ইতিহাসে আছে মানুষ বিক্রি হতো আগের যুগে। হাট-বাজারে উঠতো সহায় সম্বলহীন মানুষ। আর সেই মানুষকে কিনে নিতো সমাজের ধনবানরা। বিক্রি হয়ে যাওয়া মানুষ জীবনের প্রয়োজনে হয়ে যেতো দাস-দাসী। বিচিত্র পেশা মানুষের। বর্তমানে সেই দাস-দাসী বেঁচা কেনার প্রথা না থাকলেও ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ঝালুয়া ব্রিজ এলাকায় এখনো আছে একদিনের জন্য মানুষ কেনার হাট। কামলার হাট নামে এলাকাবাসীর কাছে এ হাটের পরিচিতি।
হাটে দেখা গেল, এমদাদুল হক নামে এক যুবক চিত্কার করে বলছে, ‘আমারে ন্যাউহান (নেন), ওভাই আমারে ন্যাউহান। ধান কাটতে পারি, মাটি কাটতে পারি। ও ভাই, চাইয়্যা (চোখ মেলে) দেহেন আমি চেংরা (যুবক) আছি। উপজেলার মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের উত্তর পালাহার গ্রামের একরাম হোসেনের ছেলে এমদাদুল হক (২৬)। তার মতো এ হাটে এসেছে ঝালুয়া পাছপাড়া গ্রামের আব্দুল আলীর ছেলে মজনু (৩২), মৃত ফেয়ার বক্সের পুত্র জয়নুদ্দিন (৮০), চামটা গ্রামের মফিজ উদ্দিনের পুত্র আবুল কাশেম (৪৫), মাহমুদ হোসেনের পুত্র ফজলুল হকসহ (৫০) প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ।
এই এতো মানুষের ভিড়ে অনেকটা লজ্জাবশত নিজেদের আড়াল করে রেখেছিল কিশোর আশিক (১৪) ও মনির (১১)। এ দুই কিশোর জীবিকার তাগিদে কায়িক শ্রম বিক্রি করতে এ হাটে এসে লাইন ধরে চুপচাপ বসেছিল। এরা দু’জনই নান্দাইল উপজেলার শেরপুর ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্র।
ওই মাদ্রাসায় ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া আশিক মিয়া জানায়, উপজেলার ভাটি সাভার গ্রামে তার বাড়ি। বাবা বাবুল মিয়া মারা গেছেন ছোট বেলায়। বৃদ্ধ মা রাজিয়া খাতুন ও দুই বোন নিয়ে তার সংসার। একমাত্র ছেলে হিসেবে সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি এই কামলার হাটে তাকে শ্রম বিক্রির জন্য দুই বছর ধরে আসতে হচ্ছে।
উপজেলার ভাটি বিলপাড়া গ্রামের হাদিস মিয়ার ছেলে মনির মিয়া জানায়, বেঁচে থাকার জন্য অন্য কোন উপায় না পেয়ে সে এ হাটে এসেছে। ঘরে বৃদ্ধ বাবা, মা ও দুই বোন রয়েছে তার। ছাপড়া ঘরের ভিটেটুকু ছাড়া কোন জমিজিরাত নেই। সে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র বলে জানায়।
বৃদ্ধ জয়নুদ্দিন জানান, বর্তমানে একদিনের পারিশ্রমিক হিসেবে ৩০০ টাকা, সাথে তিন বেলার খাওয়া পাওয়া যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই কামলার হাটে ছোট কাল থেকে আইতে আইতে (এসে) জীবন পার কইর্যা দিলাম। কিন্তু যে ভাগ্য হেইডাই (সেটাই) রইল, বদলাইলো না।
আরো কয়েকজন শ্রমিক জানায়, সারাদিন তারা অন্যের জমিতে কঠিন পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় বাড়ি গিয়ে আরামের ঘুম দেয়। পরদিন ভোরে আবার এই ব্রিজের উপর কামলার হাটে চলে আসতে হয়। এটাই তাদের জীবনচক্র । তারা আরও জানান, বর্ষা মৌসুমে ও কার্তিক মাসে কামলার হাটে শ্রমের মূল্য কম থাকে। দুই শ’ টাকার উপরে কেউ কামলা নেয় না। অন্যদিকে বৈশাখ ও অগ্রহায়ণ মাসে এ হাটে জনপ্রতি ৩ শ’ থেকে ৪শ’ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। ঝালুয়া ভাটিপাড়া গ্রামের হয়রত আলী রতন (৩৫) নামে এক কামলার ক্রেতা জানান, বর্তমানে আমন ধানের বাজার মূল্য ভালো নয়। তারপর শ্রমিক মজুরি বেশি। কৃষি জমি পতিত রাখলেও চলে না, আবার আবাদ করলে সে অনুপাতে লাভ পাওয়া যাচ্ছে না । এ বিষয়ে নান্দাইল মডেল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এই কামলার হাটের মাধ্যমে কৃষকরা যার যার প্রয়োজন মতো শ্রমিক পাচ্ছে। অন্যদিকে গরীব মানুষজনও কাজের সুযোগ পাচ্ছে। আশপাশ তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন এ হাটে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা-বিক্রেতা আসছে।
