লেখাটা কোত্থেকে শুরু করা যায়! যেদিন থেকে সিনিয়র নির্মাতারা বলে আসছিলেন তরুণদের ছবি দিয়ে তো হলমুখো হয় না দর্শক। এতদিন মোস্তফা কামাল রাজ, স্বপন আহমেদদের এইসব কথাই শুনতে হয়েছে। তারা নাকি ছবি নির্মাণ করতে গিয়ে বড় নাটক তৈরি করে ফেলেন। হয়েছেও তাই। ‘ব্যাচেলর’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এই ধারার ছবিগুলোতে আকার ইঙ্গিতে সুরসুরি ছাড়া তো কিছু পাওয়া যায়নি। আর এই ধারার ছবিগুলো হাতে গোনা দু’চারটে হলে মুক্তি আর টিভি প্রিমিয়ার দিয়ে বীরত্ব দেখানো, অতঃপর ঘরের শোকেস ভর্তি পুরস্কার। আহা! এই তো চলছিল এতদিনের চলচ্চিত্রের উন্নয়ন কার্যক্রম! কিন্তু এই ধারা কে বদলাবে! কার হাত ধরে হবে এই নতুন পদযাত্রা, সেটিই এতদিন সবার মনে কুইজ আকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল। শেষে সেই কুইজের উত্তর দিলেন তরুণ নির্মাতা রেদওয়ান রনি। ছবি রিলিজের আগে থেকেই বলে আসছিলেন আমি পুরস্কারের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্য ছবি তৈরি করব। নাচ-গান-ফাইট সব থাকবে। গত ১৯ ডিসেম্বর স্টার সিনেপ্লেক্সের নতুন হলে হয়ে গেল এর প্রিমিয়ার। প্রিমিয়ারে সাধারণত তারকাদের মিলনমেলা দেখা যায়। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। তবে প্রযোজকের দীর্ঘ প্রবাসযাপনের কারণে টিকেট বণ্টনের সময় নিজের ছবির কলাকুশলীকেও তিনি চিনতে পারছিলেন না, এমনটাই দেখা গেল। হতেই পারে এমন বিভ্রাট! অতঃপর একে একে নির্মাতা, অভিনেতা, মডেল এবং সবশেষে জয়া আহসান হলে ঢুকতেই গেটের কাছাকাছি সৌন্দর্য ব্যক্তিত্ব কানিজ আলমাস খান নিজ হাতে জয়াকে থামিয়ে মেকআপ ঠিক করে দিলেন প্রায় মিনিট খানেক সময় নিয়ে। ফটোসাংবাদিক সামনে থাকলে তা দেখানোর মতোই দৃশ্য ছিল এটি। অতঃপর হলভর্তি মানুষের মাঝে ছবি প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু। উপস্থাপক দেশের সুকণ্ঠী গায়িকা দিনাত জাহান মুন্নি। তিনি ঘোষণা দিলেন সবশেষে নাকি মঞ্চে উঠবেন পরিচালক। কারণ তিনি নার্ভাস। প্রথমে মঞ্চে উঠলেন ছবির তরুণ প্রযোজক সালেহীন স্বপন, তিনি তার ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। এরপর একে একে স্পন্সর অতিথি ও পরিচালকরা উঠলে তাদের বক্তব্য শুরু হয়। কিন্তু মূলধারা বা এফডিসিতে দীর্ঘদিন ধরে যারা সিনেমা নির্মাণের সাথে প্রাণান্ত যুদ্ধ করেছেন সেই শহীদুল ইসলাম খোকন, চাষী নজরুল ইসলাম, মতিন রহমান, মহম্মদ হান্নান, এফ আই মানিক বা কাজী হায়াত যাদের নাম দেখে আমাদের তরুণ বেলার তরুণ মন হলে প্রবেশ করত, তারা কেউই নেই। তবে কী তাদেরকে আমন্ত্রণ তালিকার বাইরে রাখা হলো! তাহলে সেই অভিজ্ঞতার আলোকরশ্মিরা কই! কারণ মঞ্চে যে ক’জন পরিচালক উঠলেন তাদের ভেতর গিয়াসউদ্দিন সেলিমের একটি বাম্পার হিট চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর দু’তিনটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, যার বাণিজ্যিক সাফল্য নেই, আর অনিমেষ আইচের এখনও কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি। তবে কি এখানেও কোনো শ্রেণীবিভাজন তৈরি হচ্ছে? কিন্তু রেদওয়ান রনির কথামতো তো আমরা কমার্শিয়াল ছবিই দেখতে এসেছি। কিছুটা বিভ্রান্তির ঘোর জন্ম নিল।
এরপর উপস্থাপক একজনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন দেশবরেণ্য চলচ্চিত্র বোদ্ধা হিসেবে! উপস্থাপক নিজেই নাকি তার কাছ থেকে চলচ্চিত্র সম্পর্কে জেনেছেন। অথচ আশপাশের তরুণ পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ, নঈম ইমতিয়াজ নিয়ামুল ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ইনি কে? কোন ফিল্ম বোদ্ধা? তাকে তো চিনলাম না।’ আমিও প্রথমে চিনিনি। যাই হোক পরিচয় শুনলাম। জানতে পারলাম তিনি নাকি চলচ্চিত্র বোদ্ধা? তবে কি আহমেদ জামান চৌধুরী, মতিন রহমান, অনুপম হায়াত, যারা ফিল্মের ওপরে হাজারের বেশি লেখা লিখেছেন, পিএইচডি করেছেন তারা কোথায়? কিংবা তাদের বিশেষণের বেলায় এই উপস্থাপক কী বলতেন? জানার বড় আগ্রহ জন্মাল!
যদিও সেই সব বিষয় আজ মুখ্য নয়। আজ ছবি দেখাটাই প্রধান উদ্দেশ্য। মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে ছবি শুরু হলো। শুরুর ২০ মিনিট পর ধাক্কা খেলাম। এ-তো পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল ছবি। টানটান উত্তেজনা। বিভ্রান্তির ঘোর কাটতে থাকল। সিরিয়াল কিলার ইন্দ্রনীল আর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক জয়া আহসানকেও অভিনয় আর অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রিতে ম্লান করে দিয়েছেন অভিনেতা শাহীদুজ্জামান সেলিম। কিছুক্ষণ পরপরই শহীদুজ্জামান সেলিম নয়তো এটিএম শামসুজ্জামানের ডায়লগের মুন্সিয়ানায় মুহুর্মুহু করতালি। পুরো ছবির গল্প আমি এখানে লিখতে চাই না। কারণ গল্পটা দর্শকেরা হলে গিয়েই জানুক। ইন্দ্রনীলের এক্সপ্রেশন ও তার অভিনয়ের জায়গাটিতে বরাবরের মতো অনবদ্য তিনি। আর জয়া আহসান তো প্রমাণিত শুদ্ধ অভিনেত্রী। তার গ্ল্যামার আর চরিত্রের স্বল্প পদচারণায় যদিও সেলিমের চরিত্রের কাছে তিনিও ম্লান হয়ে গেলেন শেষ পর্যন্ত। এখানেই যেন পরিচালকের মুন্সিয়ানা। পরিচালক চাইলে তার নিজের ইচ্ছেমতো মোড় নেবেন, যেকোনো চরিত্রের ওপরে আলো ফেলবেন এই তো স্বাভাবিক। ফটোগ্রাফি দেখে সবাই ধরেই নিলেন এই ছবির ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি দেশের বাইরের। জানা গেল ছবির পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হয়েছে শুধু বাইরে, বাকিটা দেশেই। আর ঢাকা শহরের যে সমস্ত লোকেশন এতদিন দেখেছে দর্শক, এ ছবিতে রনির ক্যামেরার চোখ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন অন্য এক ঢাকাকে। সত্যিই অনবদ্য। বিশেষ করে এটিএম শামসুজ্জামানের সলো শট এবং সোহেল রানার একটি টপ অ্যাঙ্গেল শট দেখলে বারবার মুগ্ধতা তাড়ায় এ দুচোখে। গল্পের কথা বললে তা হয়তো অনেক সহজ এবং দুই লাইনের গল্প মনে হবে। কারণ পুরো মুন্সিয়ানা চরিত্রে আর নির্মাণে।
তবে শেষ দিকে ইন্দ্রনীল কী প্ল্যান নিয়ে ডাক্তার ও সাংবাদিককে কিডন্যাপ করল তার ব্যাখ্যা দিলেন না পরিচালক। এ ছাড়া হতদরিদ্র ইন্দ্রনীল কীভাবে সন্ত্রাসী হয়েও এত সুন্দর ভাষায় কথাবলা ও পেপার পড়ার মতো অক্ষরজ্ঞান অর্জন করলেন সেটিও স্পষ্ট করেননি নির্মাতা। তবে এই সব সমালোচনার জন্য সমালোচনা। পুরো ছবিটি একবাক্যে অসাধারণ বলে হয়তো পরে অনেক কিছু বলা যেতে পারে। খুব আফসোস হয় এত সুন্দর গানের একটিও পুরোপুরি ভিজ্যুয়াল নেই দেখে। আর যেই গানটির দৃশ্যায়ন আছে সেই আইটেম সংটি মনে হলো হঠাত্ উড়ে এসে জুড়ে বসল। আইটেম সং সাধারণত দর্শকদের সিটকে কাঁপিয়ে হলে বসার জন্য মজবুত করে দেয়। কিন্তু এখানে হলো উল্টো। অনর্থক আইটেম সংয়ের চেয়ে জয়া আর ইন্দ্রনীলের রোমান্টিকতা বা প্রেমের বিষয়টা একটা গানের দৃশ্যায়ন দিয়ে স্থায়িত্ব আনতেই পারতেন। আবারও বলতেই হয় এসবই খুটিয়ে দেখা সমালোচনা। সার্বিকভাবে অসাধারণ ছবিতে এভাবে দুই একটি অসঙ্গতির কথা বলাই যায় দর্শক সারিতে বসে।
তাই সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো এ দেশে যখন দুই একজন ছোট পর্দার ভাষা বিকৃতির জনক নির্মাতা হঠাত্ ফিল্ম নির্মাণ করেন শুধুমাত্র পুরস্কারের আশায়। কিংবা কুতুব নগর নামের এক অনালোচিত রাষ্ট্র থেকে ‘কবুতর পদক’ পেয়ে উল্লাসের জোয়ারে ভাসেন। অথচ তাদের ছবি হলে প্রদর্শিত হয় হাতে গোনা দুই একটিতে। তাদের প্রতি এ যেন রেদওয়ান রনির চরম থাপ্পড়। রনি দেখালেন যে, ছবি তৈরি করলে এমনই কমার্শিয়াল ভালো ছবি নির্মাণ করা উচিত। আর ছবির চেহারা বদলাতে হলে কবুতর পদক নয়, দরকার দর্শকবান্ধব এমন চলচ্চিত্র। যা চোরাবালিতে আছে প্রায় অনেকখানি। কে বলবে এটা রনির প্রথম চলচ্চিত্র! সাধুবাদ দিতেই হয় পুরো চলচ্চিত্রের কলাকুশলীকে। প্রযোজক হিসেবে স্বপনকে সাধুবাদ দিলেও অভিনেতা হিসেবে সাধুবাদ দিতে কিছুটা সময় নিতে হবে বৈকি। নয়তো সব ধরনের ডায়লগ তিনি একই এক্সপ্রেশনে দিয়ে ছবিটির কয়েক মিনিট ঝুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
দর্শকেরা টিকেট কেটে গাঁটের পয়সা খরচ করে কেউই অন্যান্যবারের মতো গালমন্দ করবেন না এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর সার্বিক হিসাবে তাই ‘ব্যাচেলর’ বা ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’ বা ‘প্রজাপতি’ নয়, ‘চোরাবালি’ সত্যিকার অর্থেই কমার্শিয়াল ছবির পৃথিবীতে এই তরুণ প্রজন্মের প্রথম বিচরণের রেকর্ড গড়ল। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এরপরপরই মোস্তফা কামাল রাজের ‘ছায়া-ছবি’ ও স্বপন আহমেদের ‘পরবাসিনী’ ঠিক একইভাবে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিতে পারলেই বাংলা ছবির দৃশ্যপট বদলাতে সময় লাগবে না বেশিদিন। এ ছাড়া রনির উদ্দেশে বলা একটাই কথা—একটা ‘মনপুরা’র মতো বাম্পার হিট ছবি দেওয়ার পর কোন শংকায় না সাফল্যের রেকর্ড ম্লান হওয়ার আশংকায় নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম তার নতুন ছবি মুক্তির খবর হচ্ছেন না তা জানা নেই। একইভাবে সালাউদ্দিন লাভলুও তার একমাত্র কমার্শিয়াল ছবি ‘মোল্লাবাড়ির বউ’-এর পর আবারও নাটক পাড়ায় ঘাপটি মেরে আছেন কেন আমাদের জানা নেই। যা ছবি পাগল দর্শকদের জন্য বড় আক্ষেপের উদাহরণ। আমরা যেমন দর্শক বান্ধব চলচ্চিত্রের বাইরে শুধু কবুতর পদকের আশায় ছবি দেখতে চাই না। তেমনি এই অনবদ্য ছবির সাফল্যের পর যেন রেদওয়ান রনি আবারও চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে দূরে না সরে যায় সেই প্রত্যাশাই থাকবে। প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এ ধরনের নির্মাণগুণেই তার সাফল্য। কারণ অনেকে ছবি রিলিজের আগে বড় বড় কথা বললেও প্রজেকশনে এসে দেখা যায় সেই একই গত্বাঁধা বড় নাটকই বানিয়েছেন তিনি। সেদিক দিয়ে রেদওয়ান রনি ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করে আমাদের কাছে প্রত্যাশার ব্যারোমিটারের পারদ যেন আরও বাড়িয়ে দিলেন।
