ফিরে দেখা ২০১২

ক্রিকেট

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৬
টেস্ট র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থেকেই ২০১২ সাল শেষ করতে যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। অপরদিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের মাধ্যমে ২০১২ সালকে স্মরণীয় করে রাখলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সঙ্গত কারণেই বলা চলে ক্রিকেট বিশ্বে বছরটি ছিল প্রোটিয়া ও ক্যারিবীয়দের। ইংল্যান্ড সফরের মধ্য দিয়ে এ বছরের শুরুতেই টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সুযোগ পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের সামনে ছিল ইংল্যান্ড সফরে সিরিজ জিতলেই টেস্ট র্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান পাওয়ার সুযোগ। গত আগস্টে লর্ডস টেস্টে স্বাগতিকদের হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় গ্রায়েম স্মিথের দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষে আসীন হয় দলটি। নিজেদের সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখার প্রত্যয় নিয়েই এরপর অস্ট্রেলিয়া সফর করে স্মিথ বাহিনী। সেখানেও ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে শীর্ষস্থানটি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। শীর্ষস্থানে থাকার পাশাপাশি ১০ টেস্টে অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব গড়ে প্রোটিয়াসরা। এর মধ্যে নয়টিই ছিল বিদেশের মাটিতে। স্মিথ নিজে ২০১২ সাল পর্যন্ত সর্বকালের হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার অধিনায়কত্ব করার কৃতিত্ব দেখান। তিনি এমন একটা দলকে নেতৃত্ব দেন যাদের উপর আস্থা রাখা যায়। দলের তিন ফাস্ট বোলার ডেল স্টেন, মরনে মরকেল এবং ভারনন ফিলান্ডারের অসাধারণ বোলিংয়ের পাশাপাশি চিরযুবা অল-রাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস এবং হাশিম আমলার ব্যাটিং ছিল এ বছর বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে ধারাবাহিক। ক্যারিবীয়রা ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে নিজেদের সোনালী দিনগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর উত্সব করার মতো আর কিছুই করতে পারেনি এতদিন। কিন্তু শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে স্বাগতিকদের হারিয়ে ১৯৭৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পর ক্যারিবীয়দের জন্য এটাই ছিল সর্ববৃহত্ পুরস্কার। ৩৬ রানে জয়ী ম্যাচে সুপারস্টার ক্রিস গেইল ব্যর্থ হওয়ার পর মারলন স্যামুয়েলস ৫৬ বলে ৭৮ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। কিন্তু ‘গ্যাংনাম স্টাইলে’ নাচের জন্য গেইলই হয়ে উঠেন ম্যাচ শেষে সকলের মধ্যমণি। এ বছর ১৪ টেস্টে ১৪৪৪ রান করে শ্রীলংকার মাস্টার ব্যাটসম্যান কুমার সাঙ্গাকারা সেপ্টেম্বরে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন এবং অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক এক বছরে চারটি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার হওয়ার কৃতিত্ব দেখান। সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্টে অপরাজিত ৩২৯ রান দিয়ে বছর শুরু করেন ক্লার্ক। এরপর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এডিলেডে করেন ২১০ রান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে নিজ মাঠে আবারো ডাবল সেঞ্চুরি করেন তিনি। ক্লার্কের অধিনায়কোচিত ইনিংস সত্ত্বেও পার্থে অনুষ্ঠিত সিরিজের শেষ এবং রিকি পন্টিংয়ের বিদায়ী ম্যাচে প্রোটিয়াসদের বিরুদ্ধে ৩০৯ রানের হার এড়াতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ভারতের শচীন টেন্ডুলকারের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক রানের অধিকারী ৩৮ বছর বয়সী পন্টিং জীবনের শেষ ইনিংসে মাত্র আট রান করে টেস্ট ক্রিকেট শেষ করেন ১৩,৩৭৮ রানে। পন্টিং ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও ৩৯ বছর বয়সী টেন্ডুলকার এখনো খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত মার্চে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ম্যাচে সেঞ্চুরি করে নিজের শততম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। রাহুল দ্রাবিড় ও ভি ভি এস লক্ষণ ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও ভারতের সোনালী যুগের একমাত্র ব্যাটসম্যান টেন্ডুলকার এখনো রয়ে গেছেন। বেশ কিছুদিন যাবত্ই টেন্ডুলকারের রান খরার কারণে সমর্থকরাও বেশ হতাশ। ভারতীয় দলে এখন চলছে এক সন্ধিক্ষণ। এ মাসে ভারতে ২-১ ম্যাচে টেস্ট সিরিজ জয় করে ইংলিশরা। ১৯৮৫ সালের পর এই প্রথমবার ভারতকে তাদের মাঠে হারালো সফরকারীরা। এটা ছিল গত আট বছরে নিজ মাঠে ভারতীয়দের প্রথম টেস্ট সিরিজ হার। সিরিজের আগে এন্ড্রু স্ট্রস অবসর নেয়ার পর ব্যাট হাতে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হিসেবে আলিস্টার কুকের নামটি তাই এখন অনেক উপরে। ম্যাচ পাতানোর বিতর্ক বছর জুড়েই ম্যাচ পাতানো বিতর্ক অব্যাহত ছিল। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় পাকিস্তান ও ইংলিশ কাউন্টি দল এসেক্সের সাবেক লেগ-স্পিনার দানিশ কানেরিয়াকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কানেরিয়ার সাবেক সতীর্থ খেলোয়াড় মারভিন ওয়েস্টফিল্ড চার মাস জেল খাটেন এবং ক্রিকেটে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন। অর্থের বিনিময়ে খারাপ পারফরম্যান্স করার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে ইসিবি তাকে এ শাস্তি দেয়। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় জাতীয় দলের বাইরের এক ক্রিকেটারকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এছাড়া গত জুনে আরো চারজনকে লঘু শাস্তি দেয় বিসিসিআই। ভারতেরই একটি টিভি চ্যানেল পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের ছয় আম্পায়ার ম্যাচ গড়াপেটা করতে রাজি হয় বলে প্রচার করার পর আইসিসি প্রাথমিকভাবে ওই ছয় আম্পায়ারকে নিষিদ্ধ করে। তুলনামূলক সুসংবাদ ছিল পাকিস্তানের ক্রিকেটামোদীদের জন্য। গত অক্টোবরে দুইটি প্রদর্শনী টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মাধ্যমে দুই বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করে দেশটি। ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলংকা দলকে বহনকারী বাসে সন্ত্রাসী হামলায় ছয় পুলিশ সদস্য ও একজন গাড়িচালক নিহত হওয়ার পর পাঁচ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা অবস্থায় পাকিস্তান অল-স্টার্স একাদশ করাচিতে আন্তর্জাতিক একাদশের বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। এদিকে ইংল্যান্ডের ভালোবাসা-ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন কেভিন পিটারসেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী পিটারসেন নিজ মাঠে প্রোটিয়াসদের বিরুদ্ধে টেস্টে নিজ দলের তত্কালীন অধিনায়ক এন্ড্রু স্ট্রসের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর কথা স্বীকার করার পর ইংলিশ দল থেকে বাদ পড়েন। প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ইংল্যান্ডের হয়ে সব ঘরানার ক্রিকেটে খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুনরায় দলে সুযোগ পাওয়া ৩২ বছর বয়সী পিটারসেন মুম্বাই দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের বিরুদ্ধে ১৮৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য সবচেয়ে দুঃখের ঘটনা ছিল মার্ক বাউচারের হারিয়ে যাওয়া। সমারসেটের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে একটি বল তার বাঁ চোখে আঘাত করলে তাত্ক্ষণিকভাবে মাঠ ত্যাগ করা উইকেটরক্ষক বাউচার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়তে বাধ্য হন। ক্যান্সারকে পরাজিত করে পুনরায় ক্রিকেটে ফেরা যুবরাজ সিংকে স্বাগত জানায় ভারত। রেকর্ড গড়েন অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার। পার্থে ভারতের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে মাত্র ৬৯ বলে সেঞ্চুরি করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। টেস্ট ক্রিকেটে ১০০ বছরের ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচে ১০ নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করা প্রথম ক্রিকেটারের নজির গড়েন বাংলাদেশের আবুল হাসান। গত নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে ১১৩ রান করে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন হাসান। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েনটি ক্রিকেটে সবচেয়ে কম ৪৫ বলে সেঞ্চুরি করেন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ওপেনার রিচার্ড লেভি। হ্যামিলটনে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে রেকর্ড ১৩টি ছক্কার ইনিংসে ১১৭ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের লেগ-স্পিনার ইমরান তাহির টেস্ট বোলিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ড অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২৫০ রান হজম করলেও উইকেট শূন্যই থাকতে হয় তাহিরকে।—বাসস