বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে ‘সৃজনে শেকড়ে’ ১১

মাটি ও মানুষের শিল্পকলা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৭
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের তুলিতে চেনা যায় মানুষের আনন্দ, আহাজারি আর আবহমান বাংলার চেনা বিষয়। আমাদের মনে পড়ে ‘গুনটানা’, ‘বিদ্রোহ’ও ‘সাঁওতাল পরিবার’। সে সঙ্গে দুর্ভিক্ষের ছবি এবং নিরন্ন মানুষের দেহভঙ্গি। এ প্রদর্শনীতে শিল্পাচার্যের চেনা-অচেনা ৫টি শিল্পকর্মসহ মোট ১২ জন শিল্পীর ৪৯টি বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ২৬ নভেম্বর। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে শিল্পীরা ছবির বিষয় হিসেবে দেশজ ঐতিহ্য, লোককলার নিগূঢ় সত্য থেকে কীভাবে ইউরোপীয় চিত্রকলার ধারার সঙ্গে যুক্ত করে আধুনিক শিল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। জয়নুল, কামরুল, এসএম সুলতান, আনোয়ারুল হক এদেশে শিল্পান্দোলনের ভিত তৈরি করেছেন। পঞ্চাশের দশকে হামিদুর রহমান, রশীদ চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, মবিনুল আজিম, দেবদাস চক্রবর্তী, কাজী আব্দুল বাসেত, নিতুন কুণ্ডু, মাহতাব প্রমুখ শিল্পী দেশজ বিষয়ের সঙ্গে যোগ করেন রং, রেখা, আকার, আকৃতির নিরীক্ষা। এতে সৃষ্টি হয়েছে স্বতন্ত্র ধারা। শিল্পাচার্যের (১৯১৪-১৯৭৬) আঁকা অতিচেনা ‘সাঁওতাল পরিবার’ ছবিতে গাঢ় রংয়ের রেখায় স্পষ্ট করে পুরুষ ও নারী সাঁওতাল দেহের ছন্দ সাঁওতাল অঞ্চলের রূপ মনে করিয়ে দেয়। ছবিটি জলরংয়ে আঁকা। দূরে ছোট ছোট গরুর পাল ও রাখালের হেঁটে যাওয়া আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। শিল্পাচার্যের আরেকটি ছবি ‘মেক্সিকো’। এটি কালি ও কলমের স্কেচ। ১৯৫৬ সালে আঁকা। হ্যাট পরিহিত মেক্সিকান মানুষের ফিগার। অন্য দুটি ছবি ‘কায়রো কার্ট’ ও ফোক ফ্লুইয়িস্ট’ বা লোকজ বংশীবাদক। শিল্পাচার্যের ছবিতে মানুষের দেহের ভঙ্গি উপস্থাপনে বৈচিত্র্য রয়েছে। রেখার গতিতে মানুষের দেহের পরিপ্রেক্ষিত আঁকায় তিনি ছিলেন যত্নবান—ছবিগুলো সেকথা-ই মনে করিয়ে দেয়। আনোয়ারুল হক (১৯১৮-১৯৮০) তত্কালীন সরকারি আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। তাঁর কাজের ধরন দেখে বোঝা যায়—তিনি ধীরলয়ে রং ও ড্রইংয়ে মনোযোগী ছিলেন। প্রদর্শনীর ৫টি কাজে বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও স্বতন্ত্র কৌশল চেনা যায়। আবহমান বাংলার রূপসৃজনে কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮) স্বতন্ত্র। শিল্পী স্বভাব-ই অন্যদের কাজ থেকে তাঁকে আলাদা করেছে। রেখার দ্রুত টান তাঁর ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ প্রদর্শনীতে রয়েছে ‘বাংলাদেশ’ ‘ফোর উইমেন’, ‘ক্যাটল ইন মুনলাইট’, ‘টু উইমেন’ শিরোনামের ভিন্ন মাধ্যমের কাজ। সুলতান আর বাংলাদেশ অভিন্ন সুতোয় গাঁথা। এস এম সুলতান (১৯২৩-১৯৯৪) হাড় জিরজিরে কৃষক আর কিষাণীকে ছবিতে দেখাতে চান না। তাঁর কৃষক পেশীবহুল, হালের গরু দ্রুত ছুটে চলে। চির বোহেমিয়ান এই শিল্পী পৃথিবীর যে প্রান্তে গিয়েছেন, সেখানে-ই স্বদেশকে তুলে ধরেছেন রেখায়-রঙে। এ প্রদর্শনীতে এসএম সুলতানের রয়েছে ৪টি তেল রংয়ের কাজ। হামিদুর রহমান (১৯২৮-১৯৮৮) তেলরং মাধ্যমে কাজ করেছেন অধিকাংশ সময়। এই প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ রয়েছে ৪টি। প্রতিটি কাজেই মৌলিক রংয়ের ব্যবহার লক্ষণীয়। রশীদ চৌধুরী (১৯৩২-১৯৮৬) জীবনের শেষভাগে বুনন শিল্পের জনক হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পকলায় নিজেকে চিনিয়ে দেন। প্রদর্শনীতে ১টি লিথো প্রিন্ট ও তেল রংয়ে আঁকা ২টি ছবি ছাড়াও রয়েছে ১টি বুনন শিল্প। আব্দুর রাজ্জাক (১৯৩২-২০০৫) শিল্পের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, জলরং, তেলরং—সব মাধ্যমে তাঁর বিচরণ ছিল। এ প্রদর্শনীতে তাঁর ২টি তেলরং, ১টি জলরং ও ১টি এচিং প্রিন্ট রয়েছে। মুবিনুল আজিম (১৯৩৪-১৯৭৫) তাঁর প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে আসেন ক্যানভাসে। এ প্রদর্শনীতে তাঁর ৪টি রেলরংয়ের আঁকা ছবি রয়েছে। শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী (১৯৩৩-২০০৮) ছাপচিত্রে ছবির জমিন নির্মাণে দক্ষতা দেখিয়েছেন। এ প্রদর্শনীতে তাঁর ৩টি তেল রং ও একটি ছাপচিত্র রয়েছে। কাজী আব্দুল বাসেত (১৯৩৫-২০০২) জ্যামিতিক আকৃতিতে মানুষ উপস্থাপন করে। তাঁর ছবিতে শূন্য স্পেস রেখে ছবি আঁকা সম্পন্ন করতেন। এ প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি আধা বিমূর্ত ও দুটি জ্যামিতিক আকৃতিক বিন্যাসে আঁকা তেলচিত্র রয়েছে। নিতুন কুণ্ডু (১৯৩৫-২০০৬) প্রকৃতির সুর ছন্দ তাঁর ছবির বিষয়। নিতুন কুণ্ডু জ্যামিতির সঙ্গে রংয়ের খেলা বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনে যুক্ত করেছে নিরীক্ষার নতুন অধ্যায়। এ প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের সংখ্যা ৪টি। শাহতাব (১৯৩৬-১৯৭৭) তেলরং মাধ্যমে কারও রেখার হালকা চলাচলে প্রকৃতির রূপ সৃজন করেছেন শাহতাব। জয়নুল আবেদিনের ছায়ায় গড়ে ওঠা তাঁর শিল্পভুবনে নিবিড় মনোযোগের ছাপ পাওয়া যায় প্রদর্শনীর ৪টি তেল রং চিত্রে। বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনের উল্লেখযোগ্য দুই দশকের শিল্পীদের কাজে আমরা একটি পথ-পরিক্রমা খুঁজে পাই। বেঙ্গল গ্যালারির দ্বাদশ বর্ষপূর্তির এ আয়োজন শেষ হবে আগামী ৫ ডিসেম্বর।