মূল ফিচার

নতুন দিনের চোরাবালি

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৩৮
‘নতুন দিনের নতুন ধারার চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’কে বিনা কর্তনে ছাড়পত্র দিয়ে অনুপ্রাণিত করার জন্য সেন্সরবোর্ডের সকল সদস্যদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। একদিন একদিন করে এগিয়ে আসছে ‘চোরাবালি’র মুক্তির দিনটি।’ এভাবেই ‘চোরাবালি’র মুক্তি পাওয়ার ঘোষণাটি উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে দিলেন চলচ্চিত্রটির পরিচালক রেদওয়ান রনি। আগামী ২১ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে রেদওয়ান রনি পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। এটি আশীর্বাদ চলচ্চিত্রের ব্যানারে ঢাকাসহ সারাদেশে মুক্তি পাচ্ছে। এটি জাজ মাল্টিমিডিয়া, রেইন পিকচার্সের প্রজেকশনসহ রিল ও প্রিন্টের মাধ্যমে মোট ৪০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। ছবিতে ভিন্নতা আনতে সংযোজন করা হয়েছে একটি আইটেম গানও। এ গানে নাচবেন হলিউডের অভিনেত্রী সিন্ডি রোলিং। সিনেমাটিকে গত ২৬ নভেম্বর বিনা কর্তনে ছাড়পত্র দিয়েছে সেন্সর বোর্ড। চলচ্চিত্রটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করেছেন ‘বাইশে শ্রাবণ’খ্যাত ইন্দ্রদীপ দাস গুপ্ত। আর চলচ্চিত্রের গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন আরফিন রুমি, ন্যান্সি, অনুপম, হূদয় খান, কনা, মিলন মাহমুদ, আইয়ুব বাচ্চু প্রমুখ। গত ১২ ডিসেম্বর ‘চোরাবালি’ টিম প্রথম প্রচার শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। এরপর ইউল্যাব, নর্থ সাউথসহ আরও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে তাদের প্রচারের কাজ। ছবি মুক্তির দিন থেকে বেশ কয়েকদিন ঢাকার বিভিন্ন হলে গিয়ে দর্শকদের সাথে বসে ছবি দেখবে ‘চোরাবালি’ টিম। এ ছাড়া বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ‘চোরাবালি’র গান ও প্রিমিয়ার প্রচার হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার ও বিলবোর্ড লাগোনো হচ্ছে। এক অন্ধকার জগতের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে অ্যাকশন থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। একটি স্ক্রিন হাউজ এন্টারটেইনমেন্ট প্রযোজনায় এই ছবির কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন রেদওয়ান রনি। এতে অভিনয় করেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত (ভারত), জয়া আহসান, শহীদুজ্জামান সেলিম, সোহেল রানা, এটিএম শামসুজ্জামান, ইরেশ যাকের, পিয়া, হুমায়ূন সাধু প্রমুখ। পরিচালক রনি জানান, পুরান ঢাকার গোপীবাগের বেঙ্গল গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ‘চোরাবালি’র শুটিং। প্রথম দিন শুটিংয়ে অল্পকিছু শট দেওয়ার পর অসুস্থ বোধ করায় আর কাজ করেননি হুমায়ুন ফরীদি। দ্বিতীয় দিনে প্রথম দৃশ্য শুটিং করার সময়ই অনেক অসুস্থ হয়ে যান তিনি। তারপর আর ‘চোরাবালি’তে কাজ করতে পারেননি, তার চরিত্রে অভিনয় করেন শহীদুজ্জামান সেলিম। এই ছবির শুটিংয়ের প্রয়োজনে সূর্যোদয়ের দৃশ্যধারণের জন্য ২৫তলা হেঁটে উঠতে হয়ে পুরো ইউনিটকে। হেঁটে উঠতে কোমরে ব্যথা পান রেদওয়ান রনি। যেতে হয় হাসপাতালে পরবর্তী কয়েকদিন শুয়ে থেকে পরিচালনার কাজ করতে হয়েছে, কারণ শিল্পীদের সিডিউল জটিলতার কারণে শুটিং পেছানো সম্ভব হয়নি। এই ছবিতে অভিনয় প্রসঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত বলেন, ‘মুম্বাইয়ের একটা রেস্টুরেন্টে বসে রেদওয়ান রনির কাছে ‘চোরাবালি’ গল্পটা শুনেই ভালো লেগেছিল অনেক। সে সময় আমার সিডিউল ছিল না, কয়েকটি সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, তার ভেতর ‘কাহানি’ অন্যতম। মাঝখানে ২ মাস ফাঁকা রেখেছিলাম স্ত্রী বারখাকে সময় দিতে কারণ সে তখন সন্তানসম্ভবা। কিন্তু গল্প শুনে এতটাই ভালো লেগেছিল যে, বারখাকে বলতেই রাজি হয়ে গেল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে অন্য রকম একটা ধারণা ছিল কিন্তু কাজ করতে এসে বুঝলাম, কলকাতার নতুন দিনের চলচ্চিত্রের মতো বাংলাদেশেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে অনেক ভালো চলচ্চিত্র বের হয়ে আসবে। এর ভেতর ‘চোরাবালি’ অন্যতম। ‘চোরাবালি’তে কাজ করে অনেক ভালো লেগেছে। আশা করি অনেক ভালো একটি ছবি হবে, ইউটিউব ও ফেসবুকে ‘চোরাবালি’র ট্রেলার দেখে অনেক এক্সাইটেড।’ ছবিতে অভিনয় প্রসঙ্গে জয়া আহসান বলেন, ‘এই ছবির গল্প অনেক সুন্দর। আর আমার চরিত্রটিও অনেক মজার। সব মিলিয়ে এই ছবিতে অভিনয় করে আমি আনন্দিত। আর এই ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে চরিত্রের প্রয়োজনে স্কুটি চালানো শিখতে গিয়ে হাতে আঘাত পেলেও হাল ছাড়িনি। স্কুটি চালানো শিখেছি এবং কোনো ডামি ছাড়াই নিজে স্কুটি চালিয়ে শুটিং করেছি। আশা করছি ছবিটি দর্শকদের ভালো লাগবে।’ নাসিরউদ্দিন ইউসুফের পরিচালনায় ‘গেরিলা’ ছবিতে তিনি অভিনয় করে নিজের অভিনয় দক্ষতার গুণে দর্শকদের কাছে ব্যাপক গ্রহণীয় হয়ে উঠলেও এবার একটি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে জয়া বলেন, ‘দর্শক সাড়ার ওপর নির্ভর করেই আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করছি। হয়তো টার্গেট পিপল একেক ছবিতে একেক ধরনের। ‘ডুবসাঁতার’ ছবিতে এক ধরনের, ‘গেরিলা’ ছবিতে আরেক ধরনের, আবার ‘চোরাবালি’ ছবিতে একেবারেই অন্য ধরনের। আমি আমার চরিত্র নিয়ে বেশ মনোযোগী। জয়া আহসান আরও বলেন, আমি এ যাবত্ নাটক ‘পাঞ্জাবিওয়ালা’র প্রিন্সেস মনিকা, ‘তেভাগা’র শহরবানু, ‘অদ্ভুত সন্দেশ’র রাজমিস্ত্রির বৌ, ‘সূর্যের হাসি’র আয়েশা, ‘শঙ্খবাস’র পুষ্প, ‘অফবিট’র বোবা মেয়ে অথবা আঙ্গুরলতার চরিত্রে অভিনয় করেছি। চরিত্রগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কিন্তু চরিত্রগুলো একেকটি এক ধরনের। ‘চোরাবালি’ ছবিতেও আমার চরিত্রে বৈচিত্র্য আছে। আশা করছি এটি দর্শক গ্রহণ করবে। পরিচালক রেদওয়ান রনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের দেশে সিনেমা থেকে দর্শক সরে যাওয়ার মূল কারণ হলো ভালো মানের বিনোদনমূলক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অভাব। মধ্যবিত্ত কিংবা বৃহত্ কলেজ-ভার্সিটি দর্শক এবং সিনেমা হলে আসতে চায় এ রকম কোটি দর্শক তারা মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র দেখতে আসছে না, তারা একটি পরিচ্ছন্ন বিনোদনের ভালো গল্পের ছবির অভাব বোধ করে। আবার বিকল্প ধারার যে সব চলচ্চিত্র বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে যোগ দিচ্ছে সেগুলো সাধারণ দর্শককে ঠিক বিনোদন দিয়ে উঠতে পারছে না। এসব কথা মাথায় রেখে আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’র পরিকল্পনা করা। ‘চোরাবালি’র গল্প, সবার অভিনয়, গান, নির্মাণশৈলী সবাইকে মুগ্ধ করবে এই বিশ্বাস আমার আছে, কারণ এটি শুধুমাত্র দর্শকের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে।’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান স্ক্রিনহাউজ এন্টারটেইনমেন্টের কর্ণধার সালেহীন স্বপন বলেন, ‘চোরাবালি’ চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক মানের একটি কাজ হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। ভারতের প্রসাদ ল্যাব এবং কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত একটি ব্যতিক্রমধর্মী ছবি এটি।’ ৩৫ মিমি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে মুক্তি পাচ্ছে ‘চোরাবালি’। এ প্রসঙ্গে পরিচালক জানান, চোরাবালি মুক্তি পাচ্ছে ২১ ডিসেম্বর। এরই মধ্যে ঢাকাসহ দেশের ২০টি প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। দেশের বাইরেও ছবিটি মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রনি জানান, ছবিটি তিনি ৩৫ মিমি প্রযুক্তিতে তৈরি করেছেন। কিন্তু এখন যেহেতু কিছু প্রেক্ষাগৃহে ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে, তাই ওই সব প্রেক্ষাগৃহের জন্য ছবির প্রিন্ট ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের এ প্রজন্মের দর্শকদের জন্য ‘চোরাবালি’ হতে পারে নতুন দিনের এক আহ্বান। বাংলা চলচ্চিত্রের এতদিনের ইতিহাসের খানিকটা ব্যতিক্রমী এই চলচ্চিত্র। এখন দেখার পালা আলোচিত এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের কতটা হলমুখী করতে পারে। চলচ্চিত্রের এই মন্দা সময়ে ‘চোরাবালি’ নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে এ আশা সবারই।