তিনি একাশি বছর পূর্ণ করলেন। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩১ থেকে ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর। আর দুই দিন পরেই তিনি বিরাশি বছরে পদার্পণ করবেন। তার এই সুদীর্ঘ জীবন তার নিজের জন্য যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি তার সময়ের জন্যও। সব ঘটনাই তাকে প্রভাবিত করেছে এবং সব স্বভাবকে তিনি তার সৃষ্টিকর্মে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি সফল যিনি নিজস্ব ক্ষেত্রে তার দক্ষতা প্রমাণ করেন। এক জীবনে সবকিছুই অর্জন করা হয় না যেমন সত্য, তেমনি একটি বিশেষ ক্ষেত্রে সাফল্যও খুব সহজ ব্যাপার নয়। আতিকুল হক চৌধুরী কঠিন সে কাজটি সফলতার সাথে করেছেন। সে অর্থে তার জীবনে সাফল্যের প্রতিকৃতি উজ্জ্বলতর হয়েছে।
সুদীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি বেতার ও টেলিভিশনে নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, বলা যায় এখনও করে চলেছেন। গণমাধ্যমে বর্তমানে কর্মরত তিনি শীর্ষতম বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি তার নাটক প্রযোজনার সময়ে নিজস্ব ভাবনা, বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করেছেন। বেতার ও টিভিতে শ্রোতা ও দর্শকদের রুচি নির্মাণে যত্নবান হয়েছেন। নাটকের বিষয়বস্তু, সমকালীনতা কিংবা বক্তব্যধর্মিতা সব ক্ষেত্রেই তিনি মননশীল ব্যক্তিত্বের পরিচয় তুলে ধরেছেন। এই মননশীলতার বেশ কয়েকটি ভাগও রয়েছে বলা যায়। প্রথমত উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের নাট্যরূপ প্রচার যেমন লিও টলস্টয়, মোঁপাসা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরত্চন্দ্রের ধ্রুপদী রচনাকে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছেন। একেবারে স্বল্পশিক্ষিত মানুষকেও তিনি অসাধারণ এসব রচনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। দেশীয় উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মকেও তিনি তার নাটকের উপজীব্য হিসেবে গণমাধ্যমে প্রচার করে সুস্থ, সত্ ও দেশজ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার মননশীলতার আরেকটি দিক হলো—তার নাটকে বক্তব্যের বলিষ্ঠতা ও সমকালীনতা। সময় উপযোগী বক্তব্য, নাটকে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অনিয়ম ও অসংগতির উপস্থাপনা ও সেখান থেকে উত্তরণের উপায় এবং তরুণ সমাজ ও তারুণ্যের প্রতি অগাধ আস্থা তাকে তার সময়ে একজন ধ্রুপদী নাট্যকার ও নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সত্তর ও আশির দশকে তার রচিত ও প্রযোজিত নাটকসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—‘বাবার কলম কোথায়’, ‘দুরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘কুসুম’, ‘নীল নকশার সন্ধানে’, ‘এখন জোয়ার’, ‘গৃহবাসী’, ‘সুখের উপমা’ প্রভৃতি।
আতিকুল হক চৌধুরীর নাটক তার নিজের এবং তার সময়ের জন্যও ভীষণ উল্লেখযোগ্য। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক অঙ্গীকার পালনেও তিনি সব সময় যত্নবান। তার বড় কৃতিত্ব হলো বেতার ও টেলিভিশনে তিনি প্রায় শতাধিক নতুন শিল্পীকে দর্শকদের সামনে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তরুণ এসব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে স্বনামধন্য শিল্পী হতে পেরেছেন। সত্ নাট্যকর্মী যে পরবর্তীতে একজন দক্ষ সাংস্কৃতিক কর্ম হিসেবে সমাজের সাংস্কৃতিক চর্চাকে যথাযথভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়—এই সত্য আতিকুল হক চৌধুরী অনুভব করেছিলেন সর্বাংশেই। নিঃসন্দেহে এও এক কঠিন দায়িত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে এসব বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালন করে একাশি বছর পূর্ণ করলেন আতিকুল হক চৌধুরী। গত আট বছর ধরে তিনি একুশে টেলিভিশনে প্রথমে পরিচালক অনুষ্ঠান ও পরবর্তীতে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে শারীরিকভাবে কিছুটা পীড়িত এই সত্, নিরলস গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে তার আগামী দিনগুলোতে সুস্থ ও প্রশান্তিময় জীবন যাপনের শুভ কামনা জানিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শুভ জন্মদিন আতিকুল হক চৌধুরী।
লেখক : তারিক রহমান সৌরভ
নির্বাহী পরিচালক, বাঙালি সমগ্র জাদুঘর।
