দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে রক্ষা করেছেন বড় বড় বিপদ থেকে। কিন্তু এখন তিনি আর দলে নেই। মাঠের বাইরে থেকে দলের পরাজয় দেখেছেন রাহুল দ্রাবিড়। ক্রিকইনফোকে দেয়া সাক্ষাত্কারে ভারতীয় এই কিংবদন্তী দলের পারফরম্যান্স, ভবিষ্যত্, অধিনায়কত্ব এবং শচীন টেন্ডুলকারকে নিয়ে কথা বলেছেন—
ভারত সর্বশেষ দেশের মাটিতে সিরিজ হেরেছিল ২০০৪ সালে। আপনি সেই হারা দলের সদস্যও ছিলেন। তারপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই হারকে বলা হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটে সবচেয়ে খারাপ অধ্যায়। আপনি কি মনে করেন?
দেখুন, ভারত যেহেতু দেশের মাটিতে খুব একটা হারে না। তাই দেশের মাটিতে হারলেই সেটাকে খারাপ অধ্যায় বলা হয়। তবে আপনাকে এটাও বুঝতে হবে যে, এই দলটা ছোট-বড় একটা পালাবদলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য তাদের একটু ছাড় দেয়া উচিত। হ্যাঁ, ভারতীয় দল নিশ্চয়ই হতাশ হয়েছে। তারা আশা করেছিল নিজেদের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারাবে। সিরিজের শুরুতে,বিশেষ করে আহমেদাবাদের পর ভারতীয়রা ভাবছিল, সিরিজটা জেতাও সম্ভব। কিন্তু সব ঘটনা মনের মতো ঘটেনি। আমি মনে করি, এখন ভারত এখান থেকে কেবল উন্নতিই করতে পারে। তারা সমপ্রতি দেশের বাইরে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাজে ভাবে হেরে ফিরেছে। ফলে এখন উন্নতি করতেই হবে। দেশের বাইরের হারটায় মনে হতে পারে, বাইরে তো আমরা ভালো খেলি না। কিন্তু এখন দেশেও জিততে পারলাম না। ফলে এখন ফিরে দাঁড়াতেই হবে।
নির্দিষ্ট করে বললে, ঠিক কোন জায়গায় সিরিজটা হারল ভারত? যদি কিছু পয়েন্ট বলতেন...
সোজা কথা, তিন বিভাগেই ভারতকে ওরা উড়িয়ে দিয়েছে। এটা শুনতে একটু ক্লিশে মনে হতে পারে; সব সময় হারের পর এটাই বলা হয়। তারপরও আবার বলতে হবে, ইংল্যান্ড ভারতের চেয়ে ভালো দল ছিল। দেখুন, সেরা পাঁচ রান সংগ্রাহকের মধ্যে একজন মাত্র ভারতীয়—চেতেশ্বর পূজারা। বোলিং বিভাগে ওদের দুই স্পিনার ও জেমস অ্যান্ডারসন অসাধারণ বল করেছে। ফিল্ডিংয়ে আমি বলবো, ইংল্যান্ড এক্কেবারে নিখুঁত পারফরম্যান্স করেছে। গ্রাউন্ড ফিল্ডিং, ক্যাচিং, একাগ্রতা, মাঠে উজ্জীবিত থাকা; প্রতি ক্ষেত্রেই ভারত ছিল দুই দলের মধ্যে দ্বিতীয়। এই যে সিরিজ শেষে ২-১ স্কোর লাইন দেখা যাচ্ছে; এটা আমার মনে হয় একেবারে যথার্থ।
ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ১২টি টেস্টের ১০টিতেই হেরেছে ভারত। আপনি ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বললেন। কয়েক মাসের মধ্যে আবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা। এই সময়ের মধ্যে কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব?
প্রথম কথা হলো, সামনে ওয়ানডে ক্রিকেট আছে। সেখানে ভালো খেলতে হবে। আমি জানি, এখনই এটা বলার সময় আসেনি। তারপরও ইংল্যান্ড এখন এই কন্ডিশনেও দারুণ দল। তাদের দু’জন দুরন্ত স্পিনার আছে। সে তুলনায় অস্ট্রেলিয়া...। হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়া সব সময়ই লড়াকু দল, কঠিন প্রতিপক্ষ। কিন্তু ওদের কোয়ালিটি স্পিনার আছে কি না; তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। নাথান লিওন হয়তো ভালো। বাকি ওদের স্পিন সম্পর্কে আমি নিশ্চিত না। ব্যাটিংয়েও একই কথা বলা যায়। দলে এক ঝাঁক তরুণ ব্যাটসম্যান আছে; যারা আগে কখনো ভারতেই আসেনি। ফলে আমি অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার কারণ দেখি না। বরং ওই সিরিজেই ভারতের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। আর দেশের মাটিতে এই সিরিজ নিয়ে নয়; মূলত দেশের বাইরের সিরিজ নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।
ভারত তার পরবর্তী বিদেশ সফরে যাচ্ছে ২০১৩ সালের শেষদিকে। আপনাকে যদি একটা স্থিতিশীল দল করতে বলা হয়; তাহলে এই দলে এই সময়ে কী কী পরিবর্তন আনতে চাইবেন?
প্রথমেই আপনাকে দেখতে হবে, দেশের বাইরে ভালো পারফরম করার মতো খেলোয়াড় কারা আছে। কারা দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করতে পারে। এখানে তরুণ ও অভিজ্ঞতদের একটা মিশ্রণ দরকার। আপনি আশা করতে পারেন না যে, যাকে পাবেন তাকেই পাঁচ বা তিন বছর মেয়াদী পরিকল্পনায় অর্ন্তভুক্ত করবেন। কিছু খেলোয়াড় থাকবে; যারা এখনই ভালো পারফরম করতে পারবে। আবার কয়েক জনকে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
বীরেন্দর শেবাগ ও গৌতম গম্ভীরের জুটি নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। গত ১৭ ইনিংসে তাদের যৌথ গড় ৩২। এদের কাউকে কি বাদ দেয়া উচিত বা নিচে ব্যাটিং করানো উচিত? বিশেষ করে আজিনকা রাহানে যখন অনেকদিন ধরে বাইরে অপেক্ষা করছে।
আমার ধারণা এসব আলোচনা ওদের ওপর বরং চাপ তৈরি করছে। তারা ভারতের জন্য অসাধারণ একটা ওপেনিং জুটি। ইতিমধ্যে তারা ভারতের হয়ে অনেক কিছু করেছে। তারা এখনও ভালো যে খেলতে পারে, তার ঝলক আমরা এই সিরিজেই দেখেছি। বেশ কয়েকবার ৪০-এর ঘরে পৌঁছেছে ওরা। শেবাগ প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছে। কিন্তু তবে, এটা ঠিক যে, এখন একটু দূরের কথা ভাবার দরকার। আমি বারবার যেটা বলছি, এই অস্ট্রেলিয়া আসছে, এটা নিয়ে আমি ভাবছি না। দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফর নিয়ে ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে হয়তো এই জুটিটা ভাঙা দরকার। এদের কাউকে একটু নিচে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে দেখা যেতে পারে। এটা একটা ভালো সম্ভাবনা।
শচীন টেন্ডুলকারের বেশ বড় সময় ধরে খারাপ সময় যাচ্ছে। যদিও তিনি কলকাতায় ৭৬ রানের ইনিংস খেলেছেন। এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে ২০১৩ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তিনি থাকবেন কি না। ভারতের কী এখন তাকে বাদ দিয়েই চিন্তা করা উচিত?
দেখুন, ক্রিকেট খেলাটার অনেক বড় একজন সেবক শচীন টেন্ডুলকার। ভারতীয় ক্রিকেটের অনেক বড় এক সম্পদ। সে একজন গ্রেট খেলোয়াড়। হ্যাঁ, তার একটা খারাপ সময় যাচ্ছে। সে সব সময়ই খুব আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ। এই ব্যাপারটা তাকে নিশ্চয়ই আহত করছে। ঘটনা হচ্ছে, দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলা উচিত। জানা উচিত তার মনের কি অবস্থা, সে কী ভাবছে এবং তার পরিকল্পনা কী। এই আলোচনার পর তাকেই দায়িত্ব দিতে হবে সিদ্ধান্ত নেয়ার। কারণ আমি বিশ্বাস করি, টেন্ডুলকারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সবার থাকা উচিত না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সিদ্ধান্ত শচীনেরই হওয়া উচিত। তাকেই ভাবতে হবে যে, হ্যাঁ আমি ভারতের, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউল্যািন্ড, ইংল্যান্ড সফরে নিজের সেরাটা খেলতে পারব। শুনুন, ওর মনে যদি একবারও সন্দেহ তৈরি হয়; সে সঙ্গে সঙ্গে ক্যারিয়ারের শেষ নিয়ে ভাবা শুরু করবে। ওর চেয়ে বেশি ভারতের ক্রিকেটের মঙ্গল কেউ চায় না। ফলে এটা তারই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
এটা ভয়াবহ আবেগের একটা ব্যাপার। এই আবেগ সরিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে। সময় আছে। কথা বলুন। তারপর সে যে সিদ্ধান্ত নেয়; সেটাকেই সম্মান জানান।
ধোনির অধিনায়কত্ব নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন, এখনও সেই ভারতের যোগ্য অধিনায়ক?
অধিনায়কত্বের এটাই মজা। অনেক সিদ্ধান্ত সে নেয়, অনেক কিছু করে। বাইরে থেকে এটা বলা সম্ভব না যে, সে এটা ভুল করছে। এই মুহূর্তে আমি ধোনির ভালো কোনো বিকল্পও দেখি না। আমি আসলেই মনে করি, ভারতকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা ধোনিরই আছে। ওর সেই উদ্দীপনা আছে, আগ্রহ আছে, প্যাশন আছে, খেলাটা উপভোগ করে।
