শীতকালে নাক কান ও গলায় সমস্যা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২৩
এখন আমাদের দেশে শীতকাল। শীতকালে প্রচুর পুষ্টিকর শাক সবজি, ফলমূল পাওয়া যায়। সেজন্য সাধারণত রোগব্যাধি কম হয়। যখন অতিরিক্ত শীত পড়ে ও শীতকে অবহেলা করা হয় তখন নানা রোগব্যধি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনীয় গরম কাপড় পরিধান করা উচিত্। শীতকালে নাক, কান ও গলায় যেসব সমস্যা হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করা হলো- টনসিলের প্রদাহ বা গলা ব্যথা শীতকালে গলায় ব্যথা হয়ে টনসিলের তীব্র প্রদাহ হতে পারে। তীব্র প্রদাহের জন্য গলা ব্যথা, জ্বর এবং ঢোঁক গিলতে অসুবিধা হয়। যদি ভাইরাসজনিত হয় তাহলে লবণ পানি দিয়ে গড়-গড়া করলে এবং প্যারাসিটামল খেলে ভালো হয়ে যায়। ব্যাকটেরিয়াজনিত টনসিল প্রদাহ হয় তাহলে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ মত সঠিক সময় ও সঠিক মাত্রায় এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। অনেক সময় ঠান্ডা লেগে কণ্ঠনালীতে ইনফেকশন হতে পারে বা গলার স্বর পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে এন্টিহিস্টামিন এবং মেন্থলের ভাব নেয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগলে শিশুদের শ্বাসনালীতে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে এমনকি নিউমোনিয়া হতে পারে। তাই শিশুদের অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগলে সাথে সাথে চিকিত্সা নেয়া উচিত। এডিনয়েড শিশুদের নাকের পিছনে এক ধরণের টনসিল থাকে যাকে এডিনয়েড বলা হয়। এডিনয়েড বড় হয়ে গেলে নাক বন্ধ হয়ে যায়। নাক বন্ধ হয়ে গেলে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। তাই রাত্রে শিশুরা মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস নেয়। এডিনয়েড অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে শিশুদের ঘুমের ব্যঘাত ঘটে এবং রাত্রে ঘুমের সময় নাক ডাকে। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এডিনয়েড জনিত কারণে শিশুদের মধ্যকর্ণে পানি জমে যেতে পারে। তখন শিশুরা কম শুনতে পায়। ফলে দেখা যায় শিশুরা পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে এবং রেডিও-টেলিভিশনের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। এধরনের সমস্যা হলে নিকটস্থ নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। এলার্জি জনিত নাকের সর্দি ও পলিপ কোন রকমের এলার্জেন যেমন- ধুলাবলি, গাড়ির ধুয়া, নাকে ঢুকে যায় তাহলে নাকে এলার্জি জনিত প্রদাহ হতে পারে। এতে নাকে হাচিঁ, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ ইত্যাদি উপসর্গ হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে এবং যে কারণে নাকে সর্দি এলার্জি হয় তা থেকে দূরে থাকলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সাধারণত দীর্ঘদিন নাকে এলার্জি থাকলে নাকে পলিপ হতে পারে। পলিপ দেখতে আঙ্গুর ফলের মতো দেখায়। নাকের পলিপে নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং সাথে সাইনাসের ইনফেকশন হয়ে মাথা ব্যথা হতে পারে। এই সমস্যার চিকিত্সা হলো অপারেশন। প্রচলিত নিয়মে অপারেশনে আবার পলিপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আধুনিক এন্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারির মাধ্যমে সফলভাবে অপারেশন করা যায়। বর্তমানে আমাদের দেশে বড় বড় হাসপাতালে এন্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারি নিয়মিত হচ্ছে। সাইনাসের প্রদাহ বা সাইনুসাইটিস শীতকালে নাকের দু’পাশে সাইনাসের কারণে ইনফেকশন দেখা দেয়, যাকে সাইনুসাইটিস বলা হয়। সাইনুসাইটিস এর জন্য নাকের দ’পাশে ব্যথা এবং মাথা ব্যথা হতে পারে। সাইনাসের এক্স-রে করলে রোগ নির্ণয় করা যায়। তীব্র অবস্থায় ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করা যায়। দীর্ঘমেয়াদী সাইনাস প্রদাহে ওয়াশ এবং শেষ পর্যায়ে এন্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারি লাগতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা নেয়া ভালো। শীতে হঠাত্ নাকের রক্তপাত বিভিন্ন কারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। অনেক সময় কোন কারণ ছাড়াও নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। শিশুদের বেলায় সাধারণত আঙ্গুল দিয়ে নাক খোঁচানোর কারণে নাক দিয়ে রক্তপাত হতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাই-ব্লাডপ্রেসারের কারণে নাক দিয়ে রক্তপাত হয়। শীতকালে নাকের ভিতরে রক্তনালী শুকিয়ে ছিড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে পারে। আরও অন্যান্য কারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। তাই নাক দিয়ে রক্তপাত হলে কাল বিলম্ব না করে একজন নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত। শিশুদের মধ্যকর্ণে প্রদাহ শীতকালে শিশুদের মধ্যকর্ণে প্রদাহ বেশি দেখা দেয়। সাধারণত ঊর্ধ্বশ্বাসনালীর প্রদাহ, টনসিলের ইনফেকশন, এডিনয়েড নামক গুচ্ছ লসিকা গ্রন্থির বৃদ্ধি ইত্যাদি থেকে এই প্রদাহ দেখা দেয়। শীতকালে এই উপসর্গগুলো বেশি দেখা দেয়ার ফলে হঠাত্ করেই মধ্যকর্ণে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। এ রোগের কারণে কানে অনেক ব্যথার সৃষ্টি হয়, কান বন্ধ হয়ে যায়। সঠিক সময়ে এই রোগের চিকিত্সা না করলে কানের পর্দা ফুটো হয়ে যেতে পারে এবং যার ফলে কান পাকা রোগ হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে রোগের চিকিত্সা করা হয়। শীতকালে যাতে ঠান্ডা না লাগে সেজন্য গরম কাপড় পড়তে হবে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যত্ন নিতে হবে। ঠান্ডা লাগলে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিত্সা নেয়া উচিত্। যাতে প্রথমেই রোগ ভালো হয়ে যায় এবং বিভিন্ন জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। শীতকালে এ্যাজমা বা হাঁপানী রোগীদেরও নিয়মিত ওষুধ নেয়া ও ইনহেলার ব্যবহার করা উচিত্। কারণ সর্দি, এলার্জি ও হাঁপানীর মধ্যে যোগসূত্র আছে।