অপারেশনের পর পুনরায় ফিস্টুলা হওয়া কি সম্ভব

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২৫
ফিস্টুলা (ভগন্দর বা নালী ঘা) মলদ্বারের একটি বিশেষ রোগ। এ রোগ পায়ুপথের ভিতরে গ্রন্থির সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। প্রথমত: সংক্রমণের কারণে মলদ্বারের পার্শ্বে ফোড়া হয়। বেশ কয়েক দিন ব্যথা থাকে এবং ফুলে যায়। এরপর এটি ফেটে গিয়ে মলদ্বারের পাশের কোন একটি জায়গা দিয়ে পুঁজ বেরিয়ে যায়। অতপর: ব্যথা এবং ফুলা কমে যায়। রোগী বেশ কিছুদিন আরাম বোধ করেন। কিছুদিন ভাল থাকার পর হঠাত্ আবার মলদ্বার ফুলে যায় এবং ব্যথা হয়। দু’চারদিন পর পুরনো সেই মুখ দিয়ে আবার কিছু পুঁজ বের হয় এবং রোগী আরামবোধ করেন। চিকিত্সা না করা হলে এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকে। পুঁজ পড়ার বিষয়টির তারতম্য ঘটে। সামান্য পুঁজ হলে রোগীরা এটিকে পুঁজ হিসেবে গণ্য করেন না। তখন বলেন যে একটু আঠাল রস বের হয় বা মলদ্বারে একটু ভিজে যায় ইত্যাদি। পুঁজের সাথে সাধারণত: রক্ত যায় না। কিন্তু কখনও কখনও অল্প রক্ত যেতে পারে। মলদ্বারের চতুর্দিকে এক বা একাধিক মুখ দেখা দিতে পারে। তিন থেকে ছয়টি মুখ পর্যন্ত দেখেচি। রোগীরা প্রশ্ন করেন যে, এটি বিনা চিকিত্সায় বেশি দিন থাকলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে কিনা? ফিস্টুলা দীর্ঘদিন থাকলেও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে খুব কম ক্ষেত্রে হলেও হতে পারে। আর একটি বিষয় হচ্ছে পায়ুপথে ক্যান্সার বেশী দিন বিনা চিকিত্সায় থাকলে ফিস্টুলা দেখা দিতে পারে। এরূপ পায়ুপথের ক্যান্সারের ফলে উদ্ভুদ ফিস্টুলার বেশ কয়েকজন রোগী দেখেছি। ফিস্টুলা বা ভগন্দর রোগের চিকিত্সা হচ্ছে অপারেশন। অনেক রোগী আছেন ১০/১২ বছর এ রোগে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করেছেন কিন্তু অপারেশন করছেন না। কারণ হিসেবে বলছেন অপারেশন করলে নাকি আবার হয়। তাই অপারেশন করে লাভ কি? আবার অনেকে অপারেশনকে ভয় পান। ভয় পেয়ে কেউ কেউ তথাকথিত বিনা অপারেশনে চিকিত্সার জন্য হাতুড়ে চিকিত্সকের কাছে যান। কোন কোন হাতুড়ে ডাক্তার ইনজেকশনের সাহায্যে ভাল করার নামে বিষাক্ত কেমিক্যাল ইনজেকশন দেন। এই ইনজেকশনে রোগী ভিষণ ব্যথা অনুভব করেন এবং মলদ্বারের মাংসের পচন ধরে গায়ে জ্বর আসে। এরপর ঐ হাতুড়ে ডাক্তারকে যদি বলা হয়, এত কষ্ট এবং এই পচন ধরবে একথা তো আগে বলেননি। তখন তিনি উত্তর দেন, এগুলো বললে আপনি ইনজেকশন নিতেন না। এ প্রক্রিয়ার ফলে মলদ্বারে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকে যেমন মল আটকে রাখতে না পারা, মলদ্বার নীচে ঝুলে পড়া, মলদ্বার অতি সরু হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এসব ভূক্তভোগী রোগীরা লোক লজ্জা এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবার কারণে এসব কথা ডাক্তার ছাড়া কারো কাছে প্রকাশ করেন না। পাইলসের চিকিত্সায় যে ইনজেকশন দেয়া হয় তাতে কারো টের পাবার কথা নয়। ব্যথা পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আর সপ্তাহে একটি করে মোট সাতটি ইনজেকশন দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। আর একটি কথা মনে রাখা দরকার, পাইলস ছাড়া অন্যান্য রোগে ইনজেকশন দেয়ার জন্য বিধান নেই। তাই আপনার আগে জেনে নেয়া উচিত আপনার রোগটি আসলেই পাইলস কিনা। এবার আসা যাক ফিস্টুলা অপারেশন করলে আবার হয় কিনা এই প্রশ্নে। এক কথায় এর উত্তর দেয়া কঠিন। যেহেতু ফিস্টুলার প্রকারভেদ রয়েছে এবং বিভিন্ন সার্জন ভিন্ন ভিন্ন অপারেশন কৌশল অবলম্বন করেন তাই এর সাফল্য তুলনা করা দুষ্কর। এছাড়া কি কারণে ফিস্টুলা হয়েছিল তার উপরও ফলাফল নির্ভর করে। তবে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে খুব সংক্ষেপে বলতে হলে আমি বিগত নয় বছরের এ জাতীয় বহু অপারেশনের অভিজ্ঞতা থেকে বলব, জটিলই হোক বা বারে বারে হওয়া ফিস্টুলাই হোক অপারেশনের পর আবার হওয়ার ধারণাটি অতিরঞ্জিত এবং কালেভদ্রে ঘটে। অপারেশনের পর আবার হওয়ার কারণগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। যেমন- ১. ফিস্টুলার প্রকারভেদ রয়েছে। সাধারণ ফিস্টুলা ও জটিল ফিস্টুলা। সাধারণ ফিস্টুলা অপারেশন সহজসাধ্য। কিন্তু জটিল ফিস্টুলা যেহেতু মলদ্বারের গভীরে মাংসপেশীর ভিতর প্রবেশ করে তাই এর চিকিত্সাও জটিল। এ ধরণের ফিস্টুলা অপারেশন করতে বিশেষ ধরণের যন্ত্রপাতি থাকলে ভাল হয়। যেহেতু মলদ্বারের গভীরে প্রবেশ করে এবং একধাপে এই অপারেশন করলে রোগীর পায়খানা আটকে রাখার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে তাই কয়েক ধাপে সিটন প্রয়োগের মাধ্যমে করলে অধিকতর সফলতা পাওয়া যায়। ২. ফিস্টুলার নালীটি বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করতে পারে। সেগুলো ধৈর্য্য সহজার খুঁজে দেখতে হবে। ৩. ফিস্টুলার ভিতরের মুখটি কোথায় তা সনাক্ত করতে হবে। অনেক সময় ভিতরের মুখ খুঁজে পাওয়া যায় না। ৪. জটিল ফিস্টুলা অপারেশনে যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে ধৈর্য্য সহকারে সার্জনের কর্ম সম্পাদন করা উচিত। যিনি প্রথম অপারেশন করেন তার হাতেই ভাল হওয়ার সর্বোত্তম সুযোগটি থাকে। বারবার অপারেশনে সাফল্যের সুযোগ কমতে থাকে। ৫. অভিজ্ঞ সার্জনগণের মতে, ফিস্টুলা অপারেশনের পর সার্জনদের যত বদনাম হয়েছে অন্য কোন অপারেশনে এতটা হয়নি। ৬. এ অপারেশনের পর মাংস পরীক্ষা করা (বাইওপসি) উচিত। কারণ এটি যক্ষ্মার কারণে হয়ে থাকে তাহলে যক্ষ্মার ওষুধ না খাওয়ানো পর্যন্ত এটি বারে বারে হতে থাকবে। আবার যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে তাহলে বড় ধরণের অপারেশন করতে হবে। ৭. পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ যেমন- ক্রন’স ডিজিজ যদি সন্দেহ করা হয় তাহলে মলদ্বারের ভিতর কোলনস্কপি পরীক্ষা করে নেয়া উচিত। এতে যদি এই রোগ ধরা পড়ে তাহলে বিশেষ সতর্কতার সাথে ফিস্টুলা অপারেশন করতে হবে। ৮. পায়ুপথে ক্যান্সারের কারণে ফিস্টুলা হলে ক্যান্সারের অপারেশন করতে হবে। ৯. সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি হচ্ছে তিনটি। ক. পুনরায় ফিস্টুলা হওয়া খ) ক্ষত শুকাতে অতিরিক্ত সময় নেয়া গ) মল ও বায়ু ধরে রাখার অক্ষমতা বিভিন্ন গবেষণা পত্রে দেখা যায়, জটিল ফিস্টুলা আবার হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণত: ৭-১৫% এবং সাধারণ ফিস্টুলা আবার হওয়ার সম্ভাবনা ৪-৯%। ক্ষত শুকাতে দেরী হয় ৭% রোগীর ক্ষেত্রে। বায়ু ও মল নিয়ন্ত্রণের সামান্য অক্ষমতা ৭-১২% রোগীর।