স্যাটেলাইটের এই যুগে প্রায় সবকটি চ্যানেলই যখন তাদের অনুষ্ঠানের আড়ম্বর বাড়াতে সেট আর অঙ্গসজ্জার তুলকালাম করছে। ঠিক সেই সময় দাঁড়িয়ে একই অনুষ্ঠানে এমন বৈচিত্র্যময় সেট কেবল ‘ইত্যাদি’র পক্ষেই সম্ভব। একই সাথে দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও উপস্থাপন করছে প্রতিটি পর্বে। চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, ময়মনসিংহ শেষে এবারের ‘ইত্যাদি’ ছিল বরিশালবাসীর জন্য বিশেষ ‘ইত্যাদি’। আমাদের ইত্তেফাকের বরিশাল প্রতিনিধিও জানালেন ‘ইত্যাদি’ প্রচারের দিন সারা শহর প্রায় শুনসান হয়ে গিয়েছিল। বরিশালের কীর্ত্তণখোলা নদীর পাড়ে। বিশাল যাত্রীবাহী লঞ্চের সামনে ভাসমান সেট তৈরি করে একটি টিভি অনুষ্ঠান করা যায়, তা করে দেখাল ‘ইত্যাদি’।
বরাবরের মতো বরিশালের নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকার ওপরে ছোট ছোট ডকুমেন্টারি দিয়ে এবারের পর্ব শুরু হয়। তবে ক্যামেরা দিয়ে এটি ধারণের মুন্সিয়ানায় মনে হচ্ছিল বরিশাল নয়, যেন বাইরের সিঙ্গাপুর বা দেশের বাইরের কোনো সুসজ্জিত শহর দেখছি। বরিশালের প্রকৃত নান্দনিকতা তুলে ধরার এই চেষ্টা দিয়ে শুরু হওয়ার পর নানান সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে স্কিডগুলো বরাবরের মতো নির্মল আনন্দ দেয় একইসাথে বিবেককে কিছুটা হলেও খোঁচা দেয়। বিশেষ করে নাটকে অযথা আঞ্চলিকতা ঢুকিয়ে হাসানোর চেষ্টা যে এখনকার সমাজে অহরহ হচ্ছে তাই যেন তুলে ধরে দেখিয়ে দেওয়া হলো। এ ছাড়া নতুন কিছু করে বদলে দিলেই যে তা শুভ বার্তা দেওয়া হয় না সেটিও উল্লেখ করলেন।
বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো পরপর দু’বার এভারেস্ট জয়ী তারকা এম এ মুহিত বরিশালের ছেলে হিসেবে ‘ইত্যাদি’র প্ল্যাকার্ড হিমালয় চূড়ায় গিয়ে দেখিয়েছিলেন। তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুহিত বলেন, ‘জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে ‘ইত্যাদি’ দর্শকমনের এভারেস্ট ছুঁয়েছে। সেই কারণেই আমি এটি দেখিয়েছি।’ অকাট্য যুক্তি এবং নিজের ভালোলাগার কথায় প্রকাশ করলেন বরিশালের কৃতী এই তারকা।
বরিশালের তারকা শিল্পী তানিয়া আহমেদ, মীর সাব্বির, লিটন অধিকারী রিন্টুর উপস্থিতিতে দর্শকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে তারকাদের সাথে সাধারণ দর্শকেরা কোনো রকম আড়ষ্টতা ছাড়াই যে এত সুনিপুণ অভিনয় করেছেন যা অনেক নামী অভিনেতাকেও হার মানায়।
তবে বরিশালের আরেক কৃতী তারকা জুয়েল আইচের পরিবেশনা যেন কিছুটা ম্লান ছিল। কারণ তার মতো জাদুব্যক্তিত্বের এই ধরনের ম্যাজিক যা তিনি একাধিক শোতে দেখিয়েছেন, তার বাইরে তার কাছ থেকে আরও ভিন্ন কিছু দেখার প্রত্যাশা ছিল সবার। এ ছাড়া বরিশাল নিয়ে তার অনুভূতিটাও উপস্থাপক রাখতে পারতেন। বিষয়টা কিছুটা হলেও খাপছাড়া মনে হয়েছে।
কুমিল্লার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের গণবিবাহের প্রতিবেদন ছিল আকর্ষণীয় এবং শিক্ষণীয়। সত্যিকারের সমাজসেবকদের প্রতি পর্বে এভাবে তুলে ধরার প্লাটফর্ম যেন এই অনুষ্ঠান। আর রতনে যে রতন চেনে তার প্রমাণ মিলল সুপার হিউম্যান খ্যাত ম্যাক ইউরি এই সফলতার অংশ হতে পেরে। কারণ প্রায় ১২ বছর আগেই ‘ইত্যাদি’ তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। যাকে নিয়ে আজ ডিসকভারি চ্যানেল তার সফলতা দেখাচ্ছে। এ ধরনের উদাহরণ অবশ্য এই একটি নয় ‘ইত্যাদি’র ক্ষেত্রে। এ দেশে নিঃস্বার্থ সমাজসেবী পলান সরকার থেকে শুরু করে অনেককেই দেশবাসীর কাছে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘ইত্যাদি’। যদিও পরবর্তীতে তাদের নিয়ে কর্পোরেট বিভিন্ন কোম্পানি ও মিডিয়া নিজেদের অর্জন বলে দাবি করার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যায়ে ৮০ বছরের আলমাস মিয়ার প্রতিবেদন ছিল একই সাথে মর্মস্পর্শী এবং রূপক অর্থে অনেক কিছু বলে দেওয়ার মতো। আমাদের সমাজে বা আমাদের মিডিয়াতেই অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ তারকা, নির্মাতা বা মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন যারা তাদের যৌবনে অনেক কাজে ব্যস্ত থাকলেও বা যে কাজ দিয়ে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, পরবর্তীতে বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজেদের সেই কার্যক্রম বন্ধ করে শুধু টক শোতে কথা বলে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পরিচয়ে স্মৃতিচারণে ব্যস্ত থাকেন। তাদের জন্য উত্কৃষ্ট উদাহরণ যেন এই ৮০ বছর বয়সী আলমাস মিয়া। যিনি একার প্রচেষ্টায় এই বয়সেও সম্পূর্ণ একতলা দালান নির্মাণ করেছেন। কাজের স্পৃহা আর ভালোবাসা থাকলে যে বয়স কাউকে দমিয়ে রাখতে পারে না তাই যেন দেখাল ‘ইত্যাদি’।
খালিদ হাসান মিলুর বড় ছেলে প্রতীককে তারকা খ্যাতি দিয়েছিল ‘ইত্যাদি’। এবারে তারা নিয়ে এলো তার ছোট ছেলে প্রীতম হাসানকে। তবে তাদের কণ্ঠে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় একটি দেশের গান হলে তা যেন সঙ্গত যুক্তিতেই আরও আকর্ষণীয় মনে হতো। বরিশালবাসীর গর্বের আরও একটি উচ্চারণ হতে পারত যে এই অনুষ্ঠানের মূল ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেতের নিবাসও এই বরিশালেই। সে কথার উল্লেখ করেননি তিনি, হয়তো নিজের বিনয় প্রকাশেই কিনা সে প্রশ্ন তার কাছে রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া বরিশালের আরও অনেক কীর্তিমানের কথায় তুলে ধরা হয়নি। অবশ্য অনুষ্ঠানের সময় সংকটও এর কারণ হতে পারে। এরপরও আলাদাভাবে বাংলাদেশকে বিভিন্ন খণ্ডে উপস্থাপনের এই ধারাবাহিকতায় বরিশালকে নিয়ে আলাদা ‘ইত্যাদি’ সবমিলিয়ে সত্যিই উপভোগ্য ছিল। নতুন কোনো পর্বে নতুন কোনো বাংলাদেশকে ‘ইত্যাদি’র তীক্ষ্ন চোখ দিয়ে দেখার অপেক্ষায় রইলাম তাই আমরাও।
