একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিদেশি বন্ধুরা। এই বিদেশি বন্ধুদের অবদানের স্বীকৃতি দিচ্ছে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় এবার অন্যদের মধ্যে সম্মাননা জানানো হলো উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কণ্ঠশিল্পী মান্না দে ও চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এসব নক্ষত্ররা সে সময় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও সাহিত্য, শিল্পকর্ম ও গানের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করেছিল বীর বাঙালি মুক্তিসেনাদের। তাদের পক্ষে সম্মাননা নিতে বাংলাদেশে এসেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাই অনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মান্না দে’র ভাতিজা সুদেব দে ও মকবুল ফিদা হুসেনের ছেলে শামশাদ হুসেন। গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে তাদের একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এসব বন্ধুদের কীর্তির কথা।
সম্মাননা পাওয়া এ তিনজনের মধ্যে দু’জনই প্রয়াত আর একজন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তাদের পক্ষ থেকে সম্মাননা নিতে আসা স্বজনদের তাই আক্ষেপ; এ সম্মাননা নিজেরা নিতে পারলে অনেক বেশিই খুশি হতেন।
বাংলাদেশকে নিজের দেশই মনে করতেন দাদা: অনীল গঙ্গোপাধ্যায়
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কলমবন্ধু ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই লেখক পশ্চিম বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশেও সমান জনপ্রিয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘুরেছিলেন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। লিখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রবন্ধ, কবিতা। তার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা নিতে আসা ভাই অনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, দাদার (সুনীল) জন্ম তো বাংলাদেশে হয়েছিলো। আমরা গ্রামের বাড়ি বলতে বাংলাদেশের বাড়িটাই বুঝি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের কথা দাদার অনেক বইয়ে রয়েছে। তার লেখা পূর্ব-পশ্চিমের অনেকটাই জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
গান গেয়ে বাঙালি শরণার্থীদের জন্য তহবিল যোগাড়
করেছিলেন মান্না দে : সুদেব দে
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গায়ক মান্না দে। ষাট বছরের বেশি সময় ধরে হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ অজস্র ভাষায় গান গেয়েছেন। বৈচিত্র্যের বিচারে তাকেই হিন্দি গানের ভুবনে সর্বকালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক সঙ্গীতবোদ্ধা। শুধু ভারত নয় বাংলাদেশেও তার রয়েছে জনপ্রিয়তা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছেন নিরস্ত্র-নিপীড়িত বাঙালি শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহে। তিনি বলেন, দুই দেশের মাঝে সীমানার প্রাচীর থাকতে পারে কিন্তু দুই বাংলার মানুষের মনে যেন প্রাচীর না থাকে। বাংলাদেশের সৌজন্যে আমি অভিভূত। তবে কাকা আসতে পারলে আরো ভালো হতো।
বাবা ও বঙ্গবন্ধুর মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো:শামশাদ হুসেন
চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। ফিদা হুসেন নামেই সবাই তাকে চেনে। গত ৫০ বছরে ভারতের সবচেয়ে নামি চিত্রকর। নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য শিখরে। তার পক্ষে সম্মাননা নিতে দেশে এসেছিলেন ছেলে শামশাদ হুসেন। সম্মাননা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আমার পরিবারের জন্য বড় সম্মানের। তিনি বলেন, ১৯৫১ সালে চীনে একটি অনুষ্ঠানে আমার বাবার (ফিদা হুসেন) সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাত্ হয়। তখন দুই জনের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। এরপর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার বাবা (ফিদা হুসেন) বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু কাজ করেছিলেন এবং অর্থ তহবিল হিসেবে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কথা বলতেন। তার কথায় বাংলাদেশের প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ জন্মেছিলো।
পাকিস্তানিরা আমাকে গাদ্দার বলতো: আসিফ শাহকার
মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে আন্দোলন করেছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ নাগরিক সৈয়দ আসিফ শাহকার। মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা নিতে তিনি এখন ঢাকায়। মুক্তিযুদ্ধকালের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলাম। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা ১৫ থেকে ২০ জন লাহোরে বিক্ষোভ করেছিলাম। এ কারণে আমাকে জেলে আটকে রাখা হয়। নির্যাতন করা হয়। তবুও আমি এই বর্বরতার বিরুদ্ধে ছিলাম। অনেক পাকিস্তানিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশিরা এ বিষয়টি জানে না।
তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষই আলাদা। তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা রয়েছে। পাকিস্তানের বর্বরতার বিরোধিতা করার জন্য আমাকে গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) বলা হতো। একদিকে পাকিস্তানিরা আমাকে ঘৃণা করতো। অন্যদিকে পাকিস্তানি হওয়ায় বাংলাদেশিরাও আমাকে ঘৃণা করতো।
