সেটা অক্টোবর মাসের ঘটনা। ক্যারিবীয় সাগরের বুক থেকে উড়ে এসে তখন ভারত সাগরের পাড়ে উত্সব করছেন ড্যারেন স্যামিরা। কলম্বোতে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয়দের এই জয়ে শ্রীলঙ্কার লোকজনের আশাভঙ্গ হয়েছিল। সেই সঙ্গে ফাইনালের যুযুধান পক্ষ না হয়েও বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থকরাও একটু মুখটা আধার করে ফেলেছিলেন!
বাংলাদেশিদের দুশ্চিন্তার কারণ ছিল একটাই—এই ওয়েস্ট ইন্ডিজই ক’দিন পর বাংলাদেশ সফরে আসবে। তখন কী জানি ভয়াবহ কিছু করে ফেলে ক্যারিবীয়রা!
সময় গেছে আর এই চিন্তা বেড়েছে। গত বছর দুয়েকে বাংলাদেশের এশিয়া কাপের পারফরম্যান্স, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পারফরম্যান্স, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই পারফরম্যান্স; সব যেন তখন ইতিহাস হয়ে যেতে বসেছে। সবার চোখের সামনে তখন শুধু গেইল-চন্দরপল-স্যামুয়েল-নারিনের আতঙ্ক। কী হবে, সফর শুরু হলে?
দেখতে দেখতে সেই সফর শুরু হল এবং সোমবার একমাত্র টি-টোয়েন্টির ভেতর দিয়ে শেষও হয়ে গেল সেই সফর। সফর শেষে হিসেব মেলাতে গিয়ে অবাক হতে হল! কোথায় গেইল আতঙ্ক? কোথায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের নতুন রূপ! কোথায় বাংলাদেশকে উড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা। সব যেন প্রায় মাস খানেকের এই সফরে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দলই।
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এই বিশাল সফরে বাংলাদেশ ম্যাচে ম্যাচে উড়িয়ে দিতে পেরেছে; এমন দাবি কিছুতেই করা যাবে না। তবে এটা ঠিক যে, এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই নতুন চেহারার এক বাংলাদেশকে আবিষ্কার করেছে ক্রিকেট বিশ্ব। এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে—তারা আসলেই পারে!
সফরের শুরু হয়েছিল আতঙ্কের ভেতর দিয়ে। ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইলকে দ্রুত ফিরিয়ে দেয়া গিয়েছিল। কিন্তু চন্দরপল, পাওয়েল ও রামদিনের প্রতাপে ৫২৭ রানের বিশাল স্কোর করে ইনিংস ঘোষণা করেন ড্যারেন স্যামি। মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের আরেকটি টেস্ট কেলেঙ্কারি দেখতে চলেছেন দর্শকরা। কিন্তু এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াল এবং অন্য চেহারায় আবির্ভূত হল বাংলাদেশ। নাঈম ইসলামের সেঞ্চুরি, সাকিব ও নাসিরের ‘প্রায়’ সেঞ্চুরি এবং তামিমের ফিফটিতে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলে প্রথম ইনিংসে লিড নিল বাংলাদেশ। এবং অভিষিক্ত সোহাগ গাজীর দূরন্ত বোলিংয়ে দ্রুত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অলআউট করে জয় চোখের সামনে নিয়েং এলো। ব্যাটিং বিপর্যয় সে জয় পেতে দিল না।
পরের টেস্টে ঘটল উল্টোটা। পিছিয়ে পড়ে আবুল হাসানের দশ নম্বরে সেঞ্চুরি, সাকিবের দূরন্ত বোলিং এবং আরেকটি নার্ভাস নাইনটি ও নাসিরের নার্ভাস নাইনটিতে ভর করে ড্রয়ের স্বপ্ন তৈরি করে ফেললো বাংলাদেশ। সেবার না পারলে ওই খুলনাতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আক্ষরিক অর্থেই ব্যাটে-বলে গুঁড়িয়ে দিল মুশফিকুর রহিমের দল। প্রথম দুটি ওয়ানডেতে মনে হল বাংলাদেশ কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল; তার সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোনো নবীন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ মাত্র!
তুতীয় ও চতুর্থ ওয়ানডেতে অল্পের জন্য করে বাংলাদেশ মিস করল সিরিজ জয়। একটু একটু করে ম্যাচ দুটোতে হেরে গেল। লড়াই জমে উঠল। শেষ ওয়ানডেতে আবার স্বরূপে বাংলাদেশ। আবার উড়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ! সফরের শেষ ম্যাচ, একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ১৮ রানে হেরে গেলেও প্রায় দু শ রান তাড়া করতে যে বীরত্ব দেখাল; তারও তুলনা মেলা ভার।
সবমিলিয়ে একটা জিনিস বোঝা গেল, চ্যাম্পিয়ন বলে বাংলাদেশের কাছ থেকে কারো বাড়তি সমীহ পাওয়ার দিন শেষ। এখন খেরোখাতা নিয়ে বসলে দেখা যাবে সিরিজে বাংলাদেশের অনেক অনেক প্রাপ্তি। চার তরুণের অভিষেকে দূরন্ত সাফল্য, মাহমুদউল্লাহর নিজেকে ফিরে পাওয়া, নাসিরের আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা, মুশফিকের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া, সাকিবের ব্যাটে-বলে জ্বলে ওঠা, তামিমের আগ্রাসন.... অনেক কিছুই আছে।
তবে এসব কিছুই নয়। এই সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—বড় দল হয়ে ওঠা।
