তখন আমরা ঢাকায় অনেকটা বন্দী অবস্থায় ছিলাম। আমার বয়স চৌদ্দ কি পনের হবে। তখন কিছুদিন পরপরই বাড়ির আশপাশে ভীষণ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যেত। গুলির শব্দ শুনে খুব ভয়ও পেতাম। আমার আব্বু ঢাকা ছাড়তে চায়নি, তাই পুরো যুদ্ধের সময়টায় আমরা ঢাকাতেই ছিলাম। আমাদের পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন হাশেম ভাই। তাকে নিয়েই তখন একটা ভয়াবহ কাণ্ড ঘটেছিল। তাতে আমরা সবাই খুব ভয়ও পেয়েছিলাম। ঘটনাটি ছিল তিনি সব সময় সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা রাখতেন। আর এই পতাকাওয়ালাকে খুঁজতেই মিলিটারিরা একদিন বাসায় চলে আসে। পুরো ঘর এলোমেলো করে দেয় তারা। পতাকাটি তখন ঘরের একটি স্যুটকেসেই ছিল। কিন্তু সেদিন হানাদারেরা এটা খুঁজে পায়নি। আল্লাহ সহায় ছিল বলেই এটা হয়েছে। পুরো ঘর তছনছ করে তাদের খোঁজের চেষ্টা দেখে আমরা সবাই খুব ভয় পেয়েছিলাম। আর ভয়ের তো আরও অনেক কারণ ছিল। কারণ প্রায়ই শুনতাম মিলিটারিরা মানুষ ধরে নিয়ে নিয়ে মেরে ফেলে, মানুষের ওপর পাশবিক নির্যাতন করে। আর নারী নির্যাতনের কথা তো তখন প্রতিদিনই শুনতাম। ছোট ছিলাম তো তাই আমি খুব ভীতু ছিলাম। আশপাশে যখনই গোলাগুলি হতো কিংবা বোমা ফুটত তখনই দৌড়ে গিয়ে ঘরে লুকিয়ে পড়তাম। আবার মাঝে মাঝে দেওয়ালের ওপর উঁকি দিয়ে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করতাম। বয়সের কারণেই হয়তো যুদ্ধটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। গুলি ও বোমার শব্দে ভয়ে ঠিকমতো তখন ঘুমুতেও পারিনি। খুব ভয়াবহ ছিল সেই দিনগুলো। তবে এত ভয়ের মাঝেও স্বাধীনতা শব্দটা মনে আসার সঞ্চার ঘটাতো। মনে হতো কোনো একদিন এই শব্দটাই আমরা সব ভয়ের অবসান ঘটাবে। সত্যি স্বাধীনতা আজ শুধু আমার নয়, সবার মনের সব ভয়ের অবসান ঘটিয়েছে।
