এই শহরে বসে যখন কোনো ঋতুর কথা লিখতে চাই, বুঝতে পারি—যা ভাবছি, তা আমার স্মৃতি থেকে নেওয়া, বর্তমানের নয়। ঋতু আসে ঋতু যায়, হয়তো তাদের সব বিত্ত-বৈভব-আনন্দ-বেদনা নিয়েই, কেবল আমারই চোখ নেই দেখার, কেবল আমারই জীবন ভরে থাকে বিশুদ্ধ নাগরিক যন্ত্রণায়। এখানে ঋতু পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ দেখার সুযোগ কোথায়? সময়ই বা কোথায়? অনেক কাজ, অনেক দায়, অনেক ব্যস্ততা জীবন থেকে আলস্যভরা সময়গুলো কেড়ে নিয়েছে। চোখ তুলে তাকানোর সময় নেই, দুদণ্ড বসে ভাবার অবসর নেই, বেলিফুলের গন্ধ নেই, শিশিরের স্পর্শ নেই। মাঝে মাঝে দিনের কাজ গুছিয়ে নিজের খুপরি ঘরে ফেরার আগে অফিসের উঁচু ভবনের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই বটে। দেখি—হেমন্ত আসছে! ঋতু পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ চলছে প্রকৃতিজুড়ে। আকাশে পাতাঝরা দিনের বিষণ্নতার আনাগোনা, মন খারাপ করা বিকেল দ্রুত ফুরিয়ে নেমে আসছে মৃদু শীতমাখা অপরূপ উদাসীন সন্ধ্যা। সন্ধ্যার মতো ভোরও ফুটে ওঠে মৃদু কুয়াশা মেখে, মখমলের মতো নরম ঘাসগুলো শিশিরে ভিজে থাকে সামান্য সময়ের জন্য, সকালের মিঠে রোদে অতিদ্রুত হারিয়ে যায় অভিমানী শিশির। আহা, হেমন্ত! তার সবকিছুই বড় মৃদু অথচ মায়াময়। গ্রীষ্মের বা শীতের তীব্রতা তার নেই, নেই বর্ষার তুমুলতাও, বরং সে আসে শীতের আগমনবার্তা নিয়ে, দীর্ঘ গরমের পর আরামদায়ক শীতল হাওয়া নিয়ে, অল্প সময়ের জন্য।
বুঝতে পারি, আমি আসলে স্মৃতিতেই ফিরে গিয়েছি। এই শহরে এত বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন চোখে পড়ে না কি? এখানে ঋতু পরিবর্তনের ব্যাপারটা বোঝা যায় বটে—প্রধানত শিশুদের অসুখ-বিসুখের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে। চিকিত্সকেরা উপদেশ দেন—‘সিজন চেঞ্জ’ হচ্ছে তো, এখন একটু এ রকম হবেই, একটু সাবাধান থাকবেন! অভিভাবকরা তখন হয়তো খেয়াল করে উঠতে পারেন—হ্যাঁ, এখন তো ঋতু পরিবর্তনের সময়! তা-ও সব ঋতু নয়, শীত থেকে গ্রীষ্মকাল, বা গ্রীষ্ম থেকে বর্ষাকাল বা শীতের আগমনের সময়টিই শুধু বুঝে নিতে হয়। ঋতু-পরিবর্তন তো নয়ই, আমাদের যে অপরূপ ঋতু বৈচিত্র্য, এই শহরে তার দেখাই মেলে না। ভ্যাপসা গরমে, বৃষ্টির ফলে বিরক্তিকর জলাবদ্ধতায়, স্বল্পস্থায়ী শীতের কামড়ে টের পাই— গ্রীষ্ম, বর্ষা বা শীত এসেছে। আর তখন নিজের ফেলে আসা গ্রামের কথা মনে পড়ে, যেখানে প্রতিটি ঋতুরই আলাদা রূপ, আলাদা বৈশিষ্ট্য। প্রতি ঋতুতে মানুষের জীবনযাত্রা কী অদ্ভুতভাবেই না বদলে যেত সেখানে! বর্ষায় কাজ নেই কারও। নিঝুম বৃষ্টিতে বাচ্চারা হয়তো ভেজাভিজি অথবা কাদা ছোঁড়াছুড়িতে মাতে, কিংবা নতুন আসা পানিতে মাঠে গাড়া-বড়শি দিয়ে মাছ ধরে। রান্নাঘরে ছোলা ভাজা হয় ঝিমিয়ে পড়া পুরুষরা খাবে বলে। কোনো এক ঘরে হয়তো এসে জড়ো হয় আরও কয়েক ঘরের মানুষ, শুরু হয় কেচ্ছাকাহিনী বা সুর করে পুঁথি পড়া। সমর্থ পুরুষরা বেরিয়ে পড়ে মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম নিয়ে—বড়শি, ঝাঁকি জাল, হোচা, দুয়ারি—আরও কত কিছু! আষাঢ়-শ্রাবণ এই দু-মাস মিলে বর্ষাকাল—বইতে পড়া এই সংজ্ঞাও অসম্পূর্ণ! বর্ষা শুরু হয় মধ্য-আষাঢ়ে এবং শেষ হয় ভাদ্রের শেষে। মানে, শরত্কালের অর্ধেকই থাকে বর্ষার পেটে! তবে আশ্বিনে এসে শরত্কাল সত্যিই তার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত হয়—আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা আর নদীর তীরে ফুলে ফুলে ছাওয়া কাশবন। আর হেমন্ত? সে তো উত্সবের ঋতু। পাকা ধানের ভারে নুইয়ে পড়া ধানগাছের সোনালি বাহার, কৃষকের চোখে-মুখে-ঠোঁটে চিকচিকে হাসি, বর্ষার দীর্ঘ-অনিশ্চিত কর্মহীন-রোজগারহীন সময়ের ধকল পেরিয়ে সামনে আনন্দময় দিনগুলোর আগমনবার্তা। উত্সবের মতো করে শুরু হয় ধানকাটার আয়োজন, কৃষকের উঠোন ভরে ওঠে ধানে, এমনকী যাদের জমিজমা নেই তারাও এখন খুব ব্যস্ত, অনেক কাজ তাদের, অনেক গুরুত্ব। ধান কাটা, রাত জেগে ধান মাড়াই করা, শুকিয়ে সেদ্ধ করে ভাঙানোর উপযোগী করা—কত কত কাজ। আমার ছোটবেলায় এতসব আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। সব কাজই কৃষকেরা নিজ হাতে করতেন। উঠোনে ধানগাছ বিছিয়ে দু-তিনটে গরু একসঙ্গে বেঁধে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সারারাত ধরে চলতো ধান মাড়াই—মানে গাছ থেকে ধান আলাদা করার কাজ। গ্রামের বাড়িগুলো তখন রাতেও সরগরম। আর ধান ভাঙার কাজটিও হতো ঢেঁকিতে। সকাল-সন্ধ্যা মেয়েরা ধাপধুপ শব্দে চাল বের করে আনতেন ধান থেকে। চলতো নতুন চালে ধোঁয়াওঠা ভাতে ভর্তা-ভাজির অমৃতসমান আয়োজন, পিঠা-পায়েস আর নবান্নের মনকাড়া সমাহার। আবহাওয়াও তখন খুব অনুকূল, আরামদায়ক। ভ্যাপসা গরম নেই, বর্ষা-বাদলের উত্পাত নেই, শীতের প্রকোপও নেই। কেবল একটা মনোরম শীত-শীত ভাব বয়ে আনছে উদাসীন বাতাস। ভোরে শিশিরে ভিজে থাকছে ঘাস, সেই শিশির-ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটলে সারা শরীর জুড়িয়ে যায় আরামপ্রদ শীতলতায়, মনে হয়—জীবন-যন্ত্রণার অবসান হলো এতদিনে। সকালে মৃদু কুয়াশার আড়াল ভেঙে ফুটে উঠছে নরম-মায়াবী রোদ। দুপুরের রোদও তীব্র নয়, বরং আদরমাখা, মনকাড়া। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসছে দ্রুত, রোদটা আবার হয়ে উঠছে মিষ্টি-মায়াবী এবং বিষণ্ন। বিকেলটাও দীর্ঘস্থায়ী নয়। শুরু হতে-না-হতে তার যাওয়ার সময় হয়ে আসে, রোদের রঙ হলুদাভ থেকে কমলা হয়, আর তারপরই আকাশ ভরে ওঠে কনে-দেখা আলোয়! এই আলোর অন্য কোনো নাম হয় না, অন্য কোনো ভাষায় এরকম অদ্ভুত নাম আছে বলেও শুনিনি। সম্ভবত, এ একান্তই আমাদের শব্দ, এ-রকম আলো বোধ হয় আমাদের আকাশেই শুধু ফোটে। একসময় সেই আলোর অপরূপ রঙ মুছে গিয়ে নেমে আসে রহস্যময় বিষণ্ন সন্ধ্যা, আবার মৃদু কুয়াশায় ভিজে যায় সব-সবকিছু। কী যে মায়াময় একটা শীত নামে রাতে! যেন, দীর্ঘ গরমে পুড়ে যাওয়া মানুষকে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়ার জন্য তার এই প্রীতিকর আয়োজন, অথবা আগামী শীতের জন্য প্রস্তুত করে তোলার জন্য, তীব্র শীতের নির্দয় কামড়কে সহনীয় করে তোলার জন্য আসে হেমন্ত, মায়ের মমতা নিয়ে। স্বল্পস্থায়ী সে, তার সবকিছুই মৃদু ও সামান্য, শুধু মমতাটুকু গভীর, অতলস্পর্শী!
এইসব কথা মনে হলে সত্যিই একদিন সব কাজ ফেলে চলে যাই গ্রামে। মৃদু কুয়াশামাখা হালকা শীতের অপূর্ব ভোর দেখি অনেকদিন পর, শিশিরভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটি অনেকক্ষণ, মনে পড়ে—এই অনুভূতির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। কতদূরে ফেলে এসেছি সেইসব দিন? আবার কবে ফিরব? না কি আর কখনো ফেরা-ই হবে না?
হেমন্ত এসেছে। ভোরের মৃদু-মায়াময় কুয়াশা, শিশির ভেজা কোমল-শীতল ঘাস, খালি পায়ে হেঁটে গেলে তাদের আদুরে স্পর্শ, শরীর জুড়ানো হাওয়া, বিকেলের মিঠে রোদ, সন্ধ্যার চরাচরব্যাপী উদাসীনতা, রাতের আরামদায়ক শীত, এ-সবকিছু নিয়েই এসেছে হেমন্ত! কিন্তু...তাতে আমার কি?
