ্যুত্ না থাকার ব্যাপারটা আমার ভালোই লেগেছে, গণমাধ্যম থেকে বাধ্যতামূলক উপবাস যেন। তারপরও আমি ওয়ার এ্যান্ড পিস পড়তে শুরু করি। দিনে ছ’বার বিদ্যুত্ যেতে শুরু করে। মে মাসের গরম আমাদের চাপড়াতে থাকে। আমাদের পরিবেশবান্ধব আলখাল্লা ফেলে দিয়ে একটা জেনারেটর কিনে ফেলি।
করাচি এখনো উদ্ভট ও বিস্ময়ের এক চমত্কার মিশেল। এটাই পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে ক্রিকেট-লিজেন্ড ও পরে রাজনীতিবিদ ইমরান খান নিষিদ্ধ। একটি নির্বাচনে ব্রিটিশ সিলেব্রিটি ম্যাগাজিন সম্পাদকরা ভোটার হলে তা হলে ইমরান খান অবশ্যই কোন জায়গার মেয়র হতেন। যাহোক, করাচিতে অবশ্য জনমতের ওপর তার প্রভাব সামান্যই। কিন্তু অদ্ভুত মারপ্যাঁচটি হচ্ছে ইমরান খানকে করাচিতে যিনি নিষিদ্ধ করেছেন, তিনি থাকেন লন্ডনে। করাচির প্রিয়পুত্র, এখনকার ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ আলতাফ হোসেন ১৫ বছর ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি চলে যাওয়ার পর তার দল সবকটি নির্বাচনেই জিতেছে, আর লন্ডনের এজওয়ারে থাকাটাই তিনি পছন্দ করছেন। অনুপস্থিত জমিদার হিসেবে লন্ডনে থেকে তিনি করাচিতে তার ব্যক্তিগত তালুকদারি চালাচ্ছেন। কাজেই এক অর্থে লন্ডনের উপশহরে বসবাসকারী কেউ করাচিতে আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমার বন্ধুরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, আমি লন্ডনকে খুব মিস করছি কিনা। মাশাআল্লা আমি করাচিতে ভালোই আছি। তবে স্ট্যান্ডের কোনো পাবে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে ‘হ্যাঁ, দয়া করে আর এক গ্লাস ল্যাগার দিন’ বলাটা হয়ে ওঠে না। তবে ইনশাল্লাহ শিগগিরই সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাব।
[আংশিক অনূদিত]
