মেসির পায়ে আরেক ইতিহাস

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪৪
এক ফুটবল মৌসুমে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোল, এক মৌসুমে লা লিগায় সর্বোচ্চ গোল, টানা তিন বার চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোল, টানা তিনবার ফিফা ও ইউরোপের বর্ষসেরা, বার্সেলোনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোল তার। সর্বকালের সর্বসেরা খেলোয়াড় তাকে বলুন আর নাই বলুন; এটা বলতেই হবে ফুটবলীয় সব রেকর্ড চুরমার করে দিতে এই ধরাধামে আবির্ভাব হয়েছে লিওনেল মেসির। রেকর্ড ভেঙেচুরে নিজের করে নেয়ার দূরন্ত এই গতি ধরে রাখলেন বার্সেলোনার ক্ষুদে এই জাদুকর। গত রবিবার রাতে নিজের হাতে নিয়ে নিলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আরাধ্য রেকর্ড—এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড। জার্মান কিংবদন্তি জার্ড মুলারের ৪০ বছর আগে গড়া ৮৪ গোলের রেকর্ড ছাপিয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। লা লিগায় রিয়াল বেটিসের বিপক্ষে জোড়া গোলের ভেতর দিয়ে ২০১২ সালে সব ধরনের ফুটবল মিলিয়ে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৮৬! ১৯৭২ সালে পশ্চিম জার্মানি ও বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এক পঞ্জিকাবর্ষে মুলার করেছিলেন ৮৪ গোল। এই রেকর্ডটা মেসি এ বছর করে ফেলবেন, সেটা বছরের মাঝামাঝি এসেই বোঝা যাচ্ছিল। এক সপ্তাহ আগেই গোলসংখ্যা ৮৪ হয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বেনফিকার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন মেসি। ফলে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, বছরের অবশিষ্ট চার ম্যাচ না মিসই করে ফেলেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার! তা হয়নি। রবিবারই মাঠে ফিরে এসেছেন। মাঠে ফিরেই রেকর্ডটা পকেটে পুরে ফেলেছেন। ম্যাচের ১৬ মিনিটেই একক প্রচেষ্টায় গোল করে মুলারকে ছুঁয়ে ফেলেন মেসি। নয় মিনিট পর আবারো মেসির পরিচিত সেই দৃশ্য ! ইনিয়েস্তার সহযোগিতায় গোল করলেন মেসি। সেই সাথে মুলারের গড়া রেকর্ডকে পেছনে ফেলে মেসি নিজের নাম বসিয়ে দিলেন। ম্যাচ শেষে মেসি বলেন, ‘আমি অনেকবার বলেছি, রেকর্ড ভাল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জয়। আমরা এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই। আমার সবসময়েরই মূল চিন্তা দল ঘিরে। লিগ (লা লিগা), চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং কোপা ডেল রে আবারো জিততে চাই।’ বার্সেলোনার হয়ে এ বছরে মেসির গোলসংখ্যা ৭৪টি। এর মধ্যে লিগে ৫৬টি, চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৩টি, স্প্যানিশ সুপার কাপে ২টি এবং কোপা ডেল রেতে ৩টি গোল। বার্সেলোনার হয়ে মেসির এই গোলধারা রেকর্ড সৃষ্টিকারী হলেও বিস্ময়কর কিছু নয়। বিস্ময়কর হল, চলতি মৌসুমে জাতীয় দলের হয়েও দারুণ ধারাবাহিকতা। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে এই সময়ে মেসি গোল করেছেন ১২টি। এর মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৫টি এবং প্রীতি ম্যাচে ৭টি। এই ৮৬ গোলের দূরন্ত স্বপ্নযাত্রার পথে মেসি বেশ আগেই ভেঙে দিয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের এক বছরে করে ৭৫ গোলের রেকর্ড। ১৯৫৮ সালে পেলে ব্রাজিল ও সান্তোসের হয়ে এই কৃতিত্ব দেখান। মেসি ১১ নভেম্বর ৭৫ ও ৭৬তম গোলটি করেন। আর মুলারের পেছনে দ্বিতীয়স্থান হয়ে নাম লেখান। গত মৌসুমে লা লিগায় মেসি ৫০ গোল করেন। চলতি মৌসুমে মেসি তার পারফরমেন্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। মেসিতে ভর করে বার্সেলোনা ইতিহাসের সবচেয়ে দারুণ শুরু করেছে এবার। প্রথম ১৫ রাউন্ডের ম্যাচ শেষে বার্সেলোনার ছিল ১৪টি জয় এবং একটি ড্র। আর চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ৩০ গোল করে ফেলেছেন তিনি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে। শুধু লা লিগাতে মেসির গোল এখন ২৩টি। বার্সেলোনা কোচ টিটো ভিলানোভা বলেন, ‘আমরা আর তার মত খেলোয়াড় দেখবো না (মেসি)। তার মত গোল করার এমন ক্ষমতা আর কারো নেই। শুধু তাই নয় পাসিং, রক্ষণাত্মক এবং খেলাটা যতটা বুঝেন তা অসাধারণ।’ গত ২ নভেম্বর প্রথমবারের মত বাবা হন মেসি। ছেলের নাম থিয়াগো। এছাড়া ফিফা বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। আরো দুই জন মনোনীত হয়েছেন তারা হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং মেসির সতীর্থ আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। মেসি আগের তিন বছর ব্যালন ডি‘অর জিতেছেন। শুধু তাই নয় বার্সেলোনাকে সাহায্য করেছেন তিনটি লা লিগা, দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ আরো অনেক প্রতিযোগিতা জিতে নিতে। আগামী বছর ৭ জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডে ফিফা ব্যালন ডি‘অর পুরস্কার দেয়া হবে। মেসি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চারবার জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছেন। মেসি চাইছেন এবার ব্যালন ডি‘অর যেন তার সতীর্থ ইনিয়েস্তা জিতে নেয়। মেসি দাবি করেন ইনিয়েস্তার পাওয়া উচিত। তা মেসি পারুন আর নাই পারুন; এই আরো একটি রেকর্ডকে যে ধরাছোয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে সন্দেহ নেই। এখনও বছরে তিনটি ম্যাচ তার হাতে রয়েছে। ভবিষ্যতের তারকাদের জন্য এটা দুঃসংবাদ বই কী!