স্থানীয়ভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণই নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট এবং রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও এই খাতের অবদান রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেশের হাউজিং ব্যবসায়ে গতি মন্থরতা দেখা দিয়েছে। মূলত গ্যাস-বিদ্যুত্ সংযোগের অভাবে বাড়ি নির্মাণ করেও গ্রাহকের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারেনি অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, সরকার ঘোষিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ বাস্তবায়নের খড়গ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নানাবিধ নীতির কারণে এ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেই সাথে রয়েছে নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন এলাকায় জমির আকাশচুম্বি দাম। এ নিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ১৫ ভাগ অবদান রেখেও নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগকৃত দেশের আবাসন শিল্পখাত। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে দৈনন্দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ এবং জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক অধিবাসীর জন্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে বেসরকারি আবাসন শিল্প মালিকরা। শুধু বাসস্থান নিশ্চিত করাই নয়, বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে এই খাত। ফলে দিনে দিনেই সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে আবাসন শিল্প। কিন্তু সরকারি নানা সংস্থার খবরদারি আর অযাচিত হস্তক্ষেপে এমন গুরুত্বপূর্ণ খাতটিও আজ গতিহীন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি পর্যায়ে ইতিবাচক মনোভাব দৃষ্ট হলে মন্থর হয়ে পড়া এ খাতে গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু স্থানীয়ভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণই নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট এবং রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও এই খাতের অবদান রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেশের হাউজিং ব্যবসায়ে গতি মন্থরতা দেখা দিয়েছে। মূলত গ্যাস-বিদ্যুত্ সংযোগের অভাবে বাড়ি নির্মাণ করেও গ্রাহকের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারেনি অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, সরকার ঘোষিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ বাস্তবায়নের খড়গ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নানাবিধ নীতির কারণে এ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেই সাথে রয়েছে নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন এলাকায় জমির আকাশচুম্বি দাম। এ নিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। আবাসন শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নতুন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যমান ইস্যুগুলো নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দেনদরবার করে চলেছে।
গত ২৩ অক্টোবর এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন রিহ্যাব সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে তাদের বিভিন্ন দাবি জানিয়ে পত্র দিয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্রেরিত পৃথক দু’টি পত্রে ভবন নির্মাণের নকশা রাজউক অনুমোদনের আগে রিহ্যাব কর্তৃক অনুমোদনের নিয়ম প্রচলন ও রাজউক আওতাধীন এলাকায় বেসরকারি আবাসিক ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোক্তা নিবন্ধীকরণ রিহ্যাবের হাতে ন্যস্ত রাখার দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসের একপত্রে রাজউক ‘২০১০ সালের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন’ অনুসারে রাজউক আওতাধীন এলাকায় বেসরকারি ইমারত নির্মাণ প্রকল্প উদ্যোক্তাদের রাজউকে নিবন্ধনের আহ্বান জানিয়েছিল। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যেই রাজউকের এখতিয়ার সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। নিবন্ধন এখতিয়ার রহিত করা সময়ের দাবি। অত্যাবশ্যকীয় রিহ্যাব সদস্যপদ, ট্রেড লাইসেন্স, কোম্পানি ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট, ভ্যাট নিবন্ধনপত্র, হালনাগাদ আয়কর প্রত্যয়নপত্র ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ছাড়পত্র থাকার পরও পুনরায় রাজউক নিবন্ধনপত্র সংগ্রহ অত্যাবশ্যকীয় নয়।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ এনামুল হকের কাছে একই তারিখে পাঠানো চিঠিতে আবাসিক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল ব্যবহারের পূর্বশর্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুত্ সংযোগের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে না মর্মে মত প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া গত বছরের নভেম্বর মাসে এই মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক আদেশে বিদ্যুত্ সংযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়। ওই আদেশের কোথাও আবাসিক ভবনে নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সোলার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কিন্তু বাস্তব অবস্থায় কোন প্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেয়ার পরও তাকে সোলার প্যানেল স্থাপনে বাধ্য করছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হতে প্রকাশিত পরিপত্রে নকশাকালীন আবাসিক ভবনে নতুন বিদ্যুত্ সংযোগের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রেখে ভবনের নকশা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ভবন নির্মাণকালীন সময়ে বিদ্যুতের বিদ্যমান উচ্চহার হ্রাস করে ‘বাণিজ্যিক হার’ এবং নির্মাণের পর গ্রাহক পর্যায়ে নতুন মিটার পাওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে ‘আবাসিক হার’ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। এর যুক্তিতে বল হয়, যেহেতু আবাসন খাত শিল্প হিসাবে স্বীকৃত সেজন্য শিল্প সুবিধার শর্ত হিসাবে এই সুবিধা পেতে পারে। এতে দুর্নীতি কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।
স্বরাষ্টমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ক্রেতা বা ডেভেলপার বা ভূমির মালিকের মধ্যে কোনরূপ বিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইনের ৩৬ ধারা অনুসারে রিহ্যাবের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাপ অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এ ধরনের কোন বিরোধ দেখা দিলে সরাসরি থানায় অভিযোগ করা হয়। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে ফলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা সমাধানে এই সংশ্লিষ্ট কোন অভিযোগ থানায় আমলে নেয়ার আগে রিহ্যাবের সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রেরণ করার দাবি জানানো হয়। রিহ্যাব মেলায় রাজউক কর্মকর্তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও হয়রানি বন্ধ করা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ফ্লোর এরিয়া হারের (এফএরআর) মান পুনর্নির্ধারণে রিহ্যাবকে সম্পৃক্ত করার দাবি জানানো হয় রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে। এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে এ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ হবে এবং বর্তমান মন্থর গতিও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবাসন শিল্প মালিকরা বলেন, যে কোন ব্যবসায় সরকার যদি ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা পালন করে তবেই উন্নতি হবে। একেকটি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বর্তমান নানাবিধ সমস্যার কারণে হাউজিং ব্যবসা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অন্য যেসব খাতের উপযোগিতা তৈরি হয়েছে সেগুলোও সমস্যার মুখে পড়বে। উদাহরণ হিসাবে তারা বলেন, বাংলাদেশে আবাসন ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণেই দেশে সিমেন্টসহ অন্যান্য উপখাতের ব্যাপক বিকাশ সাধিত হয়েছে। এদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে স্বল্প সুদে (সিঙ্গেল ডিজিটে) রিহ্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ৯ শতাংশ সুদে গৃহায়ণ খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে যে ঋণ কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল তা আবাসন শিল্পে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ঘোষণার অংশ হিসেবে এই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন এবং ৭ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদানেরও দাবি জানানো হয়। কর জটিলতাও এখাতে সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৯৮৪ সালের বিদ্যমান আয়কর আইনের বিভিন্ন ধারা অনুসারে এনবিআর সম্প্রতি এক আদেশে নির্মাণ শ্রমিকদের (কন্ট্রাক্টর ও সাবকন্ট্রাক্টর) কাছ থেকে উেস কর ও ভ্যাট কর্তন এবং নির্মাণ কাজে ব্যবহূত কাঁচামালের ক্ষুদ্র যোগানদারদের কাছ থেকে উেস কর ও ভ্যাট কর্তনের কথা বলেছ। অথচ সবাই জানে নির্মাণ শ্রমিকদের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের সাথে কার্য সম্পাদনের স্থায়ী কোন চুক্তি হয় না। তাই তাদের কাছ থেকে কোন উেস কর কর্তন সম্ভব নয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র যোগানদারের উেস কর ও ভ্যাট কর্তনের কথাও বলা হয়েছে। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীরা বলেছেন, কন্ট্রাক্ট অব এক্সিকিউশনের ভিত্তিতে স্থায়ী যোগানদারকে ক্রয় আদেশ প্রদান করে তাদের কাছ থেকে উেস কর কর্তন করা উচিত। এ বিষয়গুলো নিয়ে এনবিআরের সঙ্গেও দেনদরবার চালাচ্ছেন রিহ্যাব কর্মকর্তারা।
এছাড়া স্বচ্ছতার চুক্তিপত্রের মূল্য ও নিবন্ধন মূল্যের মধ্যে পার্থক্য নিরসন এবং এলাকাভিত্তিক ফ্ল্যাটের মূল্যের উপর কর কর্তনের আদেশ দিয়েছিল এনবিআর। রিহ্যাব বলছে নিবন্ধন খরচ বিদ্যমান ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করলে চুক্তি মূল্য ও নিবন্ধন মূল্যের পার্থক্য নিরসন করা সম্ভব। ইতিমধ্যে রিহ্যাবের সদস্যদের দীর্ঘদিনের দাবি পাওয়ার অব এটর্নির একতরফা আইন বাতিল করে একটি যুগোপযোগী আইন করা হয়েছে। এতে করে পাওয়ার দাতা বা গ্রহিতার মৃত্যু হলেও পাওয়ারটি বলবত্ থাকবে। এর ফলে এই শিল্পে বিনিয়োগও বাড়বে এবং জটিলতা দূর হলো।
