নারী আন্দোলনের পথিকৃত্ হিসেবে যাঁরা বিদ্যাসাগরকে জানেন, তাঁরা একথা নিশ্চয়ই জানেন—বিধবা বিবাহ বা স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ক যে সমস্ত আন্দোলন তিনি করেছিলেন, তা মূলত বাঙালি হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ বিধবা বিবাহ মুসলমান সমাজে কোনো আন্দোলন ব্যতিরেকেই স্বীকৃত ও সুপ্রচলিত ছিল। আর স্ত্রী শিক্ষার ক্ষেত্রে মৌলবাদী মুসলমান সমাজ যেটুকু উদারতা দেখিয়ে এসেছে তা তার ধর্মীয় সংস্কার রক্ষার্থে ধর্মগ্রন্থ পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেক্ষেত্রে আজকের মুসলমান সমাজের মেয়েরা যতখানি শিক্ষাপ্রাপ্ত তার সম্পূর্ণ গৌরব প্রাপ্য মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার। যাঁর কাজ-কর্মের একমাত্র তুলনা চলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গেই।
অদম্য মনোবল নিয়ে রোকেয়া একা লড়াই চালিয়ে গেছেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন এই সমাজ দেহের দুটি চোখ—নারী ও পুরুষ। তিনি বলতেন, ‘আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কত দূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে—একই।’ তিনি চাইতেন নারীও শিক্ষায়, জ্ঞানে, কর্মে, পুরুষের সমান যোগ্য হয়ে উঠুক। তিনি বলতেন, ‘আমরা অকর্মণ্য পুতুল জীবন বহন করিবার জন্য সৃষ্টি হই নাই, এ কথা নিশ্চিত।’
১৯০০ সালের প্রথমদিকে অনেক মুসলিম সংগঠন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেইসব সংগঠন কখনো স্ত্রী শিক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। রোকেয়া এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছিলেন। ১৯১৮ তে তিনি লিখলেন, ‘... দ্বার যে বন্ধ। গৃহে যে গৃহিনী, ধর্মে যে সহধর্মিণী, ভাবি বংশধরের যে জননী, ভবিষ্যত্ আশাভরসার যে রক্ষয়িত্রী ও পালনকর্ত্রী তাহাকে সঙ্গে না লইলে আপনি গন্তব্যস্থানে পৌঁছুতে পারবেন না।... না জাগিলে সব ভারত ললনা আর জগিবে না।’ এখানে রোকেয়া ধর্ম সম্প্রদায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভরতের একজন নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল মুসলমান নারী সমাজের জাগরণে শিক্ষার বিস্তার।
বেগম রোকেয়ার স্বামী মৃত্যুর আগে মুসলমান মেয়েদের শিক্ষার জন্য ১০ হাজার টাকা দান করেন এবং স্ত্রী রোকেয়ার নামেই একটি ট্রাস্টিও ঠিক করেন। স্বামীর মৃত্যুর পাঁচমাস পরে ১৯০৯-এর ১ অক্টোবর তিনি ভাগলপুরে একটি মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এরপরে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় গিয়ে ১৯১১-এর ২৬ মার্চ নতুন উদ্যোমে ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল শুরু করেন। আস্তে আস্তে সেখানে মেয়েদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন ১৩ নং বাড়িতে আর স্থান সংকুলান হয় না। অতঃপর ১৩ নং ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে স্কুল সরিয়ে নেওয়া হয়। সেটা ১৯১৩ সালের ৯ মে মাসের ঘটনা। ১৯১৫-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি এই স্কুল ৮৬/এ লোয়ার সার্কুলার রোডে চলে যায়। পাঁচটি ক্লাস এবং ৭০ জন ছোটবড় মেয়ে ছিল ছাত্রী। এছাড়া ছিল দুখানা গাড়ি, দুই জোড়া ঘোড়া, সহিস, কোচম্যান ইত্যাদি। সবদিকেই দৃষ্টি দিতে হতো রোকেয়াকে।
১৯৩০-এ সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। তিনি বলতেন, ‘শিক্ষার অর্থ কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষের অন্ধ অনুকরণ নহে।...আমরা কেবল পাস করা বিদ্যাকে প্রকৃত শিক্ষা বলি না।’
সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল স্থাপনের পেছনে ছিল রোকেয়ার আদর্শ আর অদম্য মনের জোর। স্কুলের একটা সমস্যা ছিল সে সময়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষিকার অভাব। ১৯১৯ সালে ইংরেজ সরকার একটি মুসলিম ট্রেনিং স্কুল খোলে। যারা এখানে ট্রেনিংয়ের জন্য গিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন সাখাওয়াত স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী।
১৯১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সরোজিনী নাইডু এক চিঠিতে রোকেয়াকে লেখেন, ‘...কয়েক বত্সর হইতে দেখিতেছি, আপনি কি দুঃসাহসের কাজ করিয়া চলিয়াছেন। মুসলমান বালিকাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আপনি যে কাজ হাতে নিয়াছেন এবং তাহার সাফল্যের জন্য দীর্ঘকালব্যাপী যে ত্যাগ সাধনা করিয়া আসিয়াছেন, তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর। ... আপনার এই ভগ্নী, দূর হইতে বরাবর আপনার আদর্শকে এবং আপনার কর্মময় জীবনকে কিরূপ শ্রদ্ধার চোখে দেখিয়া থাকে, তাহা জানাইবার জন্যই এই চিঠি।’ সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে কীভাবে কাজকর্ম হবে, কীভাবে পড়াশোনা হবে, তা বোঝানোর জন্য রোকেয়া দিনের পর দিন বেথুন এবং গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলে গিয়ে বসে থাকতেন। পড়ার সময় ছাত্রীদের সঙ্গে ক্লাস রুমেও তাকে দেখা যেত। যেহেতু তার বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি, সুতরাং কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি তা এভাবে সঞ্চয় করেন।
স্ত্রী শিক্ষাকে তিনি বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি। একটা সামাজিক অবস্থা এবং শর্ত হিসেবেই দেখতেন এবং এর গুরুত্ব অনুভব করতেন। তিনি বলেছেন, স্ত্রী শিক্ষার কথা বলিতে গেলেই আমাদের সামাজিক অবস্থার আলোচনা অনিবার্য হইয়া পড়ে।
আমি আজ ২২ বত্সর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি।...সে জীব ভারত নারী। এই জীবগুলির জন্য কখনো কাহারও প্রাণ কাঁদে নাই।’
উনিশ শতকের শেষভাগে কয়েকজন মুসলমান যুবকই প্রথম মুসলমান মেয়েদের সম্মানে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে আন্তরিক চেষ্টা করেন। সেই লক্ষ্যে তারা ১৮৮২ সালে ঢাকায় ‘সুহূদ সম্মিলনী’ নামে একটি সমিতি স্থাপন করেন। সমিতির মাধ্যমে ওই কয়জন যুবক স্ত্রী শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতার উদার বাণী প্রচার করতেন। ১৮৮৬-৮৭ পর এই সমিতি সম্পর্কে আর কোনো তথ্য জানা যায়নি।
এদিকে ওই ১৮৮৭ সালেই ঠাকুরবাড়ির স্বর্ণকুমারী দেবী প্রতিষ্ঠা করেন ‘সখি সমিতি’। উনিশ দশকের শেষার্ধে বাংলার এই প্রতিভাময়ী বিদূষী স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখি সমিতি’র কার্যকলাপও কিন্তু প্রধানত হিন্দু সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলমান নারী সমাজের জন্য একটি স্বতন্ত্র নারী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি। রোকেয়া একেবারে শৈশব থেকে দেখেছিলেন মুসলিম নারী সমাজের পশ্চাদপদতা, যুগ যুগের কুসংস্কার। এসব দূর করার জন্যই এই সংগঠন স্থাপন করেন তিনি। তাঁর সারা জীবনের সাধনার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল স্ত্রী শিক্ষা আর এই সংগঠন।
অজস্র বিধবাকে অর্থ দান করে এই সংগঠন। চরিত্রহীন স্বামীর অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে বহু অসহায় বধূকে রক্ষা করেছে এবং বয়ঃপ্রাপ্তা দরিদ্র কুমারী মেয়েকে সত্পাত্রের হাতে তুলে দিয়েছে এই সংগঠন। এছাড়া অভাবগ্রস্ত মেয়েদের শিক্ষাদানে সাহায্য করেছে, সমাজ পরিত্যক্তা ও দুঃস্থ মেয়ে এবং অনাথ শিশুদের সাহায্য করেছে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’। বাংলার গৃহবন্দী মহিলা সমাজকে বাইরে আলোর সন্ধান দিয়েছে রোকেয়ার এই সংগঠন।
সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার জন্য রোকেয়া কলকাতার বিভিন্ন বাড়ির দরজায় দরজায় ঘুরেছেন।
জাতির স্বার্থে নারী মুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে কাজ করে গেছেন তার সাক্ষী ইতিহাস। দেশের পটভূমিতে একদিকে নারীমুক্তির অন্তরায়গুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন অন্যদিকে নারীর বিকাশ, প্রকাশ ও প্রয়োগের দিকগুলোর প্রতি আন্তরিকতার সঙ্গে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা শুধু এদেশের নারী সমাজের জন্য নয় বিশ্ব নারী সমাজের জন্যেও সত্য।
বেগম রোকেয়ার এই কাজ খুব সহজে সফল হয়নি। অত্যন্ত দুর্গম পথ হেঁটেই তিনি বাংলার নারী সমাজের জন্য একটা মসৃণ পথ তৈরিতে ব্রতী হয়েছিলেন এবং তিনি জয়যুক্ত হন।
তাই তিনি বাংলার নারী সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন যুগে যুগে। আর নারী সমাজ কোটি কোটি বছর বহন করবে সেই অপরিশোধ্য ঋণ। তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
