বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র
ফাহমিদুল হক
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০১২
প্রকাশক : অ্যাডর্ন পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
মূল্য : ১৫০টাকা।
১৮৫৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর অগাস্ট লুমিয়ের ও লুই লিমিয়ের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন প্যারিসে । অম্বুজ গুপ্তের হাত ধরে ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় ১৯২৭ সালে। এরই মধ্যে বিশ্ব চলচ্চিত্র এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। যদিও বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ আব্দুল জাব্বার নির্মাণ করেন ১৯৫৬ সালে। এরপর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গভীরতা, টেকনোলজি এবং টেকনিকের রূপান্তর ঘটেছে। এরই মধ্যে আমরা অনেকগুলো বছর অতিক্রম করেছি। এই জন্য সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ভাবনায় ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রসঙ্গটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত করেছে নিঃসন্দেহে। ফাহমিদুল হকের এই গ্রন্থে বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা, প্রবণতা ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র নিয়ে লেখকের ২০১০ সালের গবেষণার মূল বিষয়বস্তুর কিছু অংশ এই বইয়ে সংকলিত। এখন বিশ্বব্যাপী ৩৫ মিমি ফরম্যাটের চলচ্চিত্র নির্মাণ কমে আসছে। বাড়ছে ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা। আগামী কয়েক বছর পর হয়তো সেলুলয়েড ফিতার চলচ্চিত্র নির্মাণ একেবারে বন্ধ হয়ে আসবে। চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে ‘সম্পূর্ণ-ডিজিটাল’ ফরম্যাটে। সম্পাদনার বৈচিত্র্য এবং ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরার ক্রমাগত উন্নতি এই পরিবর্তন এনেছে। আমেরিকায় ২০০৬ সালের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ চলচ্চিত্র সম্পাদনা ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে আমেরিকায় নির্মাণ থেকে প্রদর্শন সবকিছুই হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। যদিও বাংলাদেশে এই পদ্ধতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তবে অনেকের মতে ৩৫ মিমি ফরম্যাটে যে ডেপথ অব ফিল্ডসহ অন্যান্য নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রয়েছে যা ডিজিটাল মাধ্যমে সম্ভব নয়। যেসব দেশে ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সর্বাধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, সেসব দেশে ডিজিটাল চলচ্চিত্র এখন পর্যন্ত ৩৫ মিমি সেলুলয়েডে প্রতিস্থাপন করে প্রদর্শন করা হচ্ছে। সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন চলচ্চিত্র ধারণ, সম্পাদনা ও প্রদর্শন ইত্যাদি সবকিছু ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় চলে আসবে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে কেউ কেউ বিপ্লবী, অনেকেই বিবর্তনবাদী, অনেকেই প্রতিবাদী। হলিউডের পরিচালক জেমস ক্যামেরন, ডেভিড ফিনচার, জর্জ লুকাস, ডেভিড লিঞ্চ, রবার্ট রডরিগুয়ে ও লার্স ভন ট্রায়ার মনে করেন সেলুলয়েড ফিল্ম এখন মৃত এবং ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রনির্মাণ প্রক্রিয়ার পুরোটাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে হবে। তবে অনেক পরিচালকই আছেন যারা ৩৫ মিমি ফরম্যাটে চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যাবেন। তাদের মধ্যে আছেন টিম বার্টন, মার্টিন স্করসিস, রিডলি স্কট, অলিভার স্টোন ও কুয়েন্তিন তারান্তিনো। অনেকে মনে করেন ৩৫ মিমি ফরম্যাটে যে ডেপথ অব ফিল্ডসহ অন্যান্য নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রয়েছে তা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। অন্যদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তি যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে তাতে ডিজিটাল ফরম্যাটেরই গণতন্ত্রায়ণ ঘটেছে। বিশেষত এখন যে-কারও পক্ষেই চলচ্চিত্রকার হওয়া সম্ভব। কারণ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলচ্চিত্রনির্মাণে কেবল খরচই কমে না শুটিং ও সম্পাদনার অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। খোদ হলিউডের স্টুডিওতে কল্পনার ডালপালাকে ছড়িয়ে ফ্যান্টাসি ছবি নির্মাণে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল ফরম্যাট নির্মাতাদের অন্তত দুইভাবে সাহায্য করতে পারে। এক. ৩৫ মিমি ফরম্যাটের তুলনায় এর খরচ কম; দুই. ডিজিটাল নন্দনতত্ত্ব পরিচালককে চলচ্চিত্র-ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা করার সুযোগ করে দেয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৫০ সালে নির্মিত ৫০ শতাংশ ছবি এবং ১৯২০ সালের আগে নির্মিত ৮০ শতাংশ ছবিই চিরতরে হারিয়ে গেছে শুধু এনালগ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কারণে। এক সাক্ষাত্কারে ইরানি পরিচালক সামিরা মাখমালবাফ ডিজিটাল চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেন— বহিঃস্থ তিন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ঐতিহাসিকভাবে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সৃজনশীলতার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ওগুলো হলো— রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রাযুক্তিক। আজ ডিজিটাল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্যামেরা এই ধরনের সব নিয়ন্ত্রণকে অতিক্রম করবে। আমাদের মিনেমা নির্মাণে সমস্যা ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তারেক মাসুদ (২০১০) বলেছিলেন, বাংলাদেশের সমাজ সেরকম পরিপক্ব একটা জায়গায় এসে পৌঁছয়নি এবং ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র নির্মাণ করার সময় এখনো আসেনি। আবার নূরুল আলম আতিক বলেন, এক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের পক্ষপাতী। তিনি বলেন, আমরা যদি একটা জায়গায় স্টপ হয়ে যাই, যে সিনেমা এইরকম, তাহলে বিপদের কথা। সিনেমা হবে বিভিন্ন রকম। শিশুদের ছবি হবে, আদিবাসীরা নিজেদের ভাষায় ছবি করবে, তাহলে আমাদের সিনেমায় বৈচিত্র্য আসবে। উন্নত হবে। এই বইয়ে তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, নূরুল আলম আতিক, টোকন ঠাকুর এবং সদ্য প্রয়াত বেলায়েত হোসেন মানুনের দীর্ঘ সাক্ষাত্কার রয়েছে। যাতে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন।
