বাবলি,
তবু নিরন্তর কাটিতেছি সময় করাত
প্রতি রাতে ঘুম ফালি করি
কাটি করোট কাজল আর সব মৌতাত।
ধার মরে গেছে,
মরচে ও মানুষেরা এক হয়ে গেছে,
সাদা হয়ে গেছে আজ সকল সবুজ।
মনে কি পড়ে সই,
কী বুঁদ ছিলাম
বোদলেয়ারে আমি আর তুই!
ক্লেদজে কুসুমে,
টিএসসি, তোপখানা,
স্টেডিয়াম, পিঠাঘরে
ওই আশ্চর্য মেঘদল ভালোবেসে।
কলাভবনে কালকেতু ফুল্লরার পুই রঙা ভোরে
নীলিমা ইব্রাহীমের ত্বত্ত ও তাঁতের শাড়ির পাটে পাটে
সন্ত মুনীর চৌধুরীর পেছনে পেছনে
উঠে গেছি প্রকৃতির ট্রেনে
টলস্টয়ের সঙ্গে ঠাণ্ডা রেল স্টেশনে
রোদ শক্ত হলে শিশু ইউকেলিপ্টাসের বাউড়ি বাতাসে
দুই পাগলিকা পুণ্য পুণ্য বলে নতুন পাজরের খোঁজে
আজানের আগেই বসে গেছি সি পি স্নো-
রাশিদুল হাসান সকাসে।
তখনই পুরু চশমা চোখে নাসিম হঠাত্
টেনে নিয়ে গেছিল নভেরার ভাস্কর্য যেখানে,
‘একি কথা! ভাষণ শোনোনি! এতদিন কোথায় ছিলে?’
আগুনের গন্ধে উঠে দেখি
আমার গা পুড়ে যাচ্ছে
একাত্তর ২৬ মার্চ:
হাঁটু ভেঙে পড়ে গেছে শহীদ মিনার,
শরীফের চা বিষ হয়ে গেছে,
পাঠাগার পীঠস্থান নির্বাক,
আর নির্মলেন্দু গুণ, শ্রাবণীদের জানালা ও জোয়াল
সবই পুড়বার অপেক্ষায়
আর দিকদর্শন জি সি দেবও দাঁড়ানো সেখানে।
তারপর খই রঙা হাঁসগুলো বধ করে নিয়ে গেল তারা
শবদেহ শহরে, গ্রামে, ধানমন্ডি ও রাজারবাগে
উড়ন্ত ইস্পাত ব্লেডে ফালি ফালি আমি আর তুই
বকুলরা আগারতলায়
আমাদের যে গুটিকয় লটেক ছিলাম
ছাদে, রোকেয়া হলে
তিনদিন তিনরাত বারুদে বারুদে
বার্জের ভেতরে—
অতপর আমাদেরই দেহগত পলি আর নুরে
পারদে পারদে
সহপাঠী শাহরিয়ার ও নজরুলের সহযাত্রী হয়ে
ক্ষত্রীয় মৃত্যুতে
ইঞ্চি ইঞ্চি করে ইচ্ছেভূমি গজালো
ব্যাপক বধ্যভূমির বালি ভেঙে
উঠে এল সেই পরিপূর্ণ পূর্ণিমা।
র্দীঘ মরণ দেখে দেখে কুমিল্লা থেকে
তুই ফিরে এলি হেঁটে
হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যুদ্ধাহত গেরিলারা আর
কনুইয়ে কালো দাগ নিয়ে ফিরে এল পরিশ্রান্ত বকুল।
তারপর চল্লিশ বছর—
আজো জানি না সেই গালে টোল পড়া গাল
আমার যুদ্ধের ভাই
কোথায়, বুলবুল?
বাবলী,
এভাবেই কি প্রাচীন গর্তে পড়ে
পৃথিবীও প্রথম অঙ্গার মেখেছিল
মেঘ দেখে ডাহুকের গ্রাম ডুকরে কেঁদে উঠেছিল?
জানিস কি তুই, কতটা ক্ষত খুললে পরে সুতো ছিঁড়ে
পাল উঠে দাঁড়ায়?
কত বছর দুঃস্বপ্নের গুঁড়ো গিলে গিলে
মেট্রোর মিলানে পৌঁছানো যায়?
রক্ত কুয়ো আর কতটা গভীর হলে
তবে আমাদের পিতা-শহীদ শিক্ষকগণ
নিমোনিক নৈবেদ্য নিয়ে আসবেন
এই এন্তার রাতে
জননী জাহানারার জরায়ু দিবসে!
বাবলী,
বিলেতের ব্লসমে এ কলমি-কাহিনিগুলো
কেন এত লাল হয়ে যায়
স্নায়ু থেকে স্মৃতি ঝরে আর্শ্চয রকম
দরদর করে ঘামে দেহ আর চারটি দশক
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর যেমন
আশ্চর্য মেঘদলের টানে!
আবার বাংলা একাডেমী বটমূলে
বইমেলার অক্ষর নদে
জাহাঙ্গীর আর আলী ইমাম সকাশে
নড়েচড়ে উঠেছি সে আগুনের মনে
স্রোতস্বতী স্মৃতি ধরে পুনরায় সেই উঁচুতে,
রহস্যময় মানুষ ও চলিষ্ণু মেঘের সাথে
মানবতা হননকারীদের চির বিনাশের প্রত্যাশে
দুর্বহ বেদনা ভারে সই
তবু ওই ফেটে যাওয়া ঢাকার ফাগুনে।
