শুদ্ধ গানের শিল্পী হওয়ার বাসনা নিয়ে ছোটবেলায় তিনি যে পথচলা শুরু করেছিলেন বর্তমানে তা আরও গতিময় হয়েছে। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশটা ছিল সংগীতের আবহের মধ্যে। কনার বড় বোন গান শিখতেন বাসায় ওস্তাদ রেখে। আর মিরপুরের সেই তাল-লয়ের ঘরে বোনের পাশে বসে একমনে সেই সুরের ভুবনে ঘুরে বেড়াত ছোট্ট একটি মেয়ে। শুনতে শুনতে এই ভুবনের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল তার। নিজে একা একা যখন থাকতেন, গান গাইতেন আপন মনে।
মেয়েটির গানের প্রতি এই ভালোবাসা দেখে বাবা-মা আলাপ-আলোচনা করে তাকে ভর্তি করে দিলেন শিশু একাডেমীতে। তখন সে মাত্র ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সেই বয়সেই হারমোনিয়াম আর তবলার যে ভুবনে এই মিষ্টি মেয়েটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সেটা এখন চলছে দারুণ গতিতে। আজকের কনা সেদিন ভাবতেও পারেননি—একদিন তার গান সারাদেশের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ভালোবেসে গ্রহণ করবে। বিটিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা এবং পরিচালনা করতেন দেশ বরেণ্য গায়িকা ফেরদৌসী রহমান। টিভি সেটের সামনে বসে স্কুলের প্রাথমিক ধাপের ছাত্রী কনা হা করে এই অনুষ্ঠান দেখতেন আর মনে মনে ভাবতেন, ‘আহা, আমিও যদি একদিন আপার এই অনুষ্ঠানে যেতে পারতাম!’ তবে কনার জন্য আনন্দের বিষয় হলো এই—তিনিও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন প্রায় দেড় বছর। ফলে আজও পথে-ঘাটে তাকে দেখে সাধারণ দর্শক চিনে নেন। তখনও গানে তেমন কোনো ভিত গড়ে উঠেনি তার। এটা আসলে গড়ে দেন মইদুল ইসলাম। সেটা ষষ্ঠ শ্রেণীর কথা। নজরুল একাডেমীতে গান শিখতে আসা কনাকে মইদুল হাতে-কলমে গান শেখানো শুরু করেন। আর এ জন্য কতটা কষ্ট করতে হয়েছে তা কেবল কনাই জানেন। সেই ছোট্টবেলায় দুয়েকটা গানের মাধ্যমেই এই ভুবনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। আর কনার আজকের অবস্থান সেটারই ফলাফল বহন করছেন। ২০০৩ সালে চারদিক কাঁপিয়ে এ দেশে ‘অ্যাঞ্জেল ফোর’ নামে চার তরুণীর একটা ব্যান্ডদলের জন্ম হয়। কনা, তিশা, রোমানা ও নাফিসা মিলে সামনে কাজ করলেও পেছনের কারিগর এসআই টুটুল, ইজাজ খান স্বপন। তবে এই দল অনেক আশা চারদিকে ছড়ালেও নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লে সেই ব্যান্ড আর টেকেনি। ২০০৬ সালে বাজারে আসে কনার প্রথম সলো অ্যালবাম ‘জ্যামিতিক ভালোবাসা’। লেজার ভিশনের ব্যানারে প্রকাশিত ওই অ্যালবাম শ্রোতারা খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করে। তিন বছর পর ২০০৯ সালে বাজারে আসে তার দ্বিতীয় সলো ‘ফুয়াদ ফিচারিং কনা’। ওই অ্যালবামের ‘বরষা’ গানটি এখনও শ্রোতার মুখে মুখে। সম্প্রতি বাজারে এসেছে কনার তৃতীয় সলো অ্যালবাম। এই অ্যালবাম উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হলো ভিন্ন রকম এক প্রকাশনা। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয় কনার ভিডিও অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান। লাল গালিচায় হেঁটে অতিথিরা কনার অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কনার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মিউজিক ভিডিওর অ্যালবামটির নাম ‘সিম্পলি কনা :দ্য মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম’। অ্যালবামে গান রয়েছে মোট নয়টি। গানগুলোর শিরোনাম হলো—‘ধিমতানা’, ‘যাই ভুলে যাই’, ‘অপেক্ষা’, ‘ভুল’, ‘পাহারা’, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’, ‘নীলপরী’, ‘জাস্ট ওয়ান ক্লিক’ ও ‘ইওর লাভ’। গানগুলোর সুর ও সংগীত করেছেন বাপ্পা মজুমদার এবং ফুয়াদ আল মুক্তাদির। আর গানের কথা লিখেছেন শাহান কবন্ধ। মিউজিক ভিডিও অ্যালবামটি প্রসঙ্গে কনা বলেন, ‘অ্যালবাম প্রকাশের অনেক আগে থেকেই সবার কাছে খরচের দিকটি নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আসলে আমার কাছে টাকার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি চেয়েছিলাম শ্রোতাদেরকে ভালোমানের একটি মিউজিক ভিডিও উপহার দিতে। কনা আরও বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম তৈরির পরিকল্পনা আমার অনেক দিনের, শুধু অ্যালবাম হলেই হবে না, সেটি হতে হবে সবার পছন্দের। ভালো মিউজিক ভিডিও তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল, তার সবই করেছি।’ আনুষ্ঠানিকতা শেষে কনার ভিডিও অ্যালবামের গানগুলো উপস্থিত সবাই উপভোগ করেন। কনার ভিডিও অ্যালবামের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শ্রীলঙ্কা থেকে ঢাকায় আসেন সংগীত পরিচালক ইরাজ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আসিফ, শওকত আলী ইমন, ইবরার টিপু, ফারহানা নিশো, ইমন, নিরব, নির্ঝর, কিশোর, সাব্বির, কোনাল, ঝিলিক, রাখি এবং নির্মাতা গাজী শুভ্র ও শুভব্রত সরকারসহ আরও অনেকে। কনার গানের মিউজিক ভিডিওগুলোর নির্মাতারা হলেন গাজী শুভ্র, সুবব্রত সরকার, ডিলন ডি সিলভা ও চামিন। অ্যালবামের গানগুলোতে মডেল হয়েছেন নোবেল, নিরব ও রাখী। আর এসব গানের শুটিং হয়েছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। কনা আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় এককের গানগুলো ভালো হওয়ায় শ্রোতাদের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। আমিও সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই ছুটছি।’ আসলে কনার কণ্ঠে সব ধরনের গানই সহজে মানিয়ে যায়। কনা নিজেই তার প্রমাণ। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অডিও, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল সব বিভাগেই কাজ করে যাচ্ছেন একটানা। এ সময়ের বেশির ভাগ সুরকার, সংগীত পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে কনার। বলা যায়, সবখানে সব গানে কনা আছেন ছড়িয়ে। কনার স্বপ্ন একটাই—একজন ভালো কণ্ঠশিল্পী হওয়া।
