দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী

প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ভবিষ্যত্-ভাবনা

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৬
তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মানের একটি দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করা এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ কাজ নয়। পৃথিবীর অনেক উন্নত সংস্কৃতি ও সম্পদশালী দেশও এ ধরনের আয়োজন করতে সাহসী হয় না। বাংলাদেশ এটি করেছে। আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী বিগত প্রায় চার দশক ধরে শিল্পকলার বিকাশে নিষ্ঠার সাথে এগিয়ে চলেছে। শিল্পকলা একাডেমীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। বিগত দশকগুলোতে সে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ না হলেও যা পেয়েছি, তা একেবারই নগণ্য নয়। শিল্পকলার যাত্রাপথে এ পর্যন্ত ১৯টি নবীন, ২০টি জাতীয় ও ১৫টি এশীয় বিয়েনাল আয়োজন করা কম কথা নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব নিয়ে যে দেশের জন্ম, সে দেশের শিল্পকলার প্রসারে জাতীয় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা শিল্পীসমাজ তথা সকল দেশবাসীর। আমাদের শিল্পকলা শিক্ষার পথিকৃত্ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দূরদর্শিতা, একনিষ্ঠতা এবং বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও কর্মপ্রেরণার ফলেই শিল্পকলার অগ্রযাত্রার সোপান রচিত হয়েছে। শিল্পাচার্যের সুদূরপ্রসারী চিন্তা, দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, প্রজ্ঞা, মেধা ও ভালোবাসায় আমাদের শিল্পকলার চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ শিল্পকলার সাথে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের সেতুবন্ধন তৈরি করতে সহায়তা করেছিল। তাই শিল্পীদের কাছে সকলের চাওয়া ও প্রত্যাশা অনেক। আমাদের শিল্পকলা সারা বিশ্বে মর্যাদার সাথে সমাদৃত হোক—এ প্রত্যাশা সকলের। ১৯৮১ সালের আগে পর্যন্ত একাডেমী আয়োজিত নবীন ও জাতীয় প্রদর্শনীগুলোই শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাত। শিক্ষার্থী শিল্পীরা নবীন চারুকলা প্রদর্শনীতেই বেশি সুযোগ পেতেন। জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষক বা পাস করা শিল্পীদের আধিপত্য ছিল বেশি। শাহবাগসহ গুলশানের কয়েকটি গ্যালারি ছাড়া শিল্পকর্ম প্রদর্শনের আর কোনো ক্ষেত্র ছিল না বললেই চলে। একমাত্র শিল্পকলা একাডেমীর গোল ভবনের নিচতলা ও দোতলার গ্যালারি ছাড়া। চারুকলা অনুষদের গ্যালারিতে প্রদর্শনের সুযোগ থাকলেও নানা কারণে তা বন্ধ থাকত। তাই শিল্পকলা একাডেমীই একমাত্র ভরসা এ দেশের শিল্পী ও শিল্পানুরাগীদের কাছে। এ সময়ে নবীন, জাতীয় ও কিছু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের একক ও যৌথ প্রদর্শনী করেই একাডেমী ব্যস্ত সময় কাটাত। ফলে শিল্পকলা যেন একটি গণ্ডীতে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আধুনিক নিরীক্ষাধর্মী কাজগুলো কেমন বদ্ধ ডোবায় আটকে যাচ্ছিল। জাতীয় পুরস্কারগুলো ধারাবাহিকভাবে ওপর থেকে নিচের দিকে আসত। বোঝা যেত, এরপর কে জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন। ১৯৮১ সালে দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী আয়োজনের ফলে এক নতুন জোয়ারের সূচনা হয়। প্রতি দু-বছর অন্তর এ আয়োজন নবীন শিল্পীদের এগিয়ে নিয়ে যায় সফলতার দিকে। ঝাঁকুনি লাগে শিল্পীর চৈতন্যে, চিন্তায়, মননে, আঙ্গিকে, শৈলীতে, কৌশলে, নিপুণতায়, মেধায়, বিশেষত্বে—নানা বিচিত্রতায়। যেহেতু প্রতিযোগিতামূলক এ প্রদর্শনীতে নানা দেশের শিল্পীদের কাজ প্রদর্শিত হয়, সেহেতু বিদেশ থেকে বিচারক নিয়োগ অনিবার্য। আমাদের দেশের সম্মানিত বিচারকদের সাথে বিদেশি বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারকমণ্ডলীর বিচারকার্য সম্পাদনের ফলেই কিছু অঘটন ঘটতে থাকল প্রচলিত নিয়মের ক্ষেত্রে। প্রথম আয়োজন থেকেই এ দেশের প্রতিভাবান শিল্পীরা পুরস্কৃত হলেন। নতুন নতুন রেকর্ড এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে থাকল আমাদের শিল্পাঙ্গনে। দ্বিবার্ষিক এশীয় প্রদর্শনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন জাগরণের সূচনা হলো, অন্যদিকে জাতীয় প্রদর্শনীর গুরুত্ব দিনে দিনে মলিন হতে লাগল। বিপত্তি শুরু হলো পুরোনো গোল গ্যালারি ভেঙে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে নতুন জাতীয় চিত্রশালা তৈরির পর থেকেই। এই নতুন ভবনটি যেন এক বদ্ধ ইমারত। ভেতরে ঢুকতে আহ্বান করে না। ভেতরে কি যেন ঘটছে অন্ধকারে। শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ নেই সেখানে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতির চূড়ান্ত রূপ গত চতুর্দশ ও বর্তমান পঞ্চদশ এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী। আবদ্ধ করতে করতে একেবারে একই ছাদের নিচে এনে কুণ্ঠিত করা হয়েছে, প্রসারতা ও ব্যাপকতা পায়নি। তবে এই হতাশাজনক আবস্থা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রাণবান ও ঋদ্ধ করতে হবে আমাদের একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীকে। আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের এ আয়োজনে বিগত তেইশ বছরে আংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। আমরা প্রশস্ত হচ্ছি ঠিক, তবে আমাদের উচ্চতা বাড়েনি। আমরা এশিয়া থেকে হাত বাড়িয়েছি আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে, কিন্তু নিজেদের ঘর ভালো গোছাতে পারিনি। সময় এসেছে শিল্পী নির্বাচকদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তনের। সুখের বিষয়, আমাদের শিল্পী ও সমঝদারদের মাথায় এই ইতিবাচক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অনুভূত হচ্ছে। এই অনুভূতিকে পত্রপল্লবে বিকশিত করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতের কর্মপন্থা প্রণয়নের জন্য কিছু প্রস্তাবনা হতে পারে: ১. একাডেমির চারুকলা বিভাগে অতি দ্রুত একজন চারুশিল্পীকে নিয়োগ দিতে হবে। উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক, ডিসপ্লে অফিসার, গ্যালারি ব্যবস্থাপনা অফিসারসহ বেশ কিছু চারুশিল্পীকে নিয়োগ দিয়ে একাডেমির কর্মপন্থাকে আরও বেগবান ও গতিশীল করতে হবে। এ ছাড়া শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ থেকে পাশ করেছেন, এমন একাধিক ব্যাক্তিকে ডিসপ্লে, শিল্পকলা-বিষয়ক প্রকাশনা ও গ্যালারি ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। ২. প্রদর্শনী একই ছাদের নিচে না করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। যেমন: চারুকলা অনুষদ, জাতীয় জাদুঘর, ওসমানী মিলনায়তন ও উদ্যান, শিশু একাডেমী, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, বারিধারা প্রভৃতি স্থানে প্রদর্শনীর আয়োজন করলে উত্সবের আমেজ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া ধানমন্ডি লেক , গুলশান লেক ও সোহরাওয়ার্দি উদ্যানেও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এ দেশের শিল্পীদের স্থাপনাশিল্প প্রদর্শন করা যেতে পারে। ৩. চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী অঞ্চলের শিল্পীদের কাজ নিয়ে আঞ্চলিক প্যাভিলিয়ন থাকতে পারে। ৪. দেশের সব চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাছাই করে শিক্ষার্থীদের কাজের আলাদা প্যাভিলিয়ন থাকতে পারে। কারণ বর্তমান আধুনিক চারুকলা শিক্ষাকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করাও খুব জরুরি। ৫. একটি জাতীয় প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশের শিল্পীদের বাছাই করা কাজ প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে। ৬. প্রত্যেক বিয়েনালের জন্য একটি থিম নির্বাচন করতে হবে। এই থিমটি নির্বাচন করা হবে এ দেশের পথিকৃত্ বা খ্যাতিমান কোনো শিল্পীর কাজ অবলম্বনে। যাঁর কাজ অবলম্বনে প্রদর্শনীর থিম নির্বাচন করা হবে, তাঁর কাজসহ অন্তত তিনজন পথিকৃত্ শিল্পীর কাজ কেন্দ্রীয়ভাবে উপস্থাপন করা হবে প্রদর্শীনের মাধ্যমে। (উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, গত ভেনিস বিয়েনালের থিম ছিল, তিনতরেত্তোর কাজ অবলম্বনে—ILLUMINATION—অর্থাত্, উদ্ভাসন বা দীপন)। আমাদেরটি শুরু হতে পারে জয়নুল, কামরুল বা সুলতানে কাজ অবলম্বনে। ৭. প্রদর্শনী চলাকালে আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলো আরও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে হবে। ৮. সোনার গাঁ লোকশিল্প জাদুঘরকে ঘিরে লোকশিল্প উত্সবটি এ সময়ে করা যেতে পারে। ৯. প্রত্যেক প্রাইভেট গ্যালারিগুলোতে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পীদের কাজের প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য পরামর্শ প্রদান, এমনকি সহযোগিতাও করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ১০. শিল্পকলা-বিষয়ক সকল প্রকশনা প্রদর্শন ও বিক্রয়ের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি লাইব্রেরি থাকতে পারে। এখানে ইন্টারনেট ও ভিডিও প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে। ১১. বিয়েনালের সময়সীমা এক মাসের পরিবর্তে তিন মাস করা যেতে পারে। ১২. এই বিয়েনাল আয়োজনের মাধ্যমে দেশ যাতে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে, সে দিকে লক্ষ রেখে আমন্ত্রিত ডেলিগেটদের পাশপাশি ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপক শিল্পসমঝদারদের আগমনের উদ্যোগ নিতে হবে। ১৩. বিয়েনাল উপলক্ষে প্রাইভেট গ্যালারিসমূহে শিল্পকমের্র দাম নির্ধারণে বিশেষ মূল্য ছাড় দেওয়া যেতে পারে এবং তা শিল্পী ও গ্যালারি কর্তৃপক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ১৪. পুরো সময়ব্যাপী একাডেমীর অন্যান্য বিভাগ, যেমন: নাট্যকলা, সংগীত ও নৃত্যকলার আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। ১৫. সেমিনারকে অফিসিয়াল রিপোর্টিং-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও ব্যাপক, প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে হবে। ১৬. যেহেতু এশিয়া পেরিয়ে আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার শিল্পীরা এই বিয়েনালে অংশগ্রহণ করছেন, সেহেতু একে আরেকটু এগিয়ে ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিয়েনাল’ হিসেবে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তা হলে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে আয়োজনটি আরও মর্যাদাপূর্ণ হবে এবং পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। উপরোক্ত প্রস্তাবনাগুলো কোনো উচ্চাভিলাসী কল্পনা নয়। আন্তরিকভাবে বিবেচনা ও চিন্তা করা হলে এবং সব শিল্পীসমাজকে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে পারলে এর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।