যক্ষ্মা আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গে এবং অংশে হতে পারে। আমাদের শরীরের এমন কোন অংশ নেই যা যক্ষ্মার ছোঁবল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। আমরা প্রায় সকলেই জানি যে, যক্ষ্মা সাধারণত ফুসফুসেই হয়ে থাকে। তখন রোগীর জ্বর, কাশি, বুকে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, রাতে ঘাম হতে দেখা যায়। আবার অনেকে গ্ল্যান্ড টিবির নামও হয়তো শুনেছেন। যেখানে ঘাড়ের পাশে বড় বড় গ্রন্থি ফুলে উঠে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, আজকাল প্রচুর সংখ্যক গ্ল্যান্ড টিবির রোগী দেখা যাচ্ছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি যে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মেয়েদের মধ্যে গ্ল্যান্ড টিবি হতে বেশী দেখা যায়। যদিও যে কোন বয়সে এবং পুরুষের মাঝেও গ্ল্যান্ড টিবি অবশ্যই হতে পারে।
নাড়িতে টিবি হয়েছে এমন এক মেয়ের ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। মেয়েটির বয়স ২২ বছর। আড়াই বছর আগে বিয়ে হয়েছে। দেড় বছরের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে তার। স্বামী বিদেশে থাকে। প্রায় ১ বছর ধরে মেয়েটি বমি করে। চিকিত্সকগণ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পেপটিক আলসার ভেবে আলসারের বিভিন্ন চিকিত্সা দিয়েছেন। কিন্তু রোগ সারেনি। যেটাই খায় তাই বমি করে ফেলে। মেয়েটির পেট পরীক্ষা করে দেখা গেলো, কয়েকটি চাকা। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো অপারশনের মাধ্যমে দেখতে হবে যে পেটের ভেতর কি আছে। পেট কেটে দেখা গেলো নাড়ির পাঁচটি জায়গায় চাকাগুলো পুরো নাড়িকে বন্ধ করে দিয়েছে। বায়োপসি করে দেখা গেলো চাকাগুলো যক্ষ্মার ফলেই হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করতে দেয়া হলে রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। অন্য আর একটি রোগীর কথা বলি। তার বয়স পঞ্চাশ হবে। পেট বেশ ফোলা। কোন কোন চিকিত্সক সিপেসি সন্দেহ করেছিলেন। কারণ পেটে ছিলো প্রচুর পানি। আলট্রাসনোগ্রাম করেও দেখা গেলো পেটে পানি কিন্তু এক চিকিত্সকের সন্দেহ হলো, বোধ হয় পেটে অন্যকিছু থাকতেও পারে। রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে বুঝিয়ে অপারেশন করা হলো। সার্জন লক্ষ্য করলেন, পেটের ভেতর জায়গায় জায়গায় রয়েছে যক্ষ্মার জীবানু টিউবারকল। বায়োপসি করেও দেখা গেলো যক্ষ্মা। আর যক্ষ্মার ওষুধ দেয়ার ফলে একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীও খুঁজে পেলো নতুন জীবন। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, সব সিরোসিস বা পেটে পানির কারণ যক্ষ্মা নয়। এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। এমন আরো অনেক রোগী আছেন যারা কিডনির প্রদাহে মাসের পর মাস ভূগছেন। প্রচুর এন্টিবায়োটিক খেয়েছেন অথচ ভালো হচ্ছেন না। যক্ষ্মা সন্দেহ করে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর চিকিত্সা দেয়াতে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছেন। অনেক বন্ধ্যা মহিরার ঘটনা জানি, যাদের জরায়ুতে যক্ষ্মার জীবানু পাওয়া গেছে। পরে ওষুধ ব্যবহার করার পর তারা সন্তানের মা হতে সক্ষম হয়েছেন।
আমার চেম্বারে এমন অনেক রোগী আসেন যাদের মাসের পর মাস জ্বর ছাড়ছে না অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও তেমন কিছু ধরা পড়ছে না। অথচ যক্ষ্মার ওষুদ টেস্ট ডোজ হিসেবে প্রয়োগ করার পর জ্বর ছেড়ে গেছে। সার্জন ক্রোফটন একদিন একটি কনফারেন্সে আমাকে বলেছিলেন, তোমাদের মতো অনুন্নত দেশে জ্বরে আক্রান্ত কোন রোগীকেই এক কোর্স যক্ষ্মার ওষুন না খাইয়ে মরতে দেয়া উচিত নয়। কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে প্রায় ৬ লাখ ছোঁয়াছে যক্ষ্মা রোগী রয়েছে এবং প্রায় ৫০ লাখ সন্দেহজনক যক্ষ্মা রোগী রয়েছে সেখানে অন্য কোন রোগের উপস্থিতি নির্ণয় করতে না পারলে যক্ষ্মা সন্দেহ করে অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কারণ যক্ষ্মা বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঘাতক ব্যাধি। মরণ ব্যাধি এইডস-এর আবির্ভাবে যক্ষ্মা আরো নতুন নতুন রূপে আবির্ভূত হবে এটাই আশঙ্কা করা যেতে পারে।
এক রোগীর কথা মনে পড়ে। তার বয়স ২৮ বছর। জ্বরে ভুগছেন। এক্সরে পরীক্ষায় দেখা গেলো হূদপিন্ড বেম বড় হয়ে গেছে। ইকোকার্ডিওগ্রাম করে দেখা গেলো হূদপিন্ডের পর্দায় পানি জমেছে। রোগীটিকে আমি সরাসরি যক্ষ্মার ওষুধ প্রয়োগ করাতে জ্বর কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে গেলো। এমন অনেক ঘটনা এবং অনেক অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের চিকিত্সকদের রয়েছে। এখানে যক্ষ্মার কিছু ভিন্ন ভিন্ন রূপের কথা উল্লেখ করলাম। যদিও আরো অনেক রোগ যেমন-ক্যান্সার, সরকয়ডোসিস রয়েছে যা বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হতে পারে। তবে যক্ষ্মার ব্যাপারে একজন চিকিত্সককে সব সময়ই মনের সন্দেহের জানালা খুলে রাখতে হবে। তা না হলে অনেক সয় অতি পরিচিত একটি রোগ নির্ণয় পর্দার আড়ালেই রয়ে যাবে। অথচ যক্ষ্মা এমনি একটা রোগ যা ওষুধ পরিপূর্ণ মাত্রায় খেলে এবং নিয়মিত খেলে রোগী সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়।
