‘ঋতু’ শব্দটিই এক অর্থে কামজাগানিয়া! যদিও বাংলায় ‘ঋতু’ শব্দটির দুটি অর্থ আছে; তবু ‘ঋতু’ শব্দটি শোনা মাত্রই অলক্ষে অগোচরে কোত্থেকে যেন রজঃস্বলা জলের ইন্দ্র-বিবশ-করা ধ্বনি ভেসে আসতে থাকে—কুমারীর গহীন ক্ষরণের ধ্বনি হাওয়ায় বেঘোরে ঘুরতে ঘুরতে যেন লহমায় মিলে যায়! আবার ঋতুর আরেকটি অর্থ-যা কাল বোঝাতে ব্যবহূত হয়—তাও কবিদের কাছে রীতিমতো এক আরাধ্য বস্তু। ঋতুতে ঋতুতে নিসর্গবন্দনা এ যেন কবিসত্তারই এক আদিমতম রূপ। বলা যায় ঋতুবন্দনা উসকে দ্যায় কবিতা লেখার এক ডিটেইলড অনুষঙ্গকে। আর এ ঋতুগুচ্ছের মাঝে হিমজাগা-ঘোরলাগা-পয়মন্ত এক ঋতু হচ্ছে হেমন্ত। শীতের কামড় ধারালোভাবে পড়ার আগেই যে ঋতু অলীক পিয়ন হয়ে জানিয়ে যায় আসন্ন শীতের প্রেসরিলিজ—তাই এই হেমন্ত। আর কবিরা তখন হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান হয়ে ছুটতে থাকেন পুরনো সাইকেলে পুরনো কোনো দুঃখ নিয়ে; ছুটতে থাকেন কবিতাদেবী বা বাগেদবীর পেছনে পেছনে—শব্দ এসে যদি ধরা দেয় হেমন্তের পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা লগবুকে! ‘ও্যড টু অটাম’—রোম্যান্টিসিজমের পুরোহিত কবি কিটস লিখে ফেলেছিলেন কোনো এক ঘুমঘোর হেমন্তে- বাগেদবী বা মিউস এসে ধরা দিয়েছিল তখন তাঁর ডেরায়। আর বাংলা ভাষায় একজন পুরোদস্তুর হেমন্তমোহগ্রস্ত কবি আছেন—হেমন্তে বাগেদবী যার সবকটি বর ঢেলে দিয়েছিলেন এ কবির দরজায়— হেমন্ত যার কবিতায় বারবার হানা দিয়েছে, হেমন্ত দিয়ে যিনি কবিতার ভাঁড়ারে শব্দশস্য তুলেছেন—তিনি জীবনানন্দ দাশ। রবীন্দ্রনাথকে যদি বর্ষামোহগ্রস্ত কবি বলা যায়; তবে জীবনানন্দ নিঃসন্দেহে হেমন্তমোহগ্রস্ত কবি! আর কোনো ঋতু নিয়ে জীবনানন্দকে এতটা আপ্লুুত হতে দেখা যায়নি; আর কোনো ঋতু জীবনানন্দের পঙিক্ততে পঙিক্ততে এতবার ব্যবহূত হয়নি!
জীবনানন্দের এই হেমন্তঘোর বিশদভাবে ধরা পড়ে তাঁর ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থে। ‘অবসরের গান’-এর পরতে পরতে, বলা যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবি আচ্ছন্ন থেকেছেন এক দুরারোগ্য এই ঘোরে! ‘হাতে হাত ধ’রে ধ’রে গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে-ঘুরে/ কার্তিকের মিঠা রোদে আমাদের মুখ যাবে পুড়ে’ বা ‘চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল, তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল’ বা ‘অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার;—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ’—এভাবে কবিতাটির আপাদমস্তক ভরে আছে হেমন্তের ঘোরলাগা সৌন্দর্য; রূপশালি-ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ, ফলন্ত ধানের গন্ধ, শিশুর গালের মতো লাল রোদের নরম রঙ, পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা ভাঁড়ারের দেশ, মাছির গানের মতো অনেক অলস শব্দ। শুধু ‘অবসরের গান’ নয় ‘নির্জন স্বাক্ষর’, ‘পঁচিশ বছর পরে’, ‘কার্তিক মাঠের চাঁদ’, ‘পেঁচা’ কবিতাগুলোয়ও ছড়িয়ে আছে রূপভারাতুর হেমন্তবন্দনা। শুধু ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে নয়; এই হেমন্ত ঋতুকে জীবনানন্দ অনিবার্য করে রেখেছেন তাঁর ‘বনলতা সেন’ কাব্যেও। ‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতায় লিখেছেন—‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দ্যাখা হয় যদি!/ আবার বছর কুড়ি পরে—/ হয়তো ধানের ছড়ার পাশে/ কার্তিকের মাসে—/ তখন সন্ধ্যায় কাক ঘরে ফেরে—তখন হলুদ নদী/ নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়—মাঠের ভিতরে!’ এরই পরম্পরায় জীবনানন্দ তাঁর ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘রূপসী বাংলা’, কাব্যগ্রন্থগুলোয়ও বিশ্বস্ত ও মোহমুগ্ধ থেকেছেন এই হেমন্তের প্রতি।
এ তো গেল জীবনানন্দীয় হেমন্তের কথা। আমাদের ব্যক্তিগত হেমন্তের দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। হেমন্তের পয়মন্ত রূপ কি ধরা দেয় আমাদের প্রযুক্তিপীড়িত নগরসভ্যতায়? হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান হয়ে আমরা কি মুঠো মুঠো চিঠি বিলি করে যাচ্ছি সুতনুকা রাধাদের কাছে? চিঠি-ই তো লিখছি না; পোস্টম্যান পদবীটাই তো এখন বিলুপ্তপ্রায়। চেইনশপ থেকে মোড়কজাত ব্র্যান্ডেড চাল কিনছি; নবান্নের উত্সবজাগানিয়া রূপশালি ধানের গন্ধ কোথায় পাব? অঘ্রান প্রান্তরে হেঁটে হেঁটে ডুুমুরের পাতা, বাতাসে ধানের শব্দ, মধুকূপী ঘাস, কিশোরী-ঘুঙুর পরা শাদা হাঁস, লক্ষ্মীপেঁচার ডাক, গঙ্গাফড়িঙের নীড়, বেতের নরম ফল, কলমির ঝোপ, সরপুঁটির মৃদু ঘ্রাণ, জলসিঁড়ি নদীটির পার, খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যা, গাঙুরের জল, পশমের মতো লাল বটফল, আকন্দ বাসকলতা ঘেরা নীল মাঠ, চালধোয়া ভিজে হাত, ধানমাখা চুল—এইসব দৃশ্যের পর দৃশ্য এখন কোথায় খুঁজে পাব? যদিও গ্লোবালাইজড দৃশ্যাবলী এখন লহমায় দেখতে পাচ্ছি; জোকারবার্গের ফেসবুকের কল্যাণে এই দৃশ্যগুলোর ব্যাপক পোস্ট-আনপোস্ট হচ্ছে। যেখানে লাইক-ডিসলাইকের খেলাও চলছে সমানতালে। কিন্তু খালি চোখে, খালি পায়ে কি একবারও দেখে নিচ্ছি হেমন্তের জীবনানন্দীয় রূপ? একবারও কি দেখে নিচ্ছি মাইল মাইল সুপুরির বন, ঘাসের ভেতর পড়ে থাকা অশ্বত্থসারি, শাড়ির ভেতর লেগে থাকা খড়কুটো, ছায়া-রোদ-খুদ-কুঁড়ো তথা হেমন্তের রূপ? আর দেখছিই না যদি হেমন্তে কবিতাদেবীর কাছে দু’হাত শূন্যে তুলে কবিতার জন্য কেন এই প্রার্থনা? বাগেদবীর পেছনে পেছনে কেন দিগ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলা? জীবনপাঠ না করে কেন এই নেটসর্বস্ব ওয়েবপাঠ? হেমন্তের মোহমুগ্ধ শব্দশ্রমিকদের জন্য বাগেদবী কি আসবে এই ওয়েবসংকুল অরণ্যে?
