কুরআন শরীফের শ্রেষ্ঠতম আয়াত হলো- ‘আয়াতুল কুরছি’। এটা সূরা আল বাকারার ২৫৫ আয়াত। এই আয়াতটি আমলের মাধ্যমে অনেক ফজিলত লাভ করা সম্ভব। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এমনিভাবে আরো অনেক আয়াত আছে যা আমলের মাধ্যমেও অনেক মর্তব্য, মাহাত্ম্য অর্জিত হয়। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করার পর আয়াতুল কুরছি পাঠ করে, তার মৃত্যুর সময় এমনভাবে প্রাণ হরণ করা হবে যেমনভাবে শিশু তার মায়ের স্তন্য পান করতে করতে ঘুমিয়ে যায়। মা তার স্তন্য টেনে নেয় ঘুমন্ত শিশু কিছুই বুঝতে পারে না- তেমনিভাবে আয়াতুল কুরছির আমলকারী ব্যক্তির জান কবজ হবে। অন্য বর্ণনায় আছে-যারা পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরছি পাঠ করবে তাদের জন্য আল্লাহর জান্নাতে যেতে আর কোন বাধাই থাকে না কেবলমাত্র মৃত্যু ছাড়া অর্থাত্ মৃত্যুবরণ করার সঙ্গে সঙ্গে সে আল্লাহর জান্নাতের শান্তি উপভোগ করতে থাকবে। আরেকটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরছির আমল করে সে যদি রাতে ঘুমানোর আগে তা পাঠ করে ঘুমায়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার মাথার কাছে এমন একজন পাহারাদার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যে সারারাত তাকে পাহারা দেয় এবং দুস্টুমতি জিন ও শয়তানের অনিষ্ট হতে তাকে হেফাজত করে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরছির আমল করে তার মাল-সম্পদ ফুঁক দেয় তার ঐ সম্পদ কোন চোরে নিতে পারে না। রইছুল মুহাদ্দেসীন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একবার কিছু সম্পদ পাহারা দেয়ার জন্য আমাকে রাসূল (স.) দায়িত্ব দিলেন। আমি পাহারা দিচ্ছিলাম, এমন সময় ঘুমে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। আমি তখন আয়াতুল কুরছি পাঠ করে ঐ মাল সম্পদে ফুঁক দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। তখনই চোর এলো ঐ মালগুলো চুরি করার জন্য। কিন্তু চোর লক্ষ্য করল আবু হুরায়রা এক পাশে ঘুমিয়ে আছে আর মালের সামনে দিয়ে সাদা পোশাক পরিহিত একজন লোক পায়চারী করছেন। চোর প্রথম রাতে চুরি করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। দ্বিতীয় রাতে এসে দেখল একই অবস্থা। তৃতীয় রাতেও একই অবস্থা দেখে চোরের মধ্যে পাপ প্রবণতা বিদূরিত হয়ে গেল। সে তৃতীয় রজনী শেষ হলে অতি প্রত্যুষে আবু হুরায়রার বাড়ি গিয়ে বললেন, ‘আবু হুরায়রা, কি তুমি পড়? তুমি থাক ঘুমিয়ে, কিন্তু ঐ সম্পদের সামনে দিয়ে সাদা পোশাক পরা একজন লোক পায়চারী করে কে সেই লোক? আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, তুমি যাকে দেখেছো সে নিঃসন্দেহে আল্লাহর ফেরেশতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। কারণ আমি রাসূলুল্লাহর (স.) কাছে শুনেছি, যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরছি পড়ে তার সম্পদে ফুঁ দেয়, তার ঐ সম্পদ কোন চোরে নিতে পারে না এবং আল্লাহই তা হেফাজত করেন। এখানেই শেষ নয় যারা আয়াতুল কুরছি পাঠ করবে আল্লাহ তাদের জন্য আটটি জান্নাতের সবগুলো দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ দেবেন।
এখন আসুন এত ফজিলত পূর্ণ যে আয়াতটি সেই আয়াত সম্পর্কে আমরা অবহিত হই। আয়াতুল কুরছিতে আল্লাহতায়ালার আটটি ছিফাত বর্ণনা করা হয়েছে। (১) আল্লাহ এক অদ্বিতীয়, তিনি চিরস্থায়ী, তিনি চিরঞ্জীবী, আল্লাহতায়ালা একজন। তার কোন শরীক নেই, অংশীদার নেই। তাঁর মত বা তার সমকক্ষও কেউ নেই। তিনি চিরস্থায়ী। তার নিজ সিংহাসন হতে আসমান জমিন নভোমন্ডল ভূমন্ডল সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। পৃথিবীর কোন উত্থান পতন, ঝড়-ঝঞ্ঝা এগুলো সংঘটিত করতে আল্লাহতায়ালার নিজ সিংহাসন ছাড়তে হয় না। তিনি চিরঞ্জীব। তিনি যেমন ছিলেন তেমন আছেন তেমন থাকবেন। কখনোই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না। এই বিশ্বাস প্রতিটি মুমিন ব্যক্তিকে রাখতে হবে। (২) তাঁর ঘুম আসে না তন্দ্রাও তাকে স্পর্শ করে না। আল্লাহর একজন বিশিষ্ট নবী হযরত মুসা (আ:)। আল্লাহ তায়ালাকে বলেছিলেন, আল্লাহতায়ালা, আপনি না ঘুমিয়ে কিভাবে পারেন? আল্লাহ বলেন- মুসা, তুমি কি অবিশ্বাস করো? মুসা (আ.) বললেন, আল্লাহতায়ালা অবিশ্বাস আমি করি না, তবে যদি জানতে পারতাম যে, আপনি কিভাবে না ঘুমিয়ে পারেন, তাহলে ঈমানটা আরো মজবুত হতো। আল্লাহ বললেন, মুসা এক গ্লাস পানি নাও, হাতে করে দাঁড়িয়ে থাক। হযরত মুসা (আ.) তাই করলেন। রাত যতই গভীর হচ্ছে মুসা (আ.) ততোই ঘুমে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। সুবেহ সাদিক যখন হয়েছে তখন মুসাকে (আ.) ঘুমে এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে, হাত থেকে কখন যে পানি ভর্তি গ্লাস পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে, তার কোন খবর নেই। আল্লাহ ডাক দিয়ে বললেন, মুসা এক গ্লাস পানি হাতে করে একটি রাত দাঁড়াতে পারো নাই। হাতের গ্লাস পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। আর আসমান জমিন, নভোমন্ডল ভূ-মন্ডল সব তোমার রবের হাতের মুঠোর মধ্যে তোমার রব যদি ঘুমিয়ে যেতেন তাহলে সবই একটার সঙ্গে অন্যটা টাস লেগে, বাস্ট হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। এই বিশ্বাস প্রতিটি মুমিনকে রাখতে হবে। (৩) আসমান জমিনে যারা আছে সবই আল্লাহর প্রশংসা করছেন। বিশেষ করে যে পাখিরা দু’পাখা মেলে মহাশূন্যে উডডীন হয়, তারাও আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে এবং মহাশূন্যেই তারা আল্লাহর জন্য সলাতাহু-সলাত আদায় করে। ‘আন নাজমু অশ্ শাজারু ইয়াছ জুদান’ আকাশের তারকাগুলো আল্লাহর জন্য সেজদায় পড়ে আছে। জমিনের বৃক্ষগুলো আল্লাহর জন্য সেজদায় পড়ে আছে। (৪) এমন কে আছে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করতে পারে? সকল শাফায়াতের চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে। তিনিই এটা নিয়ন্ত্রণ করবেন। যে কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। বরং হাশরের ময়দানের সব মানুষগুলো কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। কারো মুখে কোন কথা থাকবে না। আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সেই কেবল আল্লাহর সাথে কথা বলবে। (৫) গোপন এবং প্রকাশ্য সকল বিষয় আল্লাহতায়ালা অবহিত আছেন। চোখের চুরি আর অন্তরের গোপন কথা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা জানেন। সুতরাং দুনিয়ার সবার চোখ ফাঁকি দেয়া সম্ভব কিন্তু আল্লাহতায়ালার চোখ ফাঁকি দেয়া সম্ভব নয়। (৬) আল্লাহ যেটুকু চেয়েছেন, আমাদের জ্ঞানদান করেছেন। এর বাইরে কোন জ্ঞান আমাদেরকে দেয়া হয় নাই। সমস্ত জ্ঞানের আধার হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি আমাদের সামান্য কিছু জ্ঞানদান করেছেন। এই সামান্য জ্ঞান এতই নগণ্য যে, বিশাল সাগরের পানি সম্ভারের তুলনায় যেমন একফোঁটা পানির কোন মূল্য নাই। আল্লাহর জ্ঞানের কাছে আমাদের জ্ঞানের তেমনি কোনই মূল্য নাই। (৭) আল্লাহর সেই কুরছি আসমান জমিন সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। সুতরাং আমরা সবাই আল্লাহর গন্ডির মধ্যে বসবাস করছি এই বিশ্বাস রেখে আমাদের চলতে হবে। (৮) এই সব কিছু পরিচালনা করতে আল্লাহ কখনো ক্লান্ত হয়ে যান না। তিনি আমাদের রব, পালনকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আয়াতুল কুরছির দিক-নির্দেশনাগুলো আমাদের জীবনে আমল করে আমরা অপরিসীম ফজিলত লাভ করতে পারি। আল্লাহতায়ালা সে তাওফীক আমাদের সকলকে দান করুন, আমীন।
