ভারতের ৯০ শতাংশ কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৩২
ভারতের পূর্বাঞ্চলে ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ নামক স্থানের পিপারওয়ার ওপেন-পিট মাইনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হলেও তা কোন কাজই দিছে না। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আয়েশে তুলে যাচ্ছে কয়লা; কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস উদগীরণের ব্যাপারে তারা নির্বিকার। এছাড়া যেন কিছুই করার নেই তাদের। পিপারওয়ার কয়লাখনিটি রাষ্ট্র পরিচালিত। এখান থেকে উত্তোলিত হচ্ছে নিম্নমানের কয়লা। অন্যান্য খনি থেকেও উত্তোলিত হয় প্রায় একই মানের ময়লা। তা সত্ত্বেও ভারতে এ কয়লাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’। বিদ্যুত্ উত্পাদনে এ বস্তুটির অবদানই সিংহভাগ। কিছুদিন আগে ভারতের প্রায় অর্ধেক লোক ডুবে গিয়েছিল অন্ধকারে। কয়লা ছাড়া থেমে যাবে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। কারণ দেশটির তেল ও গ্যাস উত্পাদন হতাশাব্যঞ্জক। হাইড্রোপাওয়ারেও খুব একটা এগোতে পারেনি। কাজেই কয়লার উপর নির্ভরতা অদূর ভবিষ্যতে কমার কোন সম্ভাবনা নেই। এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশ ভারত। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কয়লাই তাদের প্রধান ভরসা। কয়লার মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশই মিটে থাকে অভ্যন্তরীণ উত্পাদন থেকে। এখন সমস্যা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলনে যথাযথ বিনিয়োগ না করলে এক দশকের মধ্যেই কয়লা সংকট প্রকট হয়ে উঠবে। অধিক পরিমাণে কয়লা আমদানি করতে গেলে ব্যাহত হবে শিল্পোন্নয়ন, কমে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিদ্যুত্ কোম্পানির উচ্চতর এক নির্বাহী মন্তব্য করেন, কয়লার বিস্ফোরিত চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সস্তা পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছে ভারত। এক্ষেত্রে সরকার পরিবেশ ও সমাজের কথা চিন্তা করছে না। কিন্তু দশ-বার বছর পর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আর কয়লা উত্তোলন করা যাবে না। তখন দারুণ সংকটে পড়বে ভারত। কোল ইন্ডিয়া ভারতের রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তারাই ৮০ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিংয়ের অবদান এখন পর্যন্ত খুবই কম। প্রতি দশ টনের মধ্যে এক টন উত্তোলন হয় ডিপ মাইনিং থেকে। উচ্চমূল্য এবং কম উত্পাদনের কথা চিন্তা করেই সরকার সহজ পথটি বেছে নিয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ডিপ মাইনিংয়ের অবদান ১৭ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। ভারতের সবচেয়ে কয়লাসমৃদ্ধ রাজ্য ঝড়খণ্ডের ইন্ডিয়ান স্কুল অফ মাইনস্-এর পরিচালক জানিয়েছেন, ভারত যেভাবে কয়লা উত্তোলন করে যাচ্ছে তাতে খুব সহসাই ভয়ংকর বিপদ নেমে আসতে পারে। সতর্ক হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়রা উত্তোলনের দিকে জোর না দিয়ে ডিপ মাইনিংয়ে মনোযোগী হওয়া উচিত। এতে সবদিক থেকেই মঙ্গল হবে। কিন্তু সরকার শুধুমাত্র খরচের কথাটিই চিন্তা করছে। তার মতে, ওপেন পিট-মাইনিংয়ের উপর নির্ভরতা প্রতি বছর ৫ শতাংশ পয়েন্ট না কমালে চলতি দশক শেষেই উত্পাদন স্থবির হতে শুরু করবে। ২০১৬ সালে ভারতের প্রয়োজন পড়বে ৭৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে চাইলে এখন থেকেই তাদের উত্তোলন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এ কাজ মোটেই সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং খুব সহজ কাজ নয়। এ পদ্ধতিতে একটি খনি থেকে উত্তোলনে যাওয়ার জন্য সময় লাগে গড়ে ৬ বছর। কিন্তু সে পন্থাকে প্রাধান্য না দিয়ে চীনের মতোই প্রাচীন পদ্ধতিকে বেছে নিয়েছে ভারত। চীন প্রতি বছর ৩.৫ বিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে। এক্ষেত্রে উভয় দেশ একই কৌশল বেছে নিয়েছে। কম পরিশ্রম ও খরচ; কিন্তু অধিক লাভ। এ সম্পর্কে কোল ইন্ডিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পার্থ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘যখন ভারতে কয়লা উত্তোলনের সব কিছু ভূগর্ভস্থ ছিল তখন প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ শতাংশের কম। আমাদের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন ৬ শতাংশেরও উপরে। কাজেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করে উপায় নেই। পরিবেশ ও সমাজের কথা ভাবলে আমাদের অগ্রগতি থমকে যাবে। এটি অন্তত কেউই চায় না।’ ধারণা করা হয়, ভারতে কয়লা সঞ্চিত রয়েছে ২৮৬ বিলিয়ন টন। দেশটি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্ কয়লা সরবরাহকারী দেশ। এ তথ্য জানিয়েছে বিপি। ডিপ মাইনিংয়ের উপর গুরুত্বারোপ না করলে খুব শীঘ্রই কয়লা সংকট নেমে আসতে পারে ভারতে। কারণ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন পড়ে। আর ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে খনির জন্য জমি পাওয়া ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, জোরালো হচ্ছে ভূমি অধিকার ও ভূমি অধিগ্রহণ আইন। চাইলেই এখন আর আগের মতো জমি কেনা যায় না। এটি প্রমাণের জন একটি উদাহরণই যথেষ্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি ভারতের উড়িষ্যায় স্টিল প্লান্ট স্থাপনের জন ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করে ২০০৫ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা জমিই বুঝে পায়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে ভারতের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ বিদেশি বিনিয়োগ। — আই এইচ টি অনুসরণে