শতবর্ষে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদায় উত্সবের আমেজ

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪৪
১৮৬১ সালে ভারত উপ-মহাদেশে পুলিশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে পুলিশ ছিল লাঠিয়াল বাহিনী। খাকি হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট মাথায় টুপি আর হাতে লাঠি। ট্রেনিং বলতে সাহেবকে সালাম ঠোকা। আইন পাসের প্রায় ৩২ বছর পর শুরু পুলিশের ট্রেনিং। প্রথম নামকরণ ট্রেনিং স্কুল অতপর ট্রেনিং কলেজ। সর্বশেষ প্রশিক্ষণ একাডেমি। শতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐহিত্যের ধারক রাজশাহীর সারদার অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি। এখানে কঠোর অনুশীলন আর সমসাময়িক ধ্যান-ধারণায় প্রশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তারা কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় এক মাইল পশ্চিমে পদ্মার ধারে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি। এবছর পদার্পণ করেছে শতবর্ষে। এ উপলক্ষে আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে তিনদিনের অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি হিসাবে ৬ ডিসেম্বর সকালে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হেরিটেজ প্যারেডে অভিবাদন গ্রহণ, প্রধান অতিথির উদ্বোধনী ভাষণদান, স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন, প্রদর্শনী পরিদর্শন ও একাডেমি প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করবেন। এছাড়া উদ্বোধনী দিনে রয়েছে স্মৃতিচারণ, আতশবাজি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় দিনে সেমিনার, মেলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সমাপনী দিবস ৮ ডিসেম্বর মেলা, হর্স শো ও ব্যান্ড শো, স্মৃতিচারণ এবং ওপেন এয়ার কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি’র শতবর্ষে পদার্পণ উদযাপন উপলক্ষে সারদা সেজেছে নতুন সাজে। নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে রাস্তার দু’পাশ। বিশাল প্যারেড গ্রাউন্ডের উত্তরপাশ জুড়ে প্যান্ডেল, পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্ব সাজানো হয়েছে রঙিন কাপড়ে। শতবছরের নানা প্রজাতির গাছের গোড়ায় করা হয়েছে চুনকাম। প্রতিদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি-মহড়া। গত রবিবার বিকালে একাডেমির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বর্তমান অধ্যক্ষ, অতিরিক্ত আইজিপি নাঈম আহমেদ জানান, শতবর্ষে পদার্পণ উত্সবকে ঘিরে চলতি ২০১২ সালে একাডেমিতে সাধিত হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। উত্সবের প্রাক্কালে একাডেমিকে একটি টাউনে রূপান্তর করেছে এবং এনেছে উত্সবমুখর পরিবেশ। তিনদিনের অনুষ্ঠানে ভারত, পাকিস্তান, কোরিয়া, ব্রিটেনসহ দেশ-বিদেশের সহস্রাধিক অতিথি যোগদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুলিশের ট্রেনিং ব্যবস্থা: ১৯০২-০৩ সালে ভারতীয় পুলিশ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ঢাকার মিলব্যারাকের পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে প্রাদেশিক পুলিশ প্রশিক্ষণ কলেজে রূপান্তরিত হয়। যা ১৯১২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং আসামের জন্য ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠিত পুলিশ ট্রেনিং কলেজটি পুনর্গঠিত বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে মিলব্যারাকের পুলিশ প্রশিক্ষণ কলেজ স্বল্প আবাসন, দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল না। এমতাবস্থায় বাংলা ও আসাম রাজ্যের জন্য পৃথক একটি ট্রেনিং কলেজ স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯১২ সালের জুলাইয়ে রাজশাহীর সারদায় পূর্ণাঙ্গ পুলিশ ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে অধ্যক্ষ আরও বলেন, শতবর্ষ পূর্তি উত্সবের মাধ্যমে একাডেমি তার নতুন শতকের প্রশিক্ষণার্থীদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত গণমুখী পুলিশী ব্যবস্থা প্রবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এলক্ষে ‘ট্রেনিং নিড এ্যানালাইসেস’ এর মাধ্যমে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কারিকুলাম যুগোপযোগী করা হচ্ছে। মিলব্যারাক থেকে সারদা: সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি একটি প্রাচীনতম পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। বৃটিশ ভারতীয় সেনা অফিসার মেজর এইচ চিমনী এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। ১৮৬১ সালে আনুষ্ঠানিক পুলিশ আইন পাসের প্রায় ৩২ বছর পর ব্রিটিশ সরকার পুলিশের ট্রেনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ১৮৯৩ সালে ঢাকার মিলব্যারাকে পরীক্ষামূলকভাবে পুলিশ সদস্যদের জন্য ১২ মাসের ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু হয়। এতে পুলিশের কাজের মানোন্নয়নে ব্যাপক সফলতা পাওয়া যায়। ১৯০৬ সালে ট্রেনিং স্কুলকে করা হয় ট্রেনিং কলেজ। একাডেমি সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষ চিমনি ঢাকা থেকে স্টিমারে কলকাতা যাবার পথে চারঘাটে যাত্রা বিরতি করেন। তিনি সারদায় অবস্থিত ডাচদের পরিত্যক্ত সুদৃশ্য ভবন, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, মনোরম পরিবেশ ও প্রমত্তা পদ্মার বিশালতা দেখে মুগ্ধ হন। কলকাতায় ফিরেই তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে সারদায় পুলিশ একাডেমি স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করে এবং ১৯১০ সালে বর্তমান পুলিশ একাডেমির ১৪২.৬৬ একর জমিসহ স্থাপনা মেদিনিপুরের জমিদারের নিকট থেকে ২৫ হাজার রূপিতে ক্রয় করে। জনশ্রুতি রয়েছে, তখন এলাকাটি ছিল ঘনজঙ্গলে ঠাসা এবং এলাকায় বাঘের ব্যাপক উপদ্রব ছিল। এ কারণে এলাকাটিকে বলা হতো শেরদা (অর্থাত্ বাঘের গ্রাম)। পরবর্তীতে শেরদা থেকে সারদা নামকরণ হয়। সারদায় যত প্রশিক্ষণ: একাডেমিক কনস্টেবল থেকে এএসপি পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে ট্রেনিং প্রদান করা হয়। এরমধ্যে শিক্ষানবিশ এএসপি ১২ মাস, শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর ১২ মাস, বিভাগীয় সাব-ইন্সপেক্টর ৬ মাস, সার্জেন্ট ৬ মাস, শিক্ষানবিশ কনস্টেবল ৬ মাস। নিয়মিত কনস্টেবল ৬ মাস। রিডার (কনস্টেবল) ৬ মাস। এছাড়া বিভাগীয় এএসপি ৪ সপ্তাহ, ইন্সপেক্টর নিরস্ত্র ৬ সপ্তাহ। ইন্সপেক্টর সশস্ত্র ৬ সপ্তাহ। নিরস্ত্র সাব-ইন্সপেক্টর ৮ সপ্তাহ। সশস্ত্র সাব-ইন্সপেক্টর ৮ সপ্তাহ। সার্জেন্ট টিআই ৮ সপ্তাহ। এএসআই ৮ সপ্তাহ। প্রশিক্ষণের মধ্যে ইকুইটেশন (অশ্ব চালনা), র্যাম্প জাম্প, ভল্টিং বীম, এস্কলেটিং ওয়াল, ওয়াটার ডিচ্, রোপ ক্লাইম্বিং, ফুট ড্রিল, স্কোয়াড ড্রিল, প্লাটুন ড্রিল, রায়ট ড্রিল, বেয়নিট ট্রেনিং, মার্কার লাগানো, মাস কেট্রি, অস্ত্র খোলা-জোড়া, স্লো মার্চ, ড্রাইভিং, খেলাধুলা, আন আর্মড কম্ব্যাট, আইন ক্লাস, সন্ধ্যাকালীন স্টাডি ক্লাস, সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান, বিতর্ক, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মিডটার্ম, শিক্ষাসফর ও পাসিং আউট উল্লেখযোগ্য।