আমদানি পণ্যের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাক জাহাজীকরণ পরিদর্শন (পিএসআই) ব্যবস্থা রাখার পক্ষে এবার সুপারিশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)। জানুয়ারি থেকে এই ব্যবস্থা বাতিল করে শুল্ক বিভাগের মাধ্যমে মূল্যায়নের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা।
শুল্ক স্টেশনগুলোতে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন না করে এই ব্যবস্থা চালু রাখার সুপারিশে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান অবস্থায় পিএসআই বাতিল করা হলে রাজস্ব আহরণ ঝুঁকির মুখে পড়বে। সমপ্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনকে পাঠানো এক চিঠিতে এই সুপরিশ করা হয়।
অবশ্য এর আগে এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ীরা বাধ্যতামূলক পিএসআই ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন সরকারের কাছে। বিভিন্ন সভায় পিএসআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিস্তর অভিযোগ ছিল তাদের।
এনবিআরে পাঠানো এফবিসিসিআইয়ের ওই চিঠিতে সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা, বিনিময় মূল্য ও ডাটা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, বন্দরসমূহকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা, এনবিআরের জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদান এবং স্থানীয় শিল্প ও আমদানিকারকদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাধ্যতামূলক পিএসআই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, পিএসআই ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে সরকারকে সহায়তা করে থাকে। এ কারণে পিএসআইয়ের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনবিআরের শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে সততার অভাব রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেইসাথে রয়েছে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব। এছাড়া এনবিআরের ডাটা ব্যাংক হালনাগাদ না থাকায় শঙ্কিত তারা। ফলে পিএসআইয়ের বিকল্প হিসেবে এনবিআরের সক্ষমতা তৈরি হয়নি বলে মনে করেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরাও চাই পিএসআই ব্যবস্থা উঠে যাক। বাংলাদেশ ও সিয়েরালিয়ন ছাড়া আর কোথাও পিএসআই ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমাদের শঙ্কা হলো, এই ব্যবস্থা উঠে গেলে তা সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা এনবিআর অর্জন করেছে কি না। সব স্টেশন থেকে পিএসআই ব্যবস্থা উঠিয়ে না দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে কম আমদানি হচ্ছে এমন স্টেশন থেকে এই ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়া যেতে পারে।’ তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ায় শুরুতে তিন মাসের জন্য পিএসআই ব্যবস্থা বাতিল করা যেতে পারে।
রবিবার এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। তবে পিএসআইয়ের বিকল্প নিয়ে সমপ্রতি চট্টগ্রামে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানুয়ারি থেকে পিএসআই ব্যবস্থা তুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন। পিএসআই বাতিল হলে আমদানি পণ্যের মূল্যায়নে দায়িত্ব পালন করার কথা শুল্ক বিভাগের।
সমপ্রতি এনবিআরের শুল্ক কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। বৈঠকে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আমদানি পণ্যের মূল্যায়নে শুল্ক বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বেশিরভাগ কর্মকর্তাই পিএসআই ব্যবস্থা উঠে গেলেও মূল্যায়নে সক্ষম বলে মত দিয়েছেন। এনবিআরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, পিএসআইয়ের বিকল্প নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেহেতু ঘুরেফিরে একই পণ্য আমদানি হয় এবং আমদানি পণ্যের পূর্বের তিন মাসের আমদানি মূল্যের তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়, সেজন্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শুল্ক বিভাগের সমস্যা হবে না।
বাধ্যতামূলকভাবে পিএসআই ব্যবস্থা চালু হয় ২০০০ সালে। বিশ্বকে ৫টি ব্লকে ভাগ করে ৪টি কোম্পানিকে সরকার নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে যে চারটি কোম্পানি পিএসআইয়ের দায়িত্ব পালন করছে সেগুলো হচ্ছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানি এসজিএস, ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিটাস, ব্রিটিশভিত্তিক আইটিএস ও জাপানভিত্তিক কোম্পানি অমিক।
পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই কোম্পানি। এগুলো হলো—পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ, মূল্য, এইচএস কোড (পণ্য পরিচিতি কোড) ও আমদানিযোগ্যতা। এই পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই সংস্থা সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট ফাইন্ডিংস) সনদ ইস্যু করে থাকে। এর ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শুল্কায়ন করে মালামাল খালাস করে।
পিএসআই কোম্পানি যে সার্ভিস প্রদান করে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে চার্জ কেটে নেয়। বর্তমানে আমদানিকারকরা পিএসআইয়ের জন্য ১ শতাংশ হারে চার্জ দিয়ে থাকেন। তবে এর একটি অংশ পায় সরকার।
