গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ খনি। বিষয় ও আঙ্গিকে এটি এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। একজন পাঠককে একেক সময়ে একেকটি সৃষ্টি অভিভূত করে। তাঁর ‘ইনোসেন্ট ইরেন্দিরা অ্যান্ড হার ক্রোয়েল গ্র্যান্ড মা’ ও ‘স্ট্রেঞ্জ পিলগ্রিম’ গল্পগ্রন্থ দুটি গল্পের অভিনব জগতের সন্ধান দেয়। এ ছাড়া মার্কেজের নোবেল বিজয়ী উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’ পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে আছে। বিশ্বসাহিত্যের প্রধান যে ধারাটি কাফকা, ক্যামু, ফকনার, হেমিংওয়ে, জয়েস, বোর্হেসের অবদানে গড়া, তারই জারকরসে সমৃদ্ধ হয়ে এক স্বতন্ত্র জগত্ সৃষ্টি করেছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। আর তারই চূড়ান্ত এক সফল সৃষ্টি ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। হয়তো এটি জটিল, দুর্বোধ্য; কিন্তু এর যে শিল্পগুণ ও সহিত্যরস, তা নিঃসন্দেহে শুধু অভিনব নয়, অনন্য-সাধারণ। মার্কেজ নিজেও অনেকবার ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’ নয়, ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’কে তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ ক্যারিবীয় এক রাষ্ট্রের (যার নাম উল্লি¬¬খিত হয় না) প্রেক্ষাপটে লেখা, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সামরিক শাসন, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সঙ্কট, তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করার সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত—প্রভৃতি চমত্কার এক প্রতীকী কৌশলে তুলে ধরা হয়েছে। উপস্যাসটির মূল চরিত্র একটি রাষ্ট্রের একনায়ক, যারও কোনো নাম উপন্যাসটিতে উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তার একটি নাম নিশ্চয়ই আছে। এভাবে রাষ্ট্রনায়কটি প্রকারান্তরে যেমন নামহীন, বাস্তবে সে গোত্রহীন বা পিতৃপরিচয়হীনও বটে। ক্যারিবীয় সাগরের উপকূলে দরিদ্র পাহাড়ি এলাকার যাযাবর এক পাখিওয়ালির সন্তান সে। ম্যাকাও পাখি বিক্রিকারিণী বেনদিসিয়ো আলভারাদোর এই সন্তানটি তার গর্ভে আসে অজ্ঞাতপরিচয় এক ডাকাতের পালিয়ে যাওয়ার আগে ঝটিকা-র্যাপের মাধ্যমে। এই অবৈধ সন্তান, যে দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যেতে পারেনি, সে-ই একদিন হয়ে ওঠে ক্ষমতাধর জেনারেল?রাষ্ট্রের একনায়ক। সে লিখিত আইনের ফ্যাকড়া এড়াতে তার মুখের কথাকেই আইন করে, রাষ্ট্রীয় সিলমোহর হিসেবে তার বুড়ো আঙুলের ছাপ মেরে দেয়। জাতির জনকের মতো তার প্রতিকৃতি উত্কীর্ণ হয় মুদ্রা, খাম, এমনকি কনডমেও। যে নারীকে তার মন চায়, তাকে তুলে আনে যৌনশয্যায়। সে নির্দ্বিধায় দুই হাজার শিশুকে ডিনামাইটের তোপে সমুদ্রে উড়িয়ে দেয়। তাকে হত্যার সব প্রচেষ্টা সে যেমন নির্মমভাবে প্রতিহত করে, তেমনি তার ক্ষমতার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সন্ধান কিংবা তেমন সন্দেহ হলে তাকে নির্বিচারে হত্যা করে। দেশের মানুষ তার মৃত্যু কামনা করে?তার মৃত্যু হোক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায়, কোনো গণ বা বিপ্ল¬¬বী অভ্যুত্থানে, অন্তত বার্দ্ধক্যজনিত কারণে। এর মধ্যে বহুবার তার মৃত্যুর খবর রটে। এমনকি, তার মৃতদেহেরও দেখা মেলে, আসলে যা তার শাসনকালের মৃত্যু অতিক্রম বা ফাড়া কাটিয়ে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার কৌশল। কিংবা সে মৃত্যুর অভিনয় করে তার সহযোগীদের প্রকৃত চেহারাটি চিনে নিতে। ওদিকে বিপ্ল¬¬বীরাও সফল হয় না তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। কারণ, সুযোগসন্ধানী বা সুবিধাভোগী ছদ্মবেশী প্রগতিশীলরা রক্ষণশীলদের কাছে তাদের আন্দোলন বিক্রি করে ফায়দা লোটে। এদিকে জেনারেল তার সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখতে দাতা বা আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের কাছে সমুদ্রবন্দর, কয়লাখনি, কোকো ও কফিবাগানের লিজ বা মালিকানা তুলে দেওয়ার কারসাজি করে। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে জেনারেল শক্ত হাতেই সিস্টেমকে ধরে রাখে, সামরিক শাসনে কোনো অরাজকতা হতে পারে না। উপন্যাসটিতে লেখক এক অসাধারণ দক্ষতায় সামরিক শাসনের দোর্দণ্ড প্রতাপ আর দৌরাত্ম্য চিত্রিত করে। ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’-এ জেনারেল ক্ষমতা হস্তগত করার সময়েই ভাগ্যগণনাকারিণী তাকে বলেছিল, ১০৭ থেকে ২৩২ বছর পর্যন্ত বাঁচবে সে। বাস্তবে এমন হয় যে ক্যু, আন্দোলন—নানা কিছুই ঘটে, হয়তো তার জন্মান্তর বা বদল ঘটে কিংবা সে মৃত্যুর অভিনয় করে কিন্তু মৃত্যু তাকে স্পর্শ করে না। সে তার শাসন অব্যাহত রেখে এগিয়ে যায় অনন্তের দিকে। সে রোগ-বালাই, ভূমিকম্প, বন্যা, মহামারীর ত্রাণকর্তা, তার কাছ থেকে দেশের সব অন্ধ, পঙ্গু, কুুষ্ঠরোগী দাওয়াই পায়। তার হেরেমে এক হাজার উপপত্নী, যারা তার ঔরসে জন্মানো সাড়ে সাত মাসবয়সী বামুন সন্তানদের নিয়ে বাস করে। বস্তুত, তার কোনো সন্তানই স্বাভাবিক চেহারা ও বৃদ্ধি নিয়ে জন্মায় না। উল্লি¬খিত প্রতীকী বিষয় বা ঘটনার মধ্য দিয়ে জেনারেল সেই রেড ইন্ডিয়ান ভবিষ্যত্-গণনাকারী বৃদ্ধার বাণীকে মোটামুটি ফলপ্রসূ করে দেশ শাসন করে প্রায় ২০০ বছর।
এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেশের জনগণ কোনোদিন তাকে দেখতে পায় না। পত্র-পত্রিকায় আজ তার যে ছবিটি ছাপা হলো, যদিও তা তার গতকালের হওয়ার কথা, তা গতকালের তো নয়ই, এমনকি তারও নয়। এটি হয়তো তার কোনো ডামি কিংবা এক শতাব্দী আগের। এর সবই গূঢ়, বহুমাত্রিক তাত্পর্যবাহী।
উপন্যাসটির শুরু হয় জেনারেলের মৃত্যু বা তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রাসাদের চিত্রকে কেন্দ্র করে এবং পুরো উপন্যাসের চলমান সময়ে সে হার্নিয়া-গ্রস্ত অতিকায় অণ্ডকোষবাহী এক বৃদ্ধ সামরিক একনায়ক। উল্লি¬¬খিত ঘটনাবলি ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে সুকৌশলে, বলা যায় সুদীর্ঘ পঙিক্ত বা রূপকল্পের অভিনব আঙ্গিকে সংস্থাপিত হয়। এ ক্ষেত্রে উল্লে¬খ্য, ঘটনার মধ্যে যেসব চরিত্র চিত্রিত, হয় তার মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেনারেল রড্রিগো দ্যু আগুইলার, যাকে জেনারেল নিজেই হত্যা করে, রেড ইন্ডিয়ান জেনারেল স্যাতুর্নো স্যান্তোস, উচ্চাকাঙ্ক্ষী বেসামরিক যুবক বারা, জেনারেল লোটারো মুনোজ?ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সহায়তায় যে দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে হত্যা করে, তার এই ক্ষমতা-দখল, একমাত্র বৈধ স্ত্রী লেতিসিয়া নাজারেনো, ম্যানুয়েলা স্যানচেজ?যে তরুণীর প্রেমে সে একদা দেওয়ানা হয়—এরা সব উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
মার্কেজের প্রেমের উপন্যাসের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’।
এ উপন্যাসে যৌবনের প্রেমিকা ফারমিনার জন্য এরিজার অপেক্ষা সারা জীবনের। দীর্ঘ একাকী জীবনে নায়ক সবই করে?ব্যবসা, দেহভোগ, মদ্যপান। কেবল বিয়ে ছাড়া। দুজন যখন প্রৌঢ়ত্বের সীমায়, বিধবা হয় ফারমিনা। এমন সময়টির জন্যই যেন এরিজার এতকালের প্রতীক্ষা। কী অসাধারণ কৌশলে প্রেমের সব আবেগ, উপলব্ধিকে এখানে তুলে আনা হয়েছে! প্রেমিকাকে না পেয়ে বাকি জীবন একা থাকা প্রেমিকের প্রেমের গভীরতা বা ত্যাগ পাঠকদেও তার সঙ্গে একাত্ম করে। হয়তো মানুষের স্বাভাবিক সংসারজীবনেও তার ভেতরে বাস করে প্রেমিকাকে না পাওয়া এক চিরকুমার। কিন্তু ঠিক কী কারণে ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ পাঠকের প্রিয়তা লাভ করে, তা পরিষ্কার বলা কঠিন! হয়তো সব মানুষের মধ্যে এক ক্ষমতালিপ্সু নিষ্ঠুর মানুষ বাস করে। এ ক্ষেত্রে জেনারেলের নিষ্ঠুরতা যেমন তুলনারহিত তেমনি তার প্রতিও নিষ্ঠুরতা কম হয়নি। তার স্ত্রী ও কিশোরপুত্র—ক্ষুদে এক সামরিক শাসক বা জেনারেলের মতো আচরণ করত—তাদের ওপর এমনভাবে দক্ষ শিকারি কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয় যে, মুহূর্তেই এরা তাকে ছিঁড়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। হয়তো পাঠক করুণাকাতর হয় স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রহারা বিশাল অণ্ডকোষের হার্নিয়াগ্রস্ত এক বৃদ্ধের জন্য, যে বিশাল প্রাসাদে নিঃসঙ্গ হাহাকার করে ফেরে। তার বিশাল প্রসাদের নির্জনতায় বৃদ্ধ জেনারেল যখন হাহাকার করে, তা পাঠকের সহ্য করা দুরূহ হয়। মার্কেজ এ বিষয়টিকেই এমন দক্ষতায় তুলে আনেন। তবে এই করুণা মানে এই নয় যে, তার সব অপরাধ ভুলে যাওয়া বা তাকে ক্ষমা করে দেওয়া সহজ। এই জেনারেলের মতো শাসক দেশের, সাধারণ মানুষের কী অপূরণীয় ক্ষতি করছে, তা প্রকাশ করা সত্যিই দুরূহ। সেই দুরূহ কাজটি মার্কেজ তাঁর ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ উপন্যাসে সফলভাবে করে দেখিয়েছেন।
কিংবা এসব বিষয় তো আছেই; কিন্তু তার পরও উজ্জ্বল ও তাত্পর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে এর চিত্রকল্পময়তা, যা ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ রচনাটিকে অনন্য-সাধারণ এক আধুনিক কবিতা করে তুলেছে। চমত্কার চিত্রকল্পময় ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। যিনি ইংরেজিতে এটি অনুবাদ করেছেন সেই গ্রেগরি রাবাসার ভূমিকাকেও এখানে গুরুত্ব দিতে হয়। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়েও যখন পূর্ণচ্ছেদ মেলে না, তখন খেই হারিয়ে ফেলার দশা হওয়াই স্বাভাবিক অথচ এর জন্যই সেই সুদীর্ঘ, জটিল লাইনে সৃষ্ট রূপকল্পময়তার সৌন্দর্য অনিঃশেষ থেকে যায়, আর বারবার পাঠে প্রণোদনা জোগায়। Alastair Reid বলেছেন, The book is essentially concerned with deception and illusion. It asks to be read more than twice, and the rewards are dazzling। প্রতারণা আর ভ্রান্তিমোহে আচ্ছন্ন এই উপন্যাসের রস বারবার পাঠেও অনিঃশেষ।
মার্কেজ কখনো কখনো বলেছেন এটিই তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, তবে সব সময়ে না। অর্থাত্, তিনি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারছেন না। অনেক সমালোচক ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’কেই তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলেছেন। আবার অনেকে উপন্যাসটিকে তুলোধুনো করতেও ছাড়েননি। তাঁর নোবেলজয়ী উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’-এর জাদুবাস্তবতা বা উপস্থাপনাও কখনো কখনো যেন ফিকে মনে হয়। বিষয় বা ঘটনা প্রকাশেও কোথাও কোথাও তিনি মিতব্যয়ী হতে পারেননি। কিন্তু বিষয়ের যুগপত্ উপস্থাপনে ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’-এর কম্প্যাক্টনেস বিস্ময়কর। আর ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ সম্পর্কে Jill Neville-এর মত হচ্ছে, এটি Mesmeric, ornate, horrifying… a magnificat to harsh Latin American reality। উপরন্তু বিশ্বসাহিত্যের মূল ধারার ঐতিহ্যকে সার্থকভাবে ধারণ করে সমকালে কথাসাহিত্যে তিনিই অগ্রগণ্য।
‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ যদিও অবিচার, নিষ্ঠুরতা, পুঁজিবাদের চক্রান্ত, হত্যা, নানা স্বৈরাচারে পূর্ণ; যা পাঠকদের এক অসীম যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, তা কিন্তু শেষ হয় এভাবে, ‘...to the streets singing hymns of joy at the jubilant news of his death and alien forevermore to the music of liberation and the rockets of jubilation and the bells of glory that announced to the world the good news that the uncountable time of eternity had come to an end. এই সমাপ্তি কনভেনশনাল; কিন্তু পাঠকদের একধরনের স্বস্তি দেয় বৈকি!
এখন অনেক পাঠকের প্রিয়তম সাহিত্য ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’। কিন্তু একদা যারা প্রিয় ছিল? তারা কি সব হারিয়ে যাবে? হারানো প্রেম যেমন হারায় না, স্মৃতির সঞ্চয়ে থাকে—অন্তত যেটুকু থাকার মতো সবই থাকে—সে রকম অতীত পাঠের জারক রসটুকু নিশ্চয়ই পাঠকের সঞ্চয়ে থাকবে। Lucy Hughes-Hallett ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ সম্পর্কে বলছেন, Marquez has written a baroque legend…। নিশ্চয়ই এমন এক মহত্ সৃষ্টি ‘দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ও একদিন জমা হবে অসংখ্য পাঠকের সোনালি সম্ভারে।
