নরসিংদী

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৪
১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকবাহিনীর পরাজয়ের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিল। বিজয়ের এই দিনে একদিকে ছিল যেমন বিজয়ের অনাবিল আনন্দের উত্সব অন্যদিকে তেমনি ছিল ছেলে হারা মা, ভাই হারা বোন, স্বামী হারা স্ত্রীর বেদনাসিক্ত হাহাকার। তবুও সবকিছু ছাপিয়ে বিজয়ের আনন্দই উদ্বেলিত করেছে নরসিংদীর মুক্তিকামী মানুষকে। অবশ্য বিজয়ের স্বাদ তারা পেয়েছিল দিন কয়েক আগেই- ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ। নরসিংদীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেই বিজয়গাঁথাই তুলে ধরেছেন ইত্তেফাকের নরসিংদী প্রতিনিধি নিবারণ রায় ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী মুক্ত দিবস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি নরসিংদীর আপামর মানুষের কাছে অত্যন্ত তাত্পর্যময় অবিস্মরণীয় দিন। সম্মিলিত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখে ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ সমগ্র নরসিংদী অঞ্চল পাক হানাদার মুক্ত হয়। পাকবাহিনীর গণহত্যা ও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ: স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন থানায় শতাধিক খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসময় পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতার শিকার হয়ে নরসিংদীতে ২৭ জন, পলাশে ১১ জন, শিবপুরে ১৩ জন, রায়পুরায় ৩৭ জন, বেলাবতে ১৬ জন ও মনোহরদীতে ১২ জনসহ মোট ১১৬ জন বীর সন্তান শহীদ হন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। শুরু করে দুর্বার আন্দোলন। স্বাধীনতার মূল মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে সারা দেশ। ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামে। শুরু হয় ছাত্র-জনতার মুক্তির আন্দোলন। এর পাশাপাশি নরসিংদীতে ১৫/২০টি ট্রেনিং ক্যাম্প খুলে শত শত ছাত্র যুবককে প্রাথমিক হাতিয়ার চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় বাঙালিদের উপর বর্বর আক্রমণ চালানোর পরদিন অর্থাত্ ২৬ মার্চ থেকে ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষ পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের জন্য একতাবদ্ধ হয়। নরসিংদীতে তত্কালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) সামসুল হুদা বাচ্চুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঁশের লাঠি নিয়ে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এসময় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম হিরু, আবদুল আলী মৃধা, আলী আকবর, খন্দকার গোলজার হোসেন, মানিক লাল সাহা, আব্দুল মতিন ভূঞা, হারাধন সাহা, সুভাষ সাহা, নিবারণ রায়, হাসান মাহমুদ, খালেকুজ্জামান, হাবিবুল্লাহ বাহার, অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বাহার, আতাউর রহমান মাস্টার, আজিজ আহমেদ খান, ফজলুল কাদের সওদাগর, আপেল মাহমুদ, রতন সরকার, আব্দুস সাত্তার, গণেশ আচার্য (জগদীশ), ক্ষিতিশ ঘোষ, মেজবাহ উদ্দিন ইরান, ইফতেখার উদ্দিন ভুলু, বাদল কুমার সাহা, নারায়ণ ঘোষ, মজিবুর রহমান, আবুল কাসেম, হারুন অর রশিদ, হাবিবুর রহমান হাবিব, আমিরুল ইসলাম ভুঁইয়া, মাহমুদ, রাজু প্রমুখ প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করা ও যুদ্ধকালীন যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তারা হচ্ছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা আফতাব উদ্দিন ভূঞা, আবুল হাসিম মিয়া, রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, ফজলুল হক খন্দকার, বিজয় চ্যাটার্জি, নূরুল ইসলাম গেন্দু, মোসলেহউদ্দিন ভুঁইয়া, আঃ রাজ্জাক ভুঁইয়া, আবদুল মান্নান ভুঁইয়া, মতিউর রহমান মতি মিয়া, মিন্টু সাহা, এনামুল হক, গয়েছ আলী মাস্টার, জসীম উদ্দিন, কাজী হাতেম আলী, অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন, নেভাল সিরাজউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ইমাম উদ্দীন, আঃ হাকিম, মজনু মৃধা, আব্দুল মোতালিব পাঠান, ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, মোঃ আসাদুজ্জামান, আব্দুল হাই, মনিরুজ্জামান মনির, এড. মুহঃ ফজলুল হক, মতিউর রহমান, আদম আলী মাস্টার, অধ্যক্ষ মোঃ ইউনুস, মোঃ আবেদ আহম্মদ, তাজুল ইসলাম ঝিনুক, মোঃ আলী আকবর, মীর ইমদাদুল হক, আবদুল লতিফ, নূরুজ্জামান, তোফাজ্জল হোসেন প্রমুখ। প্রথম পর্যায়ে নরসিংদী ছিল ২ নম্বর সেক্টরের অধীন। তখন এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তত্কালীন মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ। পরে নরসিংদীকে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীন করা হলে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্রিগেডিয়ার মোঃ নূরুজ্জামান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতের পর ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল পাক হানাদার বিমান বাহিনী নরসিংদী শহরের উপর বোমা বর্ষণ করলে তাতে প্রায় গোটা শহরই পুড়ে যায়। এ সময়ে পাক বিমান বাহিনীর গোলা বর্ষণে শহীদ হন আবদুল হক, নারায়ণ চন্দ্র সাহা, আব্দুল্লাহ (মাছ বিক্রেতা)সহ নাম না জানা কমপক্ষে ১৩ জন। তত্কালীন পাক সেনাবাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে ক্যাপ্টেন সায়গল এবং মেজর মতিউর রহমানের নেতৃত্বে সেনা বাহিনীর একটি দল ইপিআর-এর সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নরসিংদীতে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাদের পেয়ে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার মনোবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। এসময় ছাত্র-শ্রমিক-জনতা তাদেরকে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করে। তাদের খাবার দাবার সরবরাহ করা এবং গোলাবারুদসহ হাতিয়ার একস্থান থেকে অন্যস্থানে নেয়ার জন্য মুক্তিকামী জনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ অবস্থায় দুইদিন থাকার পর তারা ভৈরবের দিকে চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর ৭ এপ্রিল পাকবাহিনী নরসিংদী শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে এসে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকবাহিনী আসার পরই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নরসিংদী ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে তারা পূর্ব ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরার আগরতলায় গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাক হানাদার বাহিনী নরসিংদী শহরে এসে স্থায়ীভাবে বৌয়াকুড়, বাজির মোড় সংলগ্ন টেলিফোন ভবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। প্রতিদিন এখানে রাজাকার এবং স্থানীয় টাউট দালালদের যোগসাজশে হানাদার বাহিনী চালাতে থাকে নরহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো ঘটনা। আর এদিকে ধীরে ধীরে প্রতিরোধও গড়ে উঠতে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রস্তুতি নিয়ে মুক্তি পাগল মানুষ আঘাত হানতে থাকে শত্রু শিবিরে। নরসিংদী মুক্ত হবার আগে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এমন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হলো নরসিংদীর বাগবাড়ি, পালবাড়ি, গনের গাঁও, আলগী, মাধবদী, পাঁচদোনা, পলাশের চরণগরদী, চরসিন্দুর, বরাব, রাবান, জিনারদী রেলওয়ে স্টেশন, ডাঙ্গা বাজার, রায়পুরার মুছাপুর, হাটুভাঙ্গা, মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন। বেলাবরের নারায়ণপুর, উজিলাব, আমলাব এবং জয়বাংলা বাজার, শিবপুরের ইটাখোলা, পুটিয়া এবং বংশিরদিয়ায় পাক বাহিনীর সাথে তুমল যুদ্ধ হয়। মনোহরদীর হাতিরদিয়া বাজার, রামপুর ও ড্রেনের ঘাট। যুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা শহীদ হয়েছেন তারা হলেন- গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, অধ্যাপক সরোজ কুমার অধিকারী, ডঃ সাদত আলী, মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, অধ্যাপক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, অধ্যাপক রাধা গোবিন্দ সাহা প্রমুখ। মাধবদী হত্যাযজ্ঞ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুখ্যাত রাজাকার আব্দুর রশীদের সহযোগিতায় ১৬ অক্টোবর পাক হানাদার বাহিনী মাধবদীর আলগী গ্রামে তারিনী বাবুর বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেখানে অবস্থানরত ৬ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে ও বেয়নেটের আঘাতে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এখানে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা তাইজ উদ্দিন পাঠান, আনোয়ার হোসেন, সিরাজ মিয়া, আওলাদ হোসেন, মোহাম্মদ আলী ও আঃ সালাম। পাশাপাশি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তারা হলেন সাদেকুর রহমান, মোঃ মোক্তার মিয়া, ইদ্রিস মিয়া, মিয়ার উদ্দিন, নায়েক মহিউদ্দিন, মোঃ তমিজউদ্দিন, আরজু মোল্লা, আওলাদ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, হারুন অর রশিদ, ইব্রাহিম, আজমত আলী ও বাবুল মাস্টার প্রমুখ। এসময় পাক বাহিনী ব্যাপক লুটতরাজ চালায় ও ঘর-বাড়ি আগুন দিয়ে পুুড়িয়ে দেয়। গৃহবধূ ও যুবতী মেয়েরা হন ধর্ষণের শিকার। সে সময়ে পশ্চিম ব্রাহ্মন্দী রাম কৃষ্ণ মন্দিরের পাশে জঙ্গলে দিনদুপুরে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে পাক বাহিনী। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় এখানে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদাররা। পিছু হটলো পাকবাহিনী: মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা নেভাল সিরাজ, মনির হোসেন, আব্দুল মোতালিব পাঠানসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা বালাপুর, আলগী ও ধর্মপুরের ক্যাম্প থেকে একযোগে পাক হানাদার বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করলে তাদের সাথে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সৈন্যরাও যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল নাগরার নেতৃত্বে হেলিকপ্টারে নরসিংদীর বালুশাইর এলাকায় ভারতীয় সৈন্যরা এসে অবস্থান নেন। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় পাকবাহিনী বিনা যুদ্ধেই পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে এভাবেই হানাদার বাহিনী পিছু হটতে থাকে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী হয় পাক হানাদার মুক্ত। স্মৃতি সংরক্ষণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন: নরসিংদীতে প্রায় ১ শত গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু সরকারিভাবে গণকবরগুলো সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকারিভাবে নরসিংদীতে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। নরসিংদী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মোতালিব পাঠান জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে নরসিংদীতে একটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় তলার কাজ সমাপ্ত হয়েছে। নরসিংদীর পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্ব। জাতি তাদেরকে চিরদিন স্মরণ করবে। নরসিংদীর জেলা প্রশাসক মোঃ ওবায়দুল আজম বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান বর্তমান সরকারের অনবদ্য অবদান। বীর মুক্তিযোদ্ধা হারাধন সাহা জানালেন, মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে তিনি সমাজে অবহেলিত এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার মতে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে মূল্যায়ন করা অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে আজও তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তিনি সঠিক এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই করে তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।