নতুনদের আগমনে মাঝে মাঝে আশার আলো উঁকি দিলেও চলতি বছরেও চলচ্চিত্র শিল্প আগের ধারাবাহিকতায় ব্যর্থতার প্রতিনিধিত্ব করেছে। সবকিছু মিলিয়ে এ বছরটিকে সফল বলা না গেলেও বছরজুড়েই বাংলা চলচ্চিত্র শুধু প্রেক্ষাগৃহে নয়, বরং পর্দার বাইরে এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকটা সরব অবস্থানে ছিল। কেননা গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল বছরের শেষের দিকটায়। এ বছরে ব্যবসা সফল চমক সৃষ্টি করা ছবির সংখ্যা অনেকটাই হাতে গোনা বলা যেতে পারে। বছরটি শুরু হয়েছিল ‘মারুফের চ্যালেঞ্জ’ চলচ্চিত্র দিয়ে, আর শেষ হচ্ছে ‘নাইওরী’ চলচ্চিত্রের মুক্তির মধ্য দিয়ে। বছরের অন্যতম চমক ছিল এমএ জলিল অনন্ত প্রযোজিত ও অনন্য মামুন পরিচালিত ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ ছবিটি। অনেকের মতে শাকিবের একাধিপত্য থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ ছিল এটি। যদিও নায়ক এমএ জলিল অনন্তের উচ্চরণগত ত্রুটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এ ছাড়া আলোচনায় আসে ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসার রঙ’ ‘লালটিপ’, ‘দ্য স্পিড’, ‘ডন নাম্বার ওয়ান’সহ আরও দুয়েকটি ছবি। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এ ছাড়া বছর শেষে রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘চোরাবালি’ চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরপরই আলোচনার শীর্ষে চলে আসে। অন্যদিকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নতুন চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’ মুক্তির আগেই বাজিমাত করেছে। জিতে নিয়েছে এবারের ‘এশিয়ান সিনেমা ফান্ড ফর পোস্ট প্রোডাকশন’ পুরস্কার। এশিয়ার সেরা চলচ্চিত্র উত্সব ‘পুসান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর এবারের সমাপনী প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র এমন বিরল সম্মান লাভ করেছে। এ বছরেই শুরু হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক। জাজ মাল্টিমিডিয়া তাদের প্রযোজিত প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসার রঙ’ দিয়ে বাজিমাত করেছে। একসঙ্গে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রায় ৪০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়ে ছবিটি সাফল্য লাভ করে। এ বছর মোট ৫০টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ৩টি বেশি। তবে হতাশার কথা প্রায় ১৫টি ছবি খুব বেশি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। কয়েকটি ছবিকে তো মাত্র একটি বা দুটি প্রেক্ষাগৃহ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
এ বছরের সর্বাধিক ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন শাকিব খান ও সাহারা। এ বছর শাকিব খান অভিনীত ১৩টি এবং সাহারা অভিনীত ৬টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। শাকিব খান অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে—‘আমার চ্যালেঞ্জ’, ‘এক টাকার দেনমোহর’, ‘সে আমার মন কেড়েছে’, ‘মাই নেম ইজ সুলতান’ ইত্যাদি। সাহারা অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে—‘মারুফের চ্যালেঞ্জ’, ‘সন্তানের মতো সন্তান’, ‘খোদার পরে মা’ ইত্যাদি। অন্য নায়কদের মধ্যে কাজী মারুফ অভিনীত ৪টি (‘মারুফের চ্যালেঞ্জ’, ‘রাজা সূর্য খাঁ’, ‘মানিক রতন দুই ভাই’ ও ‘পাগলা হাওয়া’), নিরব অভিনীত ৪টি (‘আই লাভ ইউ’, ‘রাজা সূর্য খাঁ’, ‘তুমি আসবে বলে’ ও ‘আত্মদান’), ডিপজল অভিনীত ৩টি (‘মানিক রতন দুই ভাই’, ‘বাজারের কুলি’ ও ‘স্বামী ভাগ্য’), আমিন খান অভিনীত ৩টি (‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘স্বামী ভাগ্য’ ও ‘নাইওরী’) করে ছবি মুক্তি পেয়েছে। দুটি করে ছবি মুক্তি পেয়েছে যাদের তারা হলেন—অনন্ত (‘দ্য স্পিড’ ও ‘মোস্ট ওয়েলকাম’), ফেরদৌস (‘হঠাত্ সেদিন’ ও ‘জিদ্দি বউ’), ইমন (‘মারুফের চ্যালেঞ্জ’ ও ‘লালটিপ’), অমিত হাসান (‘সন্তানের মতো সন্তান’ ও ‘ভালোবাসার রঙ’)। ১টি করে ছবি মুক্তি পেয়েছে বাপ্পারাজ (মোস্ট ওয়েলকাম), আরজু (অবুঝ প্রেম) ও তৌফিকের (জিদ্দি বউ)। নায়িকাদের মধ্যে ৫টি ছবি মুক্তি পেয়েছে অপু বিশ্বাসের (‘এক টাকার দেনমোহর’, ‘ঢাকার কিং’, ‘দুর্ধর্ষ প্রেমিক’, ‘জিদ্দি মামা’ ও ‘১০০% লাভ :বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না’) ও নিপুণের (‘মারুফের চ্যালেঞ্জ’, ‘বাজারের কুলি’, ‘তুমি আসবে বলে’, ‘ঢাকার কিং’ ও ‘আত্মদান’)। ৩টি করে ছবি মুক্তি পেয়েছে রুমানা (‘স্বামী ভাগ্য’, ‘জিদ্দি মামা’, ‘১০০% লাভ’) ও রেসি (‘আই লাভ ইউ’, ‘মানিক রতন দুই ভাই’ ও ‘বাজারের কুলি’) এবং শাবনূরের (‘আত্মগোপন’, ‘ভালোবাসা সেন্ট মার্টিনে’ ও ‘জিদ্দি বউ’)। দুটি ছবি মুক্তি পেয়েছে পূর্ণিমার (‘আই লাভ ইউ’ ও ‘রাজা সূর্য খাঁ’), রত্নার (‘রক্তে ভেজা বাংলাদেশ’ ও ‘সন্তানের মতো সন্তান’), ১টি ছবি মুক্তি পেয়েছে জয়া আহসানের (চোরাবালি)। সিনিয়রদের মধ্যে মোট ৬টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শীর্ষে রয়েছেন ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা।
এ বছর উল্লেখযোগ্য ৬ তারকার কোনো ছবি মুক্তি পায়নি। এরা হলেন—রিয়াজ, রুবেল, মৌসুমী, পপি, সিমলা, সম্রাট ও জনা। বছরের সর্বাধিক ছবির অভিনেতা ছিলেন মিশা সওদাগর। এ ছাড়া ১৪ জন নতুন নায়ক-নায়িকা এবং ১০ জন নতুন পরিচালকের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এ বছরের সেরা দশ চলচ্চিত্র ছিল ‘মোস্ট ওয়েলকাম’, ‘দ্য স্পিড’, ‘লালটিপ’, ‘ভালোবাসার রঙ’, ‘খোদার পরে মা’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’, ‘সে আমার মন কেড়েছে’, ‘মানিক রতন দুই ভাই’, ‘ডন নাম্বার ওয়ান’, ‘অবুঝ প্রেম’।
২০১২ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের এত উত্থান-পতনের মাঝে আমরা হারিয়েছি এই শিল্পের অনেক গুণী শিল্পীদের। গত ২৩ জানুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গুণী অভিনয়শিল্পী অমল বোসকে, ফাল্গুনের প্রথম প্রহরে আমরা হারাই জনপ্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদিকে, ১৯ জুলাই নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক হুমায়ূন আহমেদকে। এ ছাড়া ২৭ ফেব্রুয়ারি আলমগীর কুমকুম, ১৪ এপ্রিল খান আরিফুর রহমান, ২০ মে সুলতানা জামান, ৮ জুন কবিতা, ২১ জুন ই আর খান মামা, ১৬ জুন মফিজুল হক, ২৬ জুলাই শামসুদ্দিন টগর, ১৬ নভেম্বর সুভাষ দত্ত ও গত ২২ ডিসেম্বর কায়েস আমাদের এই রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নেন ।
মূলত নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে বছরটি শেষ হলেও প্রাপ্তির জায়গাটি অনেকটাই কম। কেননা বর্তমান সময়ের সাথে এই শিল্পটি যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়তো এগোয়নি। কিন্তু বছর শেষে অনেকটা আশার আলো জ্বলে উঠেছে নতুনদের আগমনের মধ্য দিয়ে। নতুনদের মেধাবী চিন্তার উপর ভর করে শিল্পটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে সেই আশাবাদ রইল।
