দলিতদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সুরক্ষা প্রয়োজন

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৩
দলিতদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সুরক্ষা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন দক্ষিণ এশীয় পরামর্শ সভায় বক্তারা। গতকাল রবিবার জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিতে ‘দলিত ও সামাজিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সুরক্ষা’ শীর্ষক পরামর্শ সভার দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে এই দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম) ও নাগরিক উদ্যোগের যৌথ আয়োজনে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরামর্শ সভায় বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই দলিত জনগোষ্ঠীর একই অবস্থা। কোনভাবে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সভায় সভাপতির বক্তব্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, যুগ যুগ ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় দলিত জনগোষ্ঠী সবক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। অথচ তারা সমাজকে সুন্দর রাখতে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান অস্পৃশ্যতার অগ্রহণযোগ্য সংস্কৃতিকে রোধ করে দলিতদের অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে মানবাধিকার রক্ষা হবে না। তিনি আরো বলেন, আমরা স্বাধীনতার ৪১ বছর পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছি, অথচ এতোদিনেও আমরা দলিত কমিউনিটির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। রাজনীতিবিদরা ভালো ভালো কথা বলে মানুষের ভোট নিয়ে সরকার গঠন করেন, কিন্তু জনগণ যখন একই দাবি নিয়ে কথা বলা শুরু করে, সে সময় সরকার নানা অজুহাতে পিছুটান দেয়। তারা গণতন্ত্রের নামে সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষকে সুযোগ সুবিধা দেয়। প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফোরাম এশিয়া, থাইল্যান্ড-এর কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাঈদ আহমেদ। এই অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের চার্টার-এ মানবাধিকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ভারতের নবসৃজন ট্রাস্ট্রের নির্বাহী পরিচালক মঞ্জুলা প্রদীপ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি পর্যায়ে অনেক সংগঠিত নেটওয়ার্ক রয়েছে। নিজেদের মধ্যে সংলাপ করে দলিতদের সুরক্ষার জন্য নেটওয়ার্কগুলোকে সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাকিস্তান দলিত সলিডারিটি নেটওয়ার্কের সনো খাঙ্গারানী বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দলিতদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পাকিস্তানে একজন দলিত সংসদ সদস্য রয়েছেন যিনি দলিতদের অধিকার বিষয়ে কথা বলতে পারেন। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মূল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এই অঞ্চলের দলিতদের অধিকার রক্ষার জন্য তিনি সাউথ এশিয়ান দলিত সলিডারিটি ফোরাম গঠনের প্রস্তাব করেন। নেপালের প্রতিনিধি জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মসূচির সাবেক কর্মকর্তা ভীম প্রাইর বলেন, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও শিশুর অধিকার অনেক বেশি আলোচিত হয়, কিন্তু দলিতদের অধিকারের বিষয়টি আলোচনায় আনা হয় না। এটিকে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে। আফ্রিকায় আঞ্চলিক পর্যায়ে দলিতদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্ত:রাষ্ট্রীয় জুডিশিয়াল কাউন্সিল রয়েছে। দলিতদের অধিকারের বিষয়ে তাদের বিচারিক ক্ষমতা রয়েছে। এ অঞ্চলেও এ ধরনের কাউন্সিল গঠন করে দলিতদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তিনি প্রস্তাব করেন। অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশে দলিত নারীদের অধিকার আন্দোলন ও দক্ষিণ এশীয় অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক অপর একটি সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্টুডেন্ট ফ্রানজিসকা কর্ণ। সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন মানবাধিকার কর্মী এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। শনিবার রাজধানীর নীলক্ষেতস্থ জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিতে দুইদিনব্যাপী দক্ষিণ এশীয় পরামর্শ সভার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি ড. হামিদা হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ভোট পাওয়ার জন্য তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দলিতদের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বললেও ক্ষমতায় গেলে আর তারা দলিতদের স্বীকৃতি দিতে চায় না। রাজনীতিবিদদের পর্যায় থেকে দলিতদের প্রতি আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভেদে বৈষম্য দূর করতে হবে। তাদের আবাসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিডিইআরএম এর উপদেষ্টা ড. ফারজানা ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অধিবেশনে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিডিইআরএম এর সভাপতি মুকুল সিকদার। সভায় ‘বাংলাদেশে দলিত অধিকার আন্দোলন: একটি সার্বিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন গবেষক মাজহারুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সংহতি বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন অন দলিত হিউম্যান রাইটস, ভারত এর পল দিবাকর, ইন্টারন্যাশনাল দলিত সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ডেনমার্ক এর সমন্বয়কারী রিকি নরলিন্ড প্রমুখ।