কথোপকথনে ম্যানবুকার বিজয়ী হিলারি ম্যানটেল

আমার সমস্ত লেখা এক প্রকার রসায়ন অথবা অপরসায়ন

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৫
হিলারি ম্যানটেল ৬ জুলাই ১৯৫২ ইংল্যান্ডের ডারবিশেয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আইন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর একজন সমাজকর্মী হিসেবে পাঁচ বছর বোস্টনে চাকরি করেন। চার বছর সৌদি আরবে কাটিয়ে আবার ব্রিটেনে ফিরে আসেন। সাহিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি এস. নাইপল স্মৃতি পুরস্কার পান ১৯৮৭ সালে। তিনি ১৯৯৯ ও ২০১২ সালে ম্যানবুকার পুরস্কার পান। তিনি প্রথম নারী লেখক যিনি দু বার ম্যানবুকার পুরস্কার পেয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘এভরিডে ইজ মাদার’স ডে’, ‘ভ্যাকেন্ট পজেশন চ্যাট্টো অ্যান্ড উইনডাস’, ‘এইট মান্থস অন গাজা স্ট্রিট’, ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’, ‘অ্যান এক্সপেরিমেন্ট ইন লাভ’, ‘ব্রিং আপ দ্য বডিস’। ইংরেজি থেকে অনূদিত কথোপকথনটি www.harpercollins.com.au থেকে নেওয়া হয়েছে। হিলারি ম্যানটেল ও সারাহ ও’রেইলির কথোপকথনটি অনুবাদ করেছেন বাপ্পী জোয়ার্দ্দার সারাহ :কীভাবে আপনি লেখক হয়ে উঠলেন? আপনি কখন বুঝতে পারলেন যে ভবিষ্যতে শুধু লেখক হয়ে উঠবেন? হিলারি : আমি আসলে অনেক দেরিতে বুঝেছি... এবং এভাবেই...। আসলে অনেক মানুষই জানে যে তারা লেখক হতে যাচ্ছে, এটা অনেক ছোটবেলা থেকেই তারা ভাবে। কিন্তু যখন আমার বয়স ২২ তখন আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ‘একজন’ হয়ে ওঠার। কারণ, আমার অস্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য অন্যান্য ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার সম্ভাবনা আমার ছিল কম। আমি জানতাম আমাকে লিখতে হত—‘তুমি অন্যান্য সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ।’ তবে ফিকশন লেখার কথা আমি তেমন ভাবে ভাবতাম না, আমি কখনোই ভাবিনি যে আমি একজন তথাকথিত গল্প কথক হব। সারাহ : আপনার প্রথম উপন্যাস এর নাম কী এবং এটা কখন লেখা হয়? হিলারি : আমি প্রথম যে বইটি লিখেছিলাম তার নাম ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’ মজার ব্যাপার হলো ১৯৯২ সালের আগে পর্যন্ত এটা প্রকাশিত হয়নি। তবে এই উপন্যাস নিয়ে আমি ২টা ড্রাফট্স লিখেছিলাম। প্রথম ড্রাফটি লিখি ১৯৭০ সালে বোস্টনে বসে। তবে ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম একটি রুটিন তৈরি করব। যেমন প্রতিদিন অন্তত ১৫ পৃষ্ঠা করে আমি লিখবই। যাই হোক না কেন, যত সমস্যার মধ্যেই থাকি না কেন, প্রতিদিন ১৫ পৃষ্ঠা লিখবই, লিখব। এরপর আমি আমার দেশ লন্ডনে ফিরে আসি এক বুক আশা নিয়ে। সঙ্গে উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি, উদ্দেশ্য এটা কারও কাছে বিক্রি করা। কিন্তু হঠাত্ করেই আমার সমস্ত শরীর অবসাদে ভরে গেল। যা শুধু কল্পনা শক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকত। পাণ্ডুলিপিটা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। তারপরই আমি শেষ বাক্যটি লিখলাম I was jelly. সারাহ: ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’ বইটি অনেক প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে এটা কীভাবে প্রকাশিত হলো? হিলারি : আসলে অবসাদ দীর্ঘদিন আমাকে ঘিরে রেখেছিল। এরপর মানিয়ে নিতে আমার অনেক সময় লাগে। এটা আমার জীবনটা বদলে দিয়েছিল। এই পরিবর্তনের জন্য আমি আমার স্বামীসহ সৌদি আরবে ছিলাম কিছুদিন। তবে ওই সময়ে আমি সম্পূর্ণ অন্যরকম একটি বই লিখেছিলাম। তা হলো—‘এভরি ডে ইজ অ্যা মাদারস ডে’ ওই সময় ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’ আবার তুলে রেখেছিলাম শেলফে। আমি চারটি বই খুব সফলভাবে প্রকাশ করেছিলাম। আর একটা বই লিখছিলাম ‘অ্যা চেঞ্জ অব ক্লাইমেট’ যখন আমার বন্ধু ক্লেয়ার ব্যোলান আমাকে ফোন করেছিল তখন সে একটা ফিচার লিখছিল ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার জন্য। বিষয়—লেখকদের অপ্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমার এরকম কোনো বই আছে কি না, তবে মিথ্যে বলতে আমার খুব শক্তিশালী প্রেরণা ছিল। আমি জানতাম যে, আমি যদি হ্যাঁ বলি তাহলে হয়ত এটি ভালো একটা ফল বয়ে আনতে পারে। আসলে এই উপন্যসাটি একটা অন্ধকার রহস্যের মতো, এবং দীর্ঘদিন সেরকমই ছিল। আমি ভীত ছিলাম এটি নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ব্যাপার খুব মনে হচ্ছিল যে আমার ক্যারিয়ার সফলভাবে ঠিক পথে এগুচ্ছে। ভয়টা ছিল এখানেই যে উপন্যাসটি আমার চলার এই স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করতে পারে। এটা অনুভব করাও আমার জন্য কঠিন হতে পারে যে, কী বিশাল ঐতিহাসিক উপন্যাসটি সাহিত্যের বর্তমান ধারার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়ত ব্যর্থ হবে। এর পেছনে বড় কারণটিই ছিল ভয়। যদি আমি এটা আবার পড়ি তাহলে হয়ত আমার মনে হবে যে, এটা আসলে উপন্যাস হয়ে ওঠেনি। এটাও মনে হতো যে, জীবনের অনেকগুলো বছর আমি শুধু নষ্টই করেছি এই উপন্যাসটির পেছনে। অবশ্যই আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে, পাণ্ডুলিপিটি শেলফে তুলে রেখে আমি শান্তি পাচ্ছি না। আমি আমার ক্যারিয়ারের একটা সূচি তৈরি করেছিলাম কিন্তু আমি সুখী ছিলাম না। সন্তুষ্ট ছিলাম না। তাই আমি আমার বন্ধু ক্লেয়ারকে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম। শেষমেশ একটা আর্টিক্যাল ছাপা হয়েছিলো ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায়। আমার শুভানুধ্যায়ী এবং প্রকাশক আমার কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি চেয়ে নেন এবং ওই বছরের অক্টোবরেই তা প্রকাশ করেন। তখন শরত্কাল। এর মানে হচ্ছে আমি প্রায় কয়েক মাস সময় নিয়েছিলাম। এটা প্রকাশের উপযোগী করতে। আমি ধারণা করেছিলাম এই অতিরিক্ত সময় আমার ভাবনাকে নাড়া দিতে পেরেছিল। এখন যখন এই বইটি নিয়ে ভাবি যে, আমার জন্য ওই সময় এবং বইটি খুবই উপযোগী। সঙ্গে সঙ্গে পাঠককে জানাতে চাই ওই সময় কিন্তু আমার প্রায় চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে। ওই সময়টি ছিল আমার লেখক সত্তা দেখানোর শ্রেষ্ঠ সময়। সারাহ : এই লেখক সত্তা তো নানাভাবে প্রকাশিত হতে পারে— ছোটগল্প, ঐতিহাসিক উপন্যাস, স্মৃতিচারণ ইত্যাদি এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা টিকেও থাকে। আপনার সমস্ত সাহিত্য কর্মের ভেতরে এগুলোর সমন্বয় কি আপনি খুঁজে পান? যা আপনার লেখাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করেন? হিলারি : আমি মনে করি আমার সমস্ত লেখা এক প্রকার রসায়ন অথবা অপরসায়ন আমার একান্ত ব্যক্তিগত ধারায়। আমি বেড়ে উঠেছি একটা ক্যাথলিক পরিবারে। একটি আদর্শ পৃথিবীতে সব লেখকের একটা ক্যাথলিক শৈশব থাকত অথবা অন্য ধর্মের সঙ্গে থেকেও এই ধর্মের সঙ্গে একটা সমতা রক্ষা করা। কারণ ক্যাথলিক তোমাকে বলে যে, তুমি যা দেখছ এটাই কিন্তু পৃথিবী নয়, তোমার নাগালের বাইরে আরও অনেক বাস্তবতা আছে, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আমি চিন্তা করেছিলাম। ক্যাথলিক মতবাদ আমাকে প্রভাবিত করছে যখন আমার কল্পনাশক্তি তৈরি হচ্ছে। আর আমার কাছে ভিন্নমত মনে হলো যে, চেতনা মানুষকে সহজেই কনভার্ট করতে পারে। এই চেতনাও শক্তিশালী। যখন মনের ভেতরে একটা পরিবর্তন ঘটে, তখন এই পরিবর্তন তোমাকে স্থির করে দিতে পারে। মুহূর্তটা আসলে এমন যে এটাকে এক টুকরো রুটি মনে হতে পারে, যা আসলে ঈশ্বরের পার্থিব রূপ। এটা শক্তিশালী একটা মতবাদ। এটা এমন একটা ব্যাপার যা মুহূর্তেই অন্যরকম হয়ে যেতে পারে। পৃথিবী বলতে তুমি যা বোঝ, হতে পারে এটা এক ধরনের মরিচীকা এবং তুমি যদি কোনো শিশু মস্তিষ্কে এই চেতনা প্রবেশ করাও তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সে কাজ করতে শুরু করবে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’-এ আসলে একটা রাজনৈতিক বিপ্লবের কথা আছে। প্রধান চরিত্রে আমার প্রশ্ন ছিল এরকম, সময় এমন একটা ব্যাপার যখন মানুষ চূড়ান্তভাবে বদলায়, মানুষ চেষ্টা করলেও শৈশবে ফিরতে পারে না, এর কি কোন নিয়ম আছে? আসলে এটাই সময়। আমার একটা চরিত্র ক্যামেলি ডেসমানস, তার জীবনের একটা বিরাট পরিবর্তন আছে। সে বিখ্যাত এবং শেষ পর্যন্ত বিখ্যাতই থাকে। তারপর সে হাঁটতে থাকে, কথা বলে, দেখে এবং বুঝতে পারে যে ক্যামিল না তা থেকে একটু ভিন্ন কেউ। তারপরই প্রশ্নটি আসে। সময় কীভাবে ব্যক্তি মানুষকে বদলে দিতে পারে? আমি আসলে মানুষের এই বদলে যাওয়া দ্বারা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই ব্যাপারটি কিন্তু আমার লেখায়ও এসেছে। যেমন—‘অ্যান এক্সপেরিমেন্ট ইন লাভ’ বইয়ে কারমেন ম্যাকবেইন, ‘অ্যা প্লেস অব গ্রেটার সেফটি’ বইয়ে রবার্স পিয়র এবং ‘উফ হল’ গ্রন্থে থমাস ক্রমওয়েল। এই সত্তার ব্যাপারটা তৈরি হচ্ছে। তারপর আবার তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন। সারাহ : আপনার ফিকশনগুলোয় আমরা দৃশ্যমান পৃথিবীর নানা রহস্যময়তা খুঁজে পাই। বিয়ন্ড ব্লক বইয়ে একজন আগন্তুকের মাধ্যমে আপনি এটা আবিষ্কার করেছেন। যার ‘ফ্লাড’-এ সামান্য প্রকাশ ছিল। এ ব্যাপারে কিছু বলেন। হিলারি : অবশ্যই হ্যাঁ। ‘ফ্লাড’ বইটি লিখেছিলাম সম্পূর্ণ শিশুসুলভ মানসিকতা থেকে। সে জন্য রহস্যময়তা খুব সাধারণভাবে প্রকাশিত। আবার সাধারণ বিষয়গুলো রহস্যময়ভাবে প্রকাশিত। এটা করা হয়েছে শিশু মস্তিষ্ক চিন্তা করে—যেমন জাদু কী? আমি যখন এটা লিখেছিলাম তখন পুনরায় আমি এটা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পেরে উঠেনি। রহস্যময়তা দৃশ্যমান পৃথিবীতেই লুকায়িত থাকে। আমার ‘বিয়ন্ড ব্লক’ গ্রন্থে যার সুস্পষ্ট উপস্থাপন আছে। আবার ওখানে আমি এটাও বলতে চেয়েছি যে রহস্যময়তা-ই হতে পারে আসল বাস্তবতা। আমি আসলে চিঠি লেখা প্রথার একজন ভক্ত। কিন্তু আমি খুব সতর্কভাবে বলতে চাই এটার জন্য আমি পাগল নই। আমি অনুভব করতাম, যদি আমি সচেতন থাকি বদলের সব সময়ও উপলব্ধি নিয়ে তাহলে মস্তিষ্ক মেধাদীপ্ত হয়। যার ফলে ‘ফ্লাড’-এ শুধু অস্পষ্ট আর সংজ্ঞামূলক কিন্তু বিমূর্ত রহস্যময়তা। ‘বিয়ন্ড ব্লক’-এ আমি সফল হয়েছি একটি উপস্থাপন করতে। কার্যত আমার পুরো সাহিত্য কর্মে আলৌকিকতার কিছুটা ব্যাপার হয়ত আছে। তবে আমি এটাকে মনে করি একটা তালাবদ্ধ ঘর, যা হতে পারে মনের একটা অংশ, যা হতে পারে কল্পনার অংশ যা সম্পূর্ণ নয়।