একটা সময় ছিল অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে মুখোমুখি হওয়া মানেই যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি। টানা নো বলের অভিযোগ, মাঠে হাতাহাতির উপক্রম, দল নিয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়া, আম্পায়ার বয়কট; কতো কিছুই না ঘটেছে দু’দলের ইতিহাসে। কিন্তু যারা এসব ঘটনার নায়ক সেই মুত্তিয়া মুরালিধরন, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, শেন ওয়ার্ন, স্টিভ ওয়াহ; কেউ আজ আর মাঠে নেই। ফলে ভাবা গিয়েছিল, এবার শ্রীলঙ্কার অস্ট্রেলিয়া সফরটা শান্তিপূর্ণই হবে। কিন্তু কীসের কী! সফর শুরু হতে না হতেই শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ!
এবার শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার ‘অফ দ্য ফিল্ড’ যুদ্ধের বিষয়—বল টেম্পারিং। চিরকাল অস্ট্রেলিয়দেরই অভিযোগের সামনে পড়তে হয়েছে লঙ্কানদের। এবার শ্রীলঙ্কাই অভিযোগ করল হোবার্ট টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেটসহ ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়া পিটার সিডল প্রথম ইনিংসে বল বিকৃত করেছেন। তার খুঁচিয়ে বল বিকৃত করার দুটি ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে ব্যাপকহারে ঘোরা শুরু করেছে।
শ্রীলঙ্কা দলের ম্যানেজার চারিথ সেনানায়েকে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আইসিসির হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন। কিন্তু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই সিডল এমন অভিযোগে ‘হতভম্ব’ বলে দাবি করেছেন। আর ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড বলেছেন, তারা আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলে এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে এমন অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি।
ঘটনার সূত্রপাত সেনানায়েকের কথাকে কেন্দ্র করে। দ্য অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকায় সেনানায়েকে বলেছেন, ‘যা কিছু ঘটেছে এবং আমরা টেলিভিশনে যা দেখেছি সে সম্পর্কে ম্যাচ রেফারির সাথে আমরা অনানুষ্ঠানিক আলাপ করেছি। সবাই বিষয়টি দেখেছে। এরপর আমরা এ ব্যাপারে কি ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে সেব্যাপারে জানতে চেয়েছি। বিষয়টি অনানুষ্ঠানিক হলেও ভিডিওতে সব আছে এবং পুরো বিশ্ব সেটা দেখেছে। আর তাই এখন আমরা আইসিসি’র সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।’
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবির প্রেক্ষিতে তাত্ক্ষণিকভাবে সিডল বলের উপর নখ দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে মনে হলেও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। কিন্তু শ্রীলংকান দৈনিকে সোমবার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে দু’জন অস্ট্রেলিয়ান বোলার স্পষ্টভাবে বল টেম্পারিংয়ের সাথে জড়িত। আর তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে শ্রীলংকান ম্যানেজমেন্ট।
সেনানায়েকেদের দাবি, প্রথমে ইনিংসের ১০ম ওভারে তার খেলোয়াড়রা সিডলকে নখ দিয়ে বল খুঁচিয়ে পরিবর্তন আনতে লক্ষ্য করেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা সিডলকে লক্ষ্য রেখে নিজেদের মতো করে ম্যাচ ভিডিও শুরু করেন। এরপর ৮৮তম ওভারে ব্রডকে নখ দিয়ে পরিষ্কার আবার বল খোঁচাতে দেখা যায় বলে দাবি করছেন সেনানায়েকে।
তিনি বলছেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে ব্রডের (ম্যাচ রেফারি) রুমে গিয়েছি। বলেছি, আমি যা দেখেছি, তুমি দেখেছ? সে বলেছে, হ্যা। এরপর তো আর কথা থাকে না।’
কিন্তু ক্রিস ব্রড ম্যাচ শেষে বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলছেন, নানাভাবে পরীক্ষা করেও এই দাবির স্বপক্ষে কিছু পাওয়া যায়নি, ‘এমনিতেই আম্পায়ররা নিয়মিত বল পরীক্ষা করেন। আর আমাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এমন অভিযোগ জানানোর পর আমি আম্পায়ারদের বলেছি, আরও বেশি করে বল পরীক্ষা করতে। কিন্তু আম্পায়াররা এমন কিছু পাননি। আর আমরা দফায় দফায় ভিডিও এবং স্টিল ফুটেজ দেখেও এর স্বপক্ষে কিছু পাইনি। ফলে এই ঘটনা নিয়ে কোনো অভিযোগ গঠন করা যাচ্ছে না।’
ব্রড এখানেই ব্যাপারটা শেষ করতে চাইলেও এখানে সব শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। অন্তত শ্রীলঙ্কান সংবাদ মাধ্যম যেভাবে উঠে-পড়ে লেগেছে; তাতে বিতর্কের আগুন বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার সংবাদ মাধ্যম দাবি করেছে, একজন নয়, দু দুজন অস্ট্রেলিয় বোলার আসলে বল টেম্পারিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এদের যথোপযুক্ত শাস্তি দাবি করেছে তারা। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে চলা ক্রিকেটিয় যুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় বলেও এটিকে উল্লেখ করছে লঙ্কান মিডিয়া।
এদিকে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক খোদ মাহেলা জয়াবর্ধনে বলছেন, তাদের হাতে অকাট্য কোনো প্রমান নেই বল টেম্পারিংয়ের পক্ষে। তিনি সব দায় দিয়েছেন টেলিভিশন সমপ্রচারকারীদের। তিনি বলছেন, ‘খেলা চলা অবস্থায় বারবার জুম করে করে এই দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এতেই পরিষ্কার বোঝা যায়, কিছু একটা হচ্ছে। সেটা কী? এখন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব টিভির লোকেদের কাছ থেকে এর কারণ জানা। আমরা পাচদিন ধরে মাঠে ছিলাম। আমরা কিছুই দেখিনি। আমরা টিভিতে দেখেই ঘটনাটা জেনেছি। আমি আগেই বলেছি, আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। আমরা কিছু দেখিনি।’
এদিকে অভিযুক্ত পিটার সিডল বলছেন, ওই ভিডিও ফুটেজটায় কিছু একটা করা হয়েছে। যাতে দেখলে মনে হয়, তিনি অন্যায় কিছু করছেন। তিনি বলছেন, ‘আমি অবাক হয়ে গিয়েছি, এটা দেখে। হাজার হাজার লোক খেলা দেখছে, ১৫টা ক্যামেরা সার্বক্ষনিক আমাকে অনুসরণ করছে। এ অবস্থায় আমি কেন এমন কিছু করতে যাব। বিশেষ করে আমরা যখন জানি যে, আমরা সততার সঙ্গে খেললেই জিতে যাবো।’
পুরো ঘটনায় আসলে দু দলের ওপরই ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। চিন্তায় পড়ে গেছেন সবাই। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক বলছেন, এমন অভিযোগ তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না। তিনি বলছেন, অধিনায়ক হিসেবে নিজে এবং দলের সবাইকে শতভাগ ক্রিকেটীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ রাখাটাই তার প্রধান কাজ। তার কোনো ব্যতয় ঘটেনি। এখন দেখার বিষয়, পানি কতোদূর গড়ায়।
