কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত এক দশকে নিহত হওয়ার এই সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণ। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার নেপথ্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না হওয়া, শ্রমিকের নামমাত্র ক্ষতিপূরণ, অতীতে ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনাগুলোর তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আইন অনুযায়ী কারখানা তৈরি না হওয়া অন্যতম কারণ।
তবে স্বল্প বেতনে কাজ করা এসব শ্রমিকের চিকিত্সা কিংবা পুনর্বাসনের জন্যে তেমন কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এর তথ্য অনুযায়ী ২০০১ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩০১ জন। ২০১১ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ জনে। আর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে প্রায় এক হাজার ২৩৫ জন শ্রমিককে। ২০১২ সালের ছয় মাসের চিত্র আরো ভয়াবহ।
শাহীন মজুমদার একজন ট্রাক ড্রাইভার। ৯ বছর পূর্বে সড়ক দুঘর্টনায় তার ডান পা’টি হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। ট্রাকের মালিক সামান্য কিছু চিকিত্সা খরচ দিলেও এক পা হারিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। এরপর বিলস-এর ‘কাজে ফেরা’ প্রকল্পের সহায়তায় শাহীন মজুমদারের কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়। বর্তমানে শাহীন চুয়াডাঙ্গা বাস টার্মিনালে কাজ করেন। শাহীন মজুমদার বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমি আবারো কাজে আসতে পেরেছি। নয়তো পঙ্গুত্ব বরণ করে সারা জীবন কর্মহীন হয়ে কাটাতে হতো।
বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ এর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয়মাসে নিহত হয়েছেন ৭০৪ জন শ্রমিক। ২০১১ সালে পেশাগত দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় নিহত হন ৬৮৩ জন এবং আহত হন ৮১৪ জন শ্রমিক। ২০১০ সালে ৭০৩ জন, ২০০৯ সালে ৩৭৮ জন, ২০০৮ সালে ৫৪৭ জন, ২০০৭ সালে নিহত হন ৪৬৫ জন, ২০০৬ সালে ৯৭৪ জন, ২০০৫ সালে ৪৮০ জন, ২০০৪ সালে ১৮৮ জন, ২০০৩ সালে ২৫১ জন এবং ২০০২ সালে ১৬৮ জন শ্রমিক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২০ লাখ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ ও কর্মহীন হয়ে পড়েন ১২ লাখ শ্রমিক। পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন ১৬ কোটিরও বেশি শ্রমিক। বিলস এর জরিপে দেখা গেছে ২০১১ সালে দেশে কেবল পেশাগত দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় ৮৭৯ জন শ্রমজীবী মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২৩৫ জন। গত ১২ বছরে দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও সহিংসতার শিকার হয়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বিলস কাজে ফেরা’ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর মো. কবির হোসাইন বলেন, পেশাগত কারণে আহত পঙ্গু শ্রমিকদের কর্মক্ষম করার লক্ষ্যে ২০১১ সালের পহেলা অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় কল্যাণপুরে বিলস ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে ১২ ডিসেম্বর ২০১২ সাল পর্যন্ত ২৮৬ জনকে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি চিকিত্সা দেয়া হয়েছে এবং ৯২ জনের কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক ৫ ধরনের পেশাগত স্থাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। এরমধ্যে শারীরিক, মানসিক কর্মপরিবেশ, রাসায়নিক, জীবানুঘটিত। একজন শ্রমিক জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটান তার কর্মস্থলে। কাজের প্রয়োজনে তাকে ঝুঁকিপুর্ণ যন্ত্রপাতি চালাতে হয়। তবে কর্মক্ষেত্রে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকে মালিকের। এ ক্ষেত্রে শ্রমিককেও থাকতে হবে যথেষ্ট সতর্ক। নিরাপদ কর্মস্থল শ্রমিকের অধিকার।
কবির হোসাইন বলেন, ‘সরকারি হিসাবে বরাবরই নিহতের সংখ্যা কম দেখানো হয়। আর যেহেতু ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাই মালিকপক্ষের দিক থেকেও দুর্ঘটনার বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কারণ সব ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর সংবাদ অনেক সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। এছাড়া আইনী দুর্বলতা তো আছেই।
কারখানার অধিকাংশ সময় শ্রমিকদের অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে দেখা যায়। ‘জাহাজভাঙা শিল্পে দেখা যায় শ্রমিকের বুটজুতা নেই, ওয়েল্ডিং এর জন্য সেফটি গ্লাস নেই, রাসায়নিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্ত হলে চিকিত্সার ব্যবস্থা নেই। কারখানা শ্রমিকদের বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বিপুল পরিমাণ গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত, নিহত বা রোগাক্রান্ত হচ্ছেন অথচ এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।
যেসব কারণে মূলত: কারখানায় অগ্নিসংযোগ হয় এর মধ্যে বৈদ্যুতিক শটসার্কিট বা গ্যাস লাইন ফেটে গিয়ে আগুন লেগে যাওয়া। ক্রটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ঝুলন্ত তারের সংস্পর্শে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হওয়া, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই উঁচুস্থানে কাজ করা এবং হটাত্ পড়ে যাওয়া, নির্মাণ ক্রটির কারণে ভবন ধস, অবৈজ্ঞানিক ও মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার ব্যবহারের কারণে বয়লার বিস্ফোরণ, রাসায়নিক সংস্পর্শে বিস্ফোরণ বা বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, পুরাতন ও অনিরাপদ যন্ত্রপাতির ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত ওজন বহনের কারণে ভারসাম্য হারানো, ঢাকনাবিহীন ঘূর্ণায়মান যন্ত্রপাতি বা বেল্ট চালনা করা, শ্রমিককে বিশ্রাম না দিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানো, পরিদর্শনের অভাব ইত্যাদি কারণে মূলত কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। শ্রমজীবী মানুষ যে কারণে পেশাগত রোগে আক্রান্ত হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শ। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাসহ অন্য আরও কারণে শ্রমিকরা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
