ঘটনাতো তখন অনেক ঘটেছে। তবে ভয়াবহ যেই ব্যাপারটা হয়েছিল তার মধ্যেই ছিলাম, ওটাই আমার ভাবতে কষ্ট হয়, তখনকার মানুষগুলো যেই কষ্ট করেছে, ত্যাগ, প্রাণ দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে। যেই মানুষগুলো এত ত্যাগ করেছে সেই মানুষগুলোই যেন এখন অনেক পাল্টে গেছে। মানুষ পরিবর্তনশীল জানি, কিন্তু মানুষ এতটা স্বার্থপর হয়ে যায় কীভাবে? সেই তারাই এখন দেশের জন্য ভাবে না। এগুলো আমাকে খুব কষ্ট দেয়। ’৭১-এর ১০ মার্চ আমি ঢাকায় আসি। ঢাকায় তখন আমাদের নিজের বাড়ি। কিছুদিন পরই ২৫ মার্চ চলে এল। আমার জীবনে সেই রাত আমি ভুলব না। যারাই সেই রাতের স্বাক্ষী ছিলেন তাদের জন্য সেই ভয়াল রাতটা ভোলা কঠিন। অনেক সময় ভাবতে অবাক লাগে এইরকম গুলি-বোমা, চারিদিকে আলো। ওই রাতে তো আমরা ভেবেছিলাম বোধহয় বাজি ফুটছে। চিন্তাই করতে পারিনি, আমরা সবাই ছাদে গিয়েও দেখেছি এই রাতে। আগুনের গোলা উপরে উঠছে সেগুলো দেখেছি। কিন্তু যখন বুঝতে পেরেছি যে এগুলো তো বাজি ফুটানো নয়, তখন ঘরে চলে এসেছি। সেই ভয়াবহ রাতটা কোনোদিন ভুলতে পারব না। সারারাত দাঁড়িয়েই কাটালাম। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে, ভোর হয়ে গেল, ভাবতে ভাবতেই কাটলা সারাটা রাত। সেই প্রথম রাত। ওই এক রাতের কথা খুব বেশি মনে হয়, এখনও। তারপর সকাল বেলায় আমাদের বাড়ির ছেলেরা, স্বামী-বাবা সবাই বাহিরে দেখতে বেরুল। তারা এসে বলল সব শশ্বান হয়ে গেছে। আমাদের একজন পরিচিত ধোপা ছিল। ওর বাড়িসহ পরিবারটাকে একেবারে ছাই করে দিয়েছে। এরকম কতগুলো জিনিস এখনও ভাবলে খুব কষ্ট হয়। আমরা ৯ মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন পেয়েছি। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কি এখন রক্ষা হচ্ছে? এটা অর্জন করা যতটা কঠিন তার চেয়ে রক্ষা করা ততটা কঠিন এটা তো সবাই জানে। আমার বাবার বাড়ির সামনে আর্মি টহল দিত, প্রতিটা রাত কী যে ভয়ে কাটত তা বলার বাহিরে। একেকটা রাত পার হলেই মনে হতো আজকের জন্য বাচলাম। তাদের বুটের শব্দ যে কী পরিমাণ ভয়াবহ ছিল। আমরা সেখানে গিয়েছিলাম মে মাসে। দিনে দিনে তাদের ভয়াবহতা বাড়ছে, নিষ্ঠুরতা বাড়ছে। তবে এটা আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে যে, তখনকার বাঙালি যা দেখেছি তার সঙ্গে কোনো জাতিরই তুলনা হয় না। তারা যে যখন যাকে পারছে সাহায্য করছে। যে যেভাবে পাড়ছে। সেই দিনগুলো এখন গেল কোথায়? আমরা গ্রামের অবস্থা খারাপ দেখে আমাকে আম্মু ভারতে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়, যাই বসন্ত পুর। সেখানে যাওয়ার পর জানতে পারলাম মুক্তিযোদ্ধা আছে। তারপর তো আরও এক ভয়াবহ ঘটনা। যাই হোক, তবে আমার মনে হয় তখনকার ঘটনাগুলো যদি আজও মানুষ মনে রাখতে পারত তাহলে আজ দেশ এত কলুষিত হতো না, এত নিষ্ঠুর হতো না। মানুষের চরিত্র যে কত দ্রুত পাল্টায় তা আজ দেখছি আর ভাবছি। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না, কীভাবে মানুষ এত দ্রুত বদলায়।
