বছর সাতেক আগের কথা। বিকেএসপিতে ছেলেকে রেখে ফিরে যাচ্ছিলেন বাবা মোহাম্মদ জামিল মিয়া। চোখের পানি মুছতে মুছতে বিকেএসপির শিক্ষক আখিনূর জামান রুশোকে বলেছিলেন, দেখবেন ছেলেটা যেন ওর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। তার ছেলেটা অনেকদূর গেছে এই সময়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছিল না। অবশেষে গতকাল বিকালে সেই খুলনা থেকেই আবার কান্না ভেজা কণ্ঠে ফোন করলেন সেই জামিল মিয়া—ছেলেটার মনে হয় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে!
হ্যাঁ, একটা আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করবেন, জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলবেন, একদিন দেশের সবাই তাকে চিনবে; এসব স্বপ্ন নিয়েই ২০০৫ সালে অনেকটা জোর করে বিকেএসপিতে চলে এসেছিলেন আজকের এনামুল হক বিজয়। বিকেএসপির এক ঝাঁক তরুণ সৃষ্টির মতো আরও একটি হীরা হয়ে এবার বাংলাদেশের ক্রিকেটে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন সেই বিজয়।
একেবারে শৈশব থেকেই ক্রিকেটে অন্তপ্রাণ ছিলেন এনামুল। তার বাবা জামিল মিয়া ফোনে বলছিলেন, ‘আমি ফুটবল খেলতাম। কিন্তু ক্রিকেটটা কোনোদিনই তেমন বুঝি না। আর ছেলেটা পাগল ছিল ক্রিকেট নিয়ে। আমাদের এলাকার ছেলে সুমনের (হাবিবুল বাশার) খেলা দেখতো, আর বলতো— আমি ওরকম হব। এক হাতে ভাতের প্লেট নিয়ে আরেক হাতে বল নাড়াচাড়া করতো। আমাকে না জানিয়ে সেই ক্লাস সেভেনে থাকতে বিকেএসপির ফর্ম পূরণ করেছিল।’
জামিল মিয়া এরপর বর্ণনা করে চলেন কি করে একটু একটু করে বিকেএসপির পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে গেল ছেলে। সেখান থেকে বিকেএসপির শিক্ষকদের হাত ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। ছেলের এই উত্থানের পেছনে নিজের চেয়েও এই পর্যায়ে বিকেএসপির শিক্ষকদের বেশি অবদান দেখেন জামিল মিয়া। আর বিজয় নিজেই অনেক আগে এই স্বীকৃতিটা দিয়ে রেখেছেন তার বিকেএসপির শিক্ষক, কোচ আখিনূর জামান রুশোকে।
রুশো ফোনে কথাটা শুনে একটু লজ্জা পেলেন, ‘আমি তো কতর্ব্য পালন করেছি। এই প্রতিষ্ঠানে আমরা সবাইকে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। তার মধ্যে এরকম যে এগিয়ে যেতে পারে, সেটা আসলে তার ভেতরের প্রতিভার গুণ। এজন্য আমি বিজয়কেই কৃতিত্ব দেই।’
বিজয় কেমন প্রতিভাবান, তা পরিসংখ্যানে চোখ বোলালেই বোঝা সম্ভব। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৪৫-এর ওপরে গড়, সর্বশেষ ৩টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ২টি অপরাজিত সেঞ্চুরি, দুটি মাত্র ওয়ানডেতে ১৬১ রান; এসব তার হয়েই কথা বলে। কিন্তু তার প্রতিভাটা আসলে কাছ থেকে দেখেছেন রুশো।
বিকেএসপির এই কোচ বলছেন, প্রতিভা শুধু নয়, নাছোড়বান্দা একটা আগ্রহ বিজয়কে এখানে নিয়ে এসেছে, ‘ওকে কোনো একটা শটের নির্ভুল রূপটা দুবার বলে দিতে হয়নি কখনো। একবার বললেই ধরে ফেলেছে। কোনো একটা শট ঠিকমতো না হলে সারাদিন চেষ্টা করে গেছে। কোনো একটা টার্ম বুঝতে না পারলে রাতের বেলায় এসে প্রশ্ন করেছে। এই চেষ্টাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছে।’
শুরুর জায়গাটায় বিজয় পৌঁছে গেছেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে এটা যে শুরু মাত্র; তা তার অভিভাবকরা ভালোই বোঝেন। সেঞ্চুরি করেই বিজয় বাবাকে আর কোচকে ফোন দিয়েছেন। কোচ ফোনে বলেছেন, ‘এটা মাত্র শুরু। যেদিন টেস্টে তামিম-সাকিবের মতো পারফরমেন্স করবে; সেদিন সত্যিকারের খুশি হব। নিজেকে সেরা করে তোলার আগে সন্তুষ্ট হবে না।’
বাবারও ঠিক একই পরামর্শ। সেই সঙ্গে আরেকটা দাবি সবার কাছে, ‘বিজয় এখন আর আমার একার ছেলে নেই। ও এখন এই দেশের ষোলো কোটি মানুষের সম্পদ। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন ও যেন শুরুর মতো করে নিজেকে ধরে রাখতে পারে।’ দেশের স্বার্থেই সবাইকে সেই দোয়া করতে হবে।
স্কো র কা র্ড
বাংলাদেশ ইনিংস
তামিম ইকবাল ক পোলার্ড ব রাসেল ৫
এনামুল হক ক নারিন ব রামপল ১২০
নাইম ইসলাম ক নারিন ব রামপল ৬
মুশফিকুর রহিম ক সিমন্স ব রামপল ৭৯
নাসির হোসেন ক গেইল ব রামপল ৪
মমিনুল হক ক পোলার্ড ব রামপল ৩১
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ অপরাজিত ৩
মাশরাফি বিন মুর্তোজা অপরাজিত ১৮
অতিরিক্ত (লে বা-৬, ও-১৯, নো-১) ২৬
মোট (৬ উইকেট, ৫০ ওভার) ২৯২
উইকেট পতন: ১/৯ (তামিম), ২/২১ (নাইম), ৩/১৯৫ (মুশফিকুর), ৪/২০১ (নাসির), ৫/২৬৫ (মমিনুল), ৬/২৬৫ (এনামুল)।
বোলিং: রবি রামপল ১০-১-৪৯-৫ (নো-১, ও-৪), আন্দ্রে রাসেল ৯-০-৫৮-১, ড্যারেন সামি ৫-০-৩৫-০, সুনীল নারিন ১০-১-৪৮-০ (ও-২), ডোয়াইন স্মিথ ৯-০-৪৬-০ (ও-১), মারলন স্যামুয়েলস ৭-০-৫০-০ (ও-১)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস
লেন্ডল সিমন্স ক তামিম ব সোহাগ ৯
ক্রিস গেইল ক মুশফিক ব মাশরাফি ১৫
ড্যারেন ব্রাভো ক মুশফিক রাজ্জাক ২৮
মারলন স্যামুয়েলস ক মুশফিক ব সোহাগ ১৬
ডোয়াইন স্মিথ এলবিডব্লিউ রাজ্জাক ০
কিয়েরন পোলার্ড ব নাইম ২৫
ডেভন থমাস ব রাজ্জাক ০
ড্যারেন স্যামি ক জহিরুল ব রিয়াদ ১২
আন্দ্রে রাসেল রান আউট (মমিনুল/ মুশফিক) ৯
সুনীল নারিন ক তামিম ব সোহাগ ১০
রবি রামপল অপরাজিত ০
অতিরিক্ত (লে বা- ২, ও- ৬) ৮
মোট (অল আউট, ৩১.১ ওভার) ১৩২
উইকেট পতন: ১/১১ (সিমন্স), ২/৩২ (গেইল), ৩/৬৩ (স্যামুয়েলস), ৪/৬৫ (স্মিথ), ৫/৭৮ (ব্রাভো), ৬/৭৮ (থমাস), ৭/১০০ (স্যামি), ৮/১১১ (পোলার্ড), ৯/১৩২ (রাসেল), ১০/১৩২ (নারিন)।
বোলিং: সোহাগ গাজী ৭.১-২-২১-৩ (ও-১), মাশরাফি বিন মুর্তোজা ৬-০-২৬-১ (ও-১), আব্দুর রাজ্জাক ৫-০-১৯-৩ (ও-১), আবুল হাসান ১-০-৯-০ (ও-১), নাইম ইসলাম ৭-০-২৮-১ (ও-১), মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ৫-০-২৭-১ (ও-১)।
ফলাফল: বাংলাদেশ ১৬০ রানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: এনামুল হক বিজয়
সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০ তে এগিয়ে।
