পৃথিবী রক্ষায় বিশ্বনেতাদের নজর কাড়তে ব্যস্ত প্রতিবাদকারীরা। কাতারের রাজধানী দোহা এখন বিশ্ব নেতাদের পদচারণায় মুখর। আর তাদের কাছে একটাই দাবি— যেন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐকমত্যে আসেন সকলে। যেন কার্বন নির্গমন কমাতে অন্তত প্রতিশ্রুতি দেন। সোমবার সম্মেলন কক্ষে ঢুকতে ঢুকতে বিশ্বনেতারা দেখেছেন প্রতিবাদ ও সচেতন করতে নানা ব্যতিক্রমী আয়োজন। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশের কাছে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছে। সবুজ গড়ো বিশ্ব বাঁচাও, কার্বন নিগর্মন কমাও, বাসযোগ্য বিশ্বগড় ইত্যাদি শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড শরীরের বিভিন্ন অংশে জড়িয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন অনেকে।
দোহা জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-১৮) সোমবার ছিল সপ্তম দিন। মঙ্গলবার শুরু হয়েছে সম্মেলনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক।
কনভেনশন সেন্টারের বিভিন্ন স্থানে, চলন্ত সিঁড়িতে, কফি হাউস, ফাস্টফুড কর্নারসহ যেখানেই অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি ছিল সেখানেই চোখে পড়েছে প্রতিবাদের ভাষা। বিভিন্ন শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে তরুণ-তরুণীরা বিশ্বকে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়ে ধনী ও শিল্পউন্নত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি বাংলাদেশের
কিয়োটো প্রটোকল পাঁচ বছরের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। সোমবার কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সাংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি তুলে ধরেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০১৩-২০২০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ কিয়োটো প্রটোকলের দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদ আট বছর করতে আপত্তি করবে না যদি উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে কমিয়ে এনে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার জন্য আমাদের বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন অবশ্যই কমাতে হবে
এ মাসেই কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একটি গ্রহণযোগ্য কার্বন নির্গমন রোধ চুক্তিতে উপনীত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অভিযোজনের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে তিনি উন্নত দেশের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া কার্বন নির্গমন রোধ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও গরীব দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যেসব উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ব নেতাদের আহ্বান জানিয়েছেন ড. হাছান মাহমুদ।
অন্যদিকে টেকসই উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যকে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গতকাল কিউএনসিসিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, নরওয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কাতার সরকার, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, ইউএনডিপি ও জাতিসংঘ নারী সংস্থা (ইউএনউইমেন) যৌথভাবে ‘স্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়ন’ বিষয়ে এক সভার আয়োজন করে। বৈঠকে নরওয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী এরভিন আইকল্যান্ড গ্যাডগিল মূল বক্তব্যে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে স্বাস্থ্যগত। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. ইকবাল কবীর, লাইবেরিয়ার জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী জুলিয়া ক্যাসেল ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব মাইকেল জেরাড।
এরভিন আইকল্যান্ড গ্যাডগিল বলেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জন ধরে রাখতে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য। আর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে দারিদ্র্য বিমোচন হবে না।
এদিকে মতপার্থক্য ভুলে কিয়েটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের ৭টি সংগঠন। সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তারা বলেন, উন্নত দেশগুলোকে মতপার্থক্য তৈরি না করে বরং সেগুলো অবসানের উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে ২০১৩-২০১৫ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ৬০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করতে হবে। সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজনকারী সংগঠনগুলো হলো বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ ইনডেজিনাস পিপল নেটওয়ার্ক ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড বায়ো ডাইভার্সিটি (বিপনেট সিসিবিডি), ক্লাইমেট চেঞ্জ ডেভলপমেন্ট ফোরাম (সিসিডিএফ), ক্লাইমেট গভর্নেন্স নেটওয়ার্ক (সিএফজিএন), ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুড (সিএসআরএল), ইক্যুইটি এন্ড জাস্টিস ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইক্যুইটিবিডি) এবং নেটওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বাংলাদেশ (এনসিসিবি)। সাংবাদিক সম্মেলন সঞ্চালনা করেন জিয়াউল হক মুক্তা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ। বক্তব্য রাখেন জাকির হোসেন খান, মিজানুর রহমান বিজয়, রেজাউল করিম চৌধুরী প্রমুখ।
সোমবার সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি সাংবাদিক সম্মেলন করে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় আলোচনার দাবি জানান। কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানো, কার্বন নির্গমন কমাতে কানাডাসহ অন্য দেশগুলোকে কিউটো প্রটোকলে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেয়াসহ নয় দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
