অচেনা গেইল

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৫
বিশ্বের এমন কোন বোলার নেই যে তার ব্যাটিং তাণ্ডবের শিকার হয়নি। গেইল নামের সাথেই মিশে আছে বিধ্বংসী ব্যাটিং। অথচ এবারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বাংলাদেশ সফরে বড়ই অচেনা লাগছে মারকুটে এই ব্যাটসম্যানকে। ব্যাট-বলের সমন্বয় তো দূরের কথা, ২২ গজের ভিতরে মনোসংযোগই ঘটাতে পারছেন না তিনি। কোচ, সহকারী কোচ, টিম ম্যানেজমেন্ট সবার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গেইল তার বিধ্বংসী ব্যাটিং যেন হারিয়ে ফেলেছেন। এই সিরিজের আগে যাকে নিয়ে বাংলাদেশ এত হিসাব কষেছে। যিনি ছিলেন স্বাগতিক দলের পরিকল্পনার মূল অংশ। তিনি দুই টেস্ট ও ওয়ানডে মিলে সর্বোচ্চ রান করেছেন মাত্র ৩৫! কালও সিরিজের চতুর্থ ওয়ানডে ম্যাচে সোহাগ গাজী ও মাশরাফির বল স্বাচ্ছন্দ্যভাবে খেলতে পারেননি। ২৫ বল খেলে করেছেন ১৬ রান। গেইলের ফর্মে এরকম ফুটো হবার রহস্য কি? এমন প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষায় অগণিত সমর্থকরাও। গেইলকে এমন শান্ত করার পিছনে অবশ্য মূল অবদান বাংলাদেশের তরুণ অফ-স্পিনার সোহাগ গাজীর। অভিষেক টেস্টে এই স্পিনার যে জাদুর কাঠির ছোঁয়া দিয়েছেন তাতেই ভূপাতিত গেইল। প্রথম টেস্টে আউট হওয়ার পর থেকে গেইলের মনে সোহাগ ভীতি চলে আসে। দ্বিতীয় টেস্টেও প্রথম ইনিংসে সোহাগের শিকার হয়েই গেইল ড্রেসিংরুমে ফিরে যান। দুই টেস্টের মত প্রথম ওয়ানডে ম্যাচেও সোহাগ ভীতিতে তার কপাল পুড়েছে। তাকে উইকেট দিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছেন গেইল। টানা তিনটি ইনিংসে সোহাগের বলে আউট হওয়ার দৃশ্য দেখে যে কারোর কাছে ক্যারিবিয় এই ব্যাটসম্যানকে অচেনা লাগবে। তবে সবচেয়ে বেশি বিস্ময়ের ব্যাপারে হচ্ছে, টানা তিন ইনিংসে স্পিন আতংকের কারণে এরপর ইনিংসের প্রথম ওভার করতে আসলেই সোহাগ গাজীকে সমীহ করছেন তিনি। ছয় বলে কোন রান নিচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচেও এই অফ-স্পিনারকে সমীহ করে খেলতে গিয়ে মেডেন দিয়েছেন তিনি। সোহাগকে সমীহ করতে গিয়ে উল্টো মাশরাফি বিন মুর্তজাকে উইকেট দিয়ে এসেছেন ক্যারিবিয় এই ব্যাটসম্যান। গেইল সমর্থকদের জন্য এটি যদি বিস্মিত হওয়ার মত ঘটনা হয়, তবে তারচেয়ে বেশি বিস্মিত হওয়ার ঘটনা হচ্ছে একমাত্র বাংলাদেশি বোলারদের বেলায় গেইলের নিষ্প্রভতা দেখে। বিশ্বের জাঁদরেল বোলারদের যখন তুলোধুনো করেছেন গেইল তার ব্যাট দিয়ে, ঠিক উল্টো চরিত্র বাংলাদেশি বোলারদের বেলায়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এরকম ফর্ম খরায় ভুগছিলেন গেইল। যা তাকে ক্যারিয়ারের প্রথমদিকে বেশ ভুগিয়েছে। আটটি ওয়ানডে খেলার পর প্রথম ফিফটি পান ক্যারিবিয় এই ওপেনার। ৩২টি ওয়ানডে খেলার পর পেয়েছেন প্রথম সেঞ্চুরি। তার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় পৌনে দু’বছর। ২০০১ সালে নাইরোবিতে কেনিয়ার বিপক্ষে ১৫২ রানের ইনিংস খেলার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি গেইলকে। অথচ ক্যারিয়ারের ২৩৮টি ওয়ানডে খেলার সময় তাকে নিজের ব্যাটিং নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। আর এই লড়াইটা হচ্ছে এমন এক সময়, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সদ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। সুনাম তো আছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে লজ্জা। বাংলাদেশের কাছে পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ হেরে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাটাই হুমকি হয়ে পড়েছে। অথচ দলের প্রাণভোমরা ক্রিস গেইলের ব্যাট যেন শান্ত সাগর। অশান্ত গেইল যেন কোথায় হারিয়ে গেছেন। নিজের ব্যাটিং নিয়ে তিনি নিজেও বিরক্ত। জানা গেছে, ইদানীং তিনি কারো সাথে তেমন কোন কথাও বলেন না। একটু একাকী, নিভৃতে থাকতে পছন্দ করছেন। তবুও যদি নিজের এই দুর্দশা থেকে বের হওয়া যায়। গেইলের এমন নিষ্প্রভতা ভাবিয়ে তুলেছে টিম ম্যানেজমেন্টকেও। কোচ ওটিস গিবসনের কপালের দুশ্চিন্তা ভাঁজও সরছে না। তার প্রমাণ পাওয়া গেল নেট অনুশীলনে। গত বৃহস্পতিবার কোচ সবাইকে ছেড়ে একান্তই সময় কাটালেন গেইলের সাথে। তার চোখেমুখে ভর করছিল দুশ্চিন্তা। এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করতেই একটু বিরক্ত গিবসন; তবুও আশাবাদী লোকদের মত উত্তর দিলেন, ‘গেইল খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে’। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২০টি সেঞ্চুরি ও ৪৫টি হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে তার। টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৪টি সেঞ্চুরি ও ৩৪টি হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে। এতকিছু করার পরও মনে হচ্ছে বিশ্বকে কি যেন দেয়ার বাকি আছে তার। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) খেলতে ঢাকায় এসে দর্শকদের মাতিয়ে গেছেন গেইল। তার কাছে বাংলাদেশের কন্ডিশন অচেনা লাগাটাও অস্বাভাবিক। তবে গেইলের শান্ত স্বভাবের জন্য সবচেয়ে বেশি খুশি বাংলাদেশিরা। গেইলের শান্ত মনোভাবের সুবিধা যে নিতে চায় বাংলাদেশ!