একসময় তাকে ছাড়া দেশের ক্রিকেট কল্পনা করা কঠিন ছিল। কিন্তু মাঝে ক্রিকেট থেকে বেশ দূরেই ছিলেন। দীর্ঘকাল পর আবার ক্রিকেট নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে এলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। এবার এলেন বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধনী নিয়ে চলতি বিতর্কে নিজের মতামত সামনে নিয়ে। যদিও সাবের হোসেন চৌধুরী দাবি করছেন, তিনি ফোরাম বা ক্লাব; কোনো পক্ষেই নয়। কিন্তু পরিষ্কারভাবে ফোরামের মতো করেই তিনি এই সংশোধনীকে ‘অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক’ বলে দাবি করলেন গতকালকের সংবাদ সম্মেলনে।
সাবের হোসেন চৌধুরীর প্রশ্ন বিসিবির কাছে—ক্রিকেটের গণতন্ত্রের এই দিনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) সংশোধীত গঠনতন্ত্র নিয়ে বিসিবি কেন নিরব? বিসিবির সাবেক সভাপতি ও একজন সংগঠক হিসেবে তিনি এনএসসির কাছেও প্রশ্ন করেছেন, কিসের ভিত্তিতে বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধীত হয়েছে? এসব দাবি-বক্তব্য নিয়ে কাল স্থানীয় এক হোটেলে সাংবাদিকদের সামনে মতবিনিময় করেন ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক এই সভাপতি।
বিসিবির নতুন সংশোধনী গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে এনএসসি। নতুন এই গঠনতন্ত্রকে সাবের হোসেন চৌধুরী অগণতান্ত্রিক এবং অনৈতিক বলে দাবি করেছেন, ‘বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্রটি অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক। এখানে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং মনে হচ্ছে পরস্পর বিরোধিতার গঠনতন্ত্র। সারাবছর জেলাগুলো খেলা চালাবে অথচ নীতিগতভাবে তাদের হাতে ক্ষমতা থাকবে না। এটা তো আইনলঙ্ঘন। অনৈতিক বলছি কারণ, প্রিমিয়ারের একটি ক্লাব বছরে অনেক টাকা ব্যয় করে ঠিকই। এই জন্য তারা একটি ক্লাবে দুটি করে ভোটের দাবি করছে। কিন্তু যাদের কোন ভোট নেই, সেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগেও তো নিয়মিত খেলা হয়ে থাকে। তাদের ব্যাপারে আমাদের কোন খেয়াল নেই। ক্লাবগুলোর জন্য ক্রিকেট আজ এই পর্যায়ে যেমন এসেছে এটা যেমন সত্যি; তেমনি ক্রিকেটকে বিকেন্দ্রিকরণ করতে হলে জেলা ও বিভাগীয়দের ভূমিকাও স্বীকার করতে হবে’।
বিসিবির গঠনতন্ত্র গত ১৪ বছরে বেশ ক’বার পরিবর্তন হয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী বলছেন, একটি বোর্ডের গঠনতন্ত্র এতবার পরিবর্তন হলে সেই বোর্ডের কাঠামোই তো ঠিক থাকে না, ‘১৯৯৮ সালে গঠনতন্ত্র তৈরি হওয়ার পর ২০০০ সালে এজিএমে আমরা কিছু পরিবর্তন করি। ২০০৩ সালে ফের কিছু পরিবর্তন করা হয়। ২০০৮ সালে আবার গঠনতন্ত্র নিয়ে কথা উঠে এবং পরিবর্তন আনা হয়। ২০১২ সালে মার্চে আবারো পরিবর্তন এবং সবশেষে নতুন করে সংশোধীত করা হয়েছে। ১৪ বছরে একটি গঠনতন্ত্র ছয় থেকে সাতবার পরিবর্তন করা হয়েছে। আসলে আমাদের গঠনতন্ত্রের কাঠামো আগে ঠিক করতে হবে’।
বিদায়ী বোর্ডের কমিটি থাকাকালীন বিসিবির সংশোধনী গঠনতন্ত্রে এনএসসি সংশোধন করেছিল, এনএসসির মনোনিত প্রার্থী একজনের জায়গায় তিনজন থাকবে। তা নিয়ে বিসিবি বেশ সোচ্ছার ছিল। কিন্তু বর্তমান আহবায়ক কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর এনএসসি গঠনতন্ত্রে আরো কিছু জায়গায় পরিবর্তন এনেছে অথচ বর্তমান কমিটি নিশ্চুপ। বিসিবির এই নীরব ভূমিকা নিয়েই সাবের হোসেন চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুমোদন হয়েছে কোন প্রক্রিয়ায়? কোন প্রস্তাবনার ভিত্তিতে এটি অনুমোদন হয়েছে? এনএসসি কয়েকটি জায়গায় সংশোধন করেছে তা রীতিমত সাংঘর্ষিক। আসলে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গঠনতন্ত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। ক্রিকেট বোর্ড এ বিষয়ে নিরব কেন? আমি তাদের ভূমিকা জানতে চাই’।
একজন সংগঠক কিংবা বিসিবির সাবেক সভাপতি হিসেবে সাবের হোসেন চৌধুরী এই দাবি তুললেও আসলে সরকারি একজন জনপ্রতিনিধি (এমপি) হওয়া সত্ত্বেও তিনি কি এই দাবি তুলতে পারেন? সাবের বলেছেন, ‘এটা এখন দেশের ভাবমূর্তির একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেট বোর্ড তাদের অবস্থান সম্বন্ধে নিশ্চিত করুক। আমি আমার নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছি’।
গত ২৬ নভেম্বর বিসিবির চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুইদিনের মধ্যে এনএসসি ক্রিকেট বোর্ডে একটি আহবায়ক কমিটি তৈরি করে দেয়। সেই কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এনএসসি বিসিবির কাছে সংশোধনী গঠনতন্ত্র পাঠিয়ে দেয়। তবে আগের কমিটি যে সংশোধনী দিয়েছিল, সংশোধনী গঠনতন্ত্রে আরো অনেক বেশি পরিবর্তন এনেছে এনএসসি। সাবের বলেন, ‘গঠনতন্ত্র মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ১৫ দিনের মেয়াদ বাড়ানো যেত। কিন্তু এত দ্রুত বোর্ড ভাঙ্গার কি কারণ থাকতে পারে? আমার জানা মতে নতুন করে সংশোধীত গঠনতন্ত্র নিয়ে আহবায়ক কমিটির মধ্যে আলোচনাও হয়নি’।
সংশোধনী গঠনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কুমিল্লার এক কাউন্সিলর হাইকোর্টে রিট করে স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। হাইকোর্ট এনএসসিকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেছে। হাইকোর্টে রিট থাকা সত্ত্বেও বিসিবির গঠনতন্ত্র নিয়ে মতবিনিময় করা কতটা যুক্তিযুক্ত? সাবের বলেন, ‘আসলে আমি আমার অবস্থানের কথা তুলে ধরেছি। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমি এই কথা বলছি’।
ক্রিকেটকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করার শ্লোগান দীর্ঘদিনের। কিন্তু দিন যতই গড়াচ্ছে ততই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে। সর্বশেষ বিসিবির সংশোধনী গঠনতন্ত্র তারই প্রমাণ। একজন সরকারের জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও সাবের হোসেন চৌধুরীও চাচ্ছেন ক্রিকেটকে রাজনৈতিক মুক্ত করতে, ‘ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না তবে সমন্বয় থাকতে পারে’।
বোর্ডের আগের কমিটি ভেঙ্গে যাবার পর ক্রিকেট বোর্ডে নির্বাচনে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। বিসিবির সংশোধনী গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বোর্ডের নির্বাচন প্রসংগ আসতেই তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন. ‘নির্বাচনের চেয়ে মুখ্য বিষয় হচ্ছে বিসিবির গঠনতন্ত্রের কাঠামো ঠিক করা’।
বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফর প্রসঙ্গও এলো সংবাদ সম্মেলনে। বিসিবির সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘ক্রিকেটারদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পাকিস্তানে যেতে পারে। যদি পূর্ণ নিরাপত্তা থাকেই তাহলে কেন পূর্ণাঙ্গ সিরিজ হবে না?’।
