ঘূর্ণি জাদুকরদের স্বর্ণ সময়

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৪
অফ স্ট্যাম্পের অনেকটা বাইরে পড়ল বল। ব্যাটসম্যান সামনের পায়ে খেলার চেষ্টা করলেন। তাকে হতভম্ব করে দিয়ে ভয়ানক এক বাঁক নিয়ে লেগ স্ট্যাম্পে বেলটা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল বল! হাসিতে ভরে গেল শ্যামল দর্শন বোলারের মুখ। এই বর্ণনাটা অনায়াসে মুত্তিয়া মুরালিধরনের যে কোনো একটা ক্ল্যাসিক ডেলিভারির বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কাল এই দৃশ্যটা মিরপুর স্টেডিয়ামে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন বাংলাদেশের ‘পার্ট টাইম’ অফস্পিনার মাহমুদউল্লাহ। যেন সেই সত্তর-আশির দশকের ইডেন বা চিপক গ্রাউন্ডে পরিণত হলো মিরপুর। গতকালের ম্যাচে যেমন টার্নিং উইকেট দেখা গেছে; সেটা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে টার্নি উইকেট কি না, তা নিয়েও তর্ক চলতে পারে। কিন্তু এটা ঠিক যে, এই সিরিজটা উইকেট নিরপেক্ষভাবেই বাংলাদেশের স্পিনারদের দখলে। একটা ছোট পরিসংখ্যান দিলেই দখলটা বুঝতে পারবেন। গতকাল পর্যন্ত এই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫টি উইকেট পেয়েছে বাংলাদেশি বোলাররা; এর মধ্যে ২৮টিই স্পিনারদের দখলে। মানে স্পিনারদের উইকেট দখলের শতকরা হার এক্কেবারে ৮০ শতাংশ! গতকালের প্রথম ইনিংসটির কথাই ধরুন। মাশরাফি বিন মুর্তজা গেইলকে আউট করে তার স্বভাবসূলভ ব্রেক থ্রুটা দিয়েছেন। এরপর বাকি কাজটা স্পিনাররা যেন হেসে-খেলে করে গেলেন। এই ম্যাচ বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থবারের একজন মাত্র পেসার নিয়ে খেলতে নেমেছিল। রাজ্জাক-সোহেল সঙ্গে তৃতীয় স্পেশালিস্ট স্পিনার হিসেবে আক্রমণে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র আগেরদিনই স্কোয়াডে যোগ দেয়া ইলিয়াস সানি। কিন্তু এই তিন স্পিনারের চেয়েও ভয়াবহ যেন হয়ে উঠলেন মাহমুদউল্লাহ। ক্ল্যাসিক অফস্পিন দিয়ে ভয়ানক সব বাঁক নেয়ালেন। সব মিলিয়ে কালও ৯ উইকেটের ৮টি নিলেন চার স্পিনার। স্পিনারদের এই প্রবল দৌরাত্ম্যের রহস্য কী? লো বাউন্সি ও টার্নিং উইকেট, স্পেশালিস্ট কোচ হিসেবে সাবেক বিশ্বসেরা সাকলায়েন মুশতাকের উপস্থিতি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানদের চিরায়ত স্পিন দুর্বলতা; এই তিনটি কারণই মূলত বেশি আলোচনায় আসছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে দেখা গেল, তারা মনে করছেন—বাংলাদেশের স্পিনারদের মানও আসলেই অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরী বলছিলেন, সাকলায়েন মুশতাকের অভিজ্ঞতাটা দারুণ সব অস্ত্র ব্যবহার করাতে শিখিয়েছে বাংলাদেশি স্পিনারদের, ‘অবশ্যই উইকেট একটা ভূমিকা রাখছে। এই চতুর্থ ওয়ানডের উইকেট তো খুবই টার্নিং ছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সাকলায়েনের ভূমিকাটা বেশ প্রভাব রেখেছে। যদিও এই লেভেলে কোনো স্পেশালিস্ট কোচ খেলোয়াড়দের বদলে দিতে পারে না। যেটা পারে তার অভিজ্ঞতা ও কিছু ট্রিকস যোগ করতে। আমরা এই সিরিজে দেখলাম সেটাই হয়েছে। আমাদের সাকিব উল্টো বলটা আগে থেকেই একটু পারত, রাজ্জাক তেমন পারত না। এই সিরিজে রাজ্জাক কিন্তু ওই উল্টো বলটা বেশ ভালোই করেছে।’ উল্টো বাঁক নেয়ানো, মানে দুসরা করায় কিছুটা দক্ষতা তৈরি হওয়া নিশ্চয়ই স্পিনারদের অনেক আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। সেইসঙ্গে জালাল আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, ক্যারিবীয়দের স্পিন দুর্বলতার কারণে মানসিক ও টেকনিক্যাল দিক থেকেও তারা পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের স্পিনারদের বিপক্ষে। তবে আসল রহস্যটা তার কাছে অন্য জায়গায়। তিনি বলছেন, একসঙ্গে একদল কোয়ালিটি স্পিনার দেশে ফর্মে থাকায় প্রত্যেকে প্রতিদিন আরও ভালো করছে। এটাকে তিনি বলছেন ইতিবাচক প্রতিযোগিতার একটা দারুণ বহিঃপ্রকাশ, ‘দেখবেন, এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক স্পিনার ফর্মে আছে। রাজ্জাক ভালো করছে। সাকিব দলে নেই, কিন্তু দারুণ বল করছিল। সানি ভালো করছে। আবার বাইরে থাকা এনাম ভালো করছে। অলরাউন্ডার দুইজন, নাইম আর রিয়াদও দারুণ বল করছে। এর মধ্যে দেখুন সোহাগ এসে কম্পিটিশনটা কেমন বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এখন সবাই যার যার বেস্টেরও বেশি কিছু করার চেষ্টা করছে শুধু মাঠে সুযোগ পাওয়ার জন্য। এটা সব স্পিনারের ভেতর থেকে দারুণ পারফরম্যান্স বের করে আনছে।’ জালাল আহমেদ চৌধুরীর কথা বিশ্বাস করলে মানতেই হয়, বাংলাদেশি স্পিনারদের স্বর্ণ সময় চলছে এখন।