প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, সামগ্রিক উন্নয়ন ও আইনের শাসনের নীতি সমুন্নত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব আজ মধ্যপন্থা ও সহিঞ্চুতা চর্চার আধুনিক এবং সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চেনে। আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি যে জন্য আপনারা ১৯৭১ সালে আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রী গতকাল শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধু ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণকালে এ কথা বলেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য সরকার ২০১১ সালে ৫শ’রও বেশি বিদেশি বন্ধু ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী এ পর্যায়ে শনিবার ৬০ ব্যক্তি ও ২ প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এর আগে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ ১৪৫ বিদেশি বন্ধু ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, যে বিশ্বাস এবং আস্থা আপনারা আমাদের ওপর অর্পণ করেছিলেন, তা আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি। আমরা বিশ্বাস করি এ অর্জনে আমাদের বিদেশি বন্ধুরাও সমান অংশীদার।’
তিনি বলেন, আজকের এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ অ্বদানের প্রতি জাতির গভীর ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আজকের এই মহতী সমাবেশ প্রমাণ করে আমাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়েছিল তা আমরা কতটা গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের মাঝে উপস্থিত হতে পেরে আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি। আপনাদের উপস্থিতি ৭১’র সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে আমরা পুনরায় আশ্বস্তও হচ্ছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের এই ভূখণ্ড অনাদিকাল বিদেশি দখলদারদের লক্ষ্যবস্তু ছিল। আমাদের জনগণ যতভাবে সম্ভব সবরকমের নির্যাতন ও জুলুমের শিকার হয়েছে। সবশেষ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নতুন করে শোষণ ও নিপীড়নের সম্মুখীন হন তারা।
তিনি বলেন, কিন্তু প্রতিবারেই আমাদের সাহসী ও অকুতোভয় জনগণ এসব নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে। যদিও এর জন্য তাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৪৭-এর পর থেকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল বৈরী পরিস্থিতিতে আমাদের নেতৃত্ব দেন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালে তার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ৯ মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে সময় আমাদের হাতে কিছুই ছিল না। কিন্তু উচ্চ মানসিক শক্তি থেকে সাহস সঞ্চয় করে আমরা চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে অসমযুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে বিদেশি বন্ধুরা আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় নিরীহ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের অপরাধ ছিল আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। ন্যায় বিচার ও আত্মমর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। তখন যা ঘটেছিল তা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারময় অধ্যায়। সমসাময়িক বিশ্ব ইতিহাসে এধরনের গণহত্যা ও নিষ্ঠুরতা আর কেউ দেখেনি।’ শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ আমাদের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। বস্তুতপক্ষে, আমাদের বিদেশি বন্ধুরা বিশ্ববাসীকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমরা জানলাম আমরা একা নই, বিদেশি বন্ধুরাও আমাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের বন্ধুদের সম্মান জানাতে গঠিত জাতীয় কমিটির চেয়ারপার্সন ডা. দীপু মণি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম এবং সম্মাননা গ্রহণকারীদের পক্ষে রাষ্ট্রদূত জগদীস সি শর্মা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
কেবিনেট সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং সম্মাননা পত্র পাঠ করেন।
মন্ত্রিবর্গ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সেক্টর কমান্ডারগণ, মুক্তিযোদ্ধাগণ, কূটনীতিকবৃন্দ, বিচারকগণ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ছাত্র-ছাত্রী এবং বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
