মি উ জি ক

সংগীতে নতুনের ডাক

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৯
বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংগীত জগত্ তরুণদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। তরুণরা এগিয়েছিলেন সবদিক দিয়ে। তরুণদের বেশি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে; শ্রোতাপ্রিয়তাও পেয়েছে তাদের গান। পাইরেসির ভয়াল থাবায় ২০১১ সাল অডিও অঙ্গনের জন্য খুব বেশি সুসংবাদ বয়ে আনতে না পারলেও এ বছর সে তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল। তাই বলে অগ্রজরাও পিছিয়ে ছিলেন না। তারাও অ্যালবাম করেছেন, তাদের গানও শ্রোতারা শুনেছেন। তবে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল সবখানে। এ ছাড়া মফস্বল শহরগুলোতে ছিল টালিগঞ্জের সিনেমার গানের ধাক্কা। পাশাপাশি মুঠোফোনে অল্প টাকায় অনেক গান লোড করার হিড়িক অন্যান্য বছরগুলোর মতোই ছিল। তো সব মিলিয়ে এ বছরটিকে সমানে সমানই বলা চলে। অন্যান্য বছরের মতো তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন হাবিব ওয়াহিদ। তার সুর-সংগীতে বেশ কয়েকটা অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। আরেক জনপ্রিয় তরুণ কণ্ঠশিল্পী আরফিন রুমি আলোচনায় ছিলেন বিভিন্ন কারণে। যদিও এই বছরে তার নিজের একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়নি। তবে বেশকিছু মিশ্র এবং সিনেমার গানে ব্যস্ত ছিলেন সারা বছর। এই বছরে ন্যান্সির দ্বিতীয় একক ‘রঙ’ প্রকাশিত হয়েছে। অ্যালবামটি শ্রোতাদের মধ্যে খুব একটা আলোড়ন তুলতে না পারলেও অ্যালবামের ‘ঝরাপাতা’ গানটি শ্রোতারা মোটামুটি শুনেছেন। গান গেয়েছেন একাধিক মিশ্র অ্যালবাম এবং সিনেমার প্লেব্যাকে। কনার জন্য চলতি বছরটা অনেক লাকি। তার আগের অ্যালবামের বেশ কয়েকটা গান এই বছরে ব্যাপক সফলতা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ‘বরষা’, ‘ধিমতানা’ ও ‘কাগজের নাও’। গান গেয়েছেন একাধিক মিশ্র এবং সিনেমার প্লেব্যাকে। প্রকাশিত হয়েছে মিউজিক ভিডিওর অ্যালবাম ‘সিম্পলি কনা :দ্য মিউজিক ভিডিও’। মোট নয়টি গান ছিল এই মিউজিক ভিডিওর অ্যালবামে। গানগুলোর শিরোনাম হলো—‘ধিমতানা’, ‘যাই ভুলে যাই’, ‘অপেক্ষা’, ‘ভুল’, ‘পাহারা’, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’, ‘নীলপরী’, ‘জাস্ট ওয়ান ক্লিক’ ও ‘ইওর লাভ’। গানগুলোর সুর ও সংগীত করেছেন বাপ্পা মজুমদার এবং ফুয়াদ আল মুক্তাদির। আর গানের কথা লিখেছেন শাহান কবন্ধ। মিউজিক ভিডিও অ্যালবামটি প্রসঙ্গে কনা বলেন, ‘অ্যালবাম প্রকাশের অনেক আগে থেকেই সবার কাছে খরচের দিকটি নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আসলে আমার কাছে টাকার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি চেয়েছিলাম শ্রোতাদেরকে ভালোমানের একটি মিউজিক ভিডিও উপহার দিতে।’ ২৯ লাখ টাকায় কনার এই মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম তৈরি হয়। হূদয় খান গান দিয়ে না যতটা আলোচনায় ছিলেন তারচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে। ‘হূদয় মিস-৩’ প্রকাশিত হয়েছে এই বছরে। কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি। পড়শীর ‘পড়শী-২’ প্রকাশিত হয়েছে এই বছরে। অ্যালবামের ‘খুঁজে খুঁজে’ গানটি শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় ছিল। এ ছাড়াও তিনি কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গান গেয়েছেন ‘ছেলেটি আবোল-তাবোল মেয়েটি পাগল পাগল’ সিনেমায়। সিনেমার গানে প্লেব্যাক এবং কয়েকটা মিশ্র অ্যালবামে গান গেয়েছেন। তিশমা তার একক অ্যালবাম সিডি আকারে প্রকাশ না করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছেন। অ্যালবামটির নাম ‘এক্সপেরিমেন্ট’। সেই অর্থে পত্র-পত্রিকায় আলোচনায় থাকলেও শ্রোতারা খুব একটা শোনেনি। বাপ্পা মজুমদারের একক অ্যালবাম ‘বেঁচে থাক সবুজ’ দারুণ একটা অ্যালবাম। বোদ্ধা শ্রোতাদের পছন্দ হলেও সবখানে ছড়িয়ে যায়নি গানগুলো। বাপ্পা মজুমদার প্রথমবারের মতো একটি সিনেমার সব গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন। সিনেমার নাম ‘সত্তা’। হাবিব ওয়াহিদ, আরফিন রুমি, হূদয় খানদের পরে যারা মিউজিক করছেন, গান করছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছেন ইমরান। বছরের শুরুর দিকে তানভীর শাহীনের গাওয়া ‘সখিরে সখিরে’ গানটি ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। রিজভী ওয়াহিদের গাওয়া ‘চোখেরই পলকে’, পূজার ‘তুমি আমার’, ঝিলিকের ‘নীলাকাশ’, কিশোরের গাওয়া ‘একা একা ভালোবাসি’ গানগুলো শ্রোতারা গ্রহণ করেছে দারুণভাবে। বছর শেষে নতুনদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়েছিলেন বেলাল খান। তার প্রথম একক ‘আলাপন’ শ্রোতাদের মন ছুঁয়েছে। অ্যালবামটির বেশিরভাগ গান শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় ছিল। নতুনদের মধ্যে আরও যাদের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে তাদের মধ্যে লিজার ‘লিজা পার্ট-১’, নওমীর ‘নওমী’, ঝিলিকের ‘ঝিলিক’, কোনালের ‘কোনাল’স জাদু’, ইলিয়াস হোসেনের ‘না বলা কথা’, মাহমুদ সানীর ‘প্রার্থনা’ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে যে গানগুলো শ্রোতাপ্রিয়তায় উঠে এসেছে তার পেছনে মিউজিক ভিডিওর একটা ভূমিকা রয়েছে। এ বছরে ব্যান্ড শিল্পে খুব বেশি তোড়জোড় না দেখা গেলেও ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ হয়ে শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় ছিল চিরকুট ব্যান্ডের গান ‘খাজনা’ গানটি। এ ছাড়া বেশির ভাগ ব্যান্ডশিল্পীদের মাঝে অ্যালবামের কাজের তুলনায় কনসার্টের ব্যস্ততাই বেশি লক্ষ করা গেছে। কয়েক বছর ধরে সিনেমার গানের অডিও অ্যালবাম এবং সিনেমার গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করলেও এই বছরে সিনেমার গানের অডিও বা গান চলেনি তেমনভাবে। বছরের প্রথম দিকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ছায়াছবি’র অডিও, যদিও একটি গানও শ্রোতাদের স্পর্শ করেনি। ‘চোরাবালি’র ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে ‘চোরাবালি’ সিনেমাটি দর্শক গ্রহণ করেছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ সিনেমার অডিও নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি বছরের শেষ পর্যন্ত। আলোচিত গীতিকার-সুরকারের মধ্যে প্রথমে রয়েছে প্রিন্স মাহমুদ তার ‘অপরাজিতা’ মিশ্র অ্যালবামের জন্য। এই অ্যালবামের ‘ভুবন ডাঙার হাসি’ গানটার জন্য। এরপরে রয়েছেন হাবিব ওয়াহিদ, আরফিন রুমি। হাবিব ওয়াহিদ ‘তুমি সন্ধ্যারও মেঘমালা’, স্বাধীন এবং ন্যান্সির ‘রঙ’ অ্যালবামের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন। আরফিন রুমি ‘মোস্ট ওয়েলকাম’, ‘ছায়াছবি’, নওমী ও পূজার অ্যালবামের সুর ও সংগীত করেছেন। এরপরে রয়েছেন ইমরান। দূরে দূরে ‘আরাধনা’, ‘সখি ভালোবাসা কারে কয়’ গানগুলোর সুর ও সংগীতের জন্য। বেলাল খান নিজের এককসহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন। গীতিকারদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন অনুরূপ আইচ। ইমরান-পূজার ‘দূরে দূরে’, পূজা-আরফিন রুমির ‘তুমি আমার’, পড়শীর ‘খুঁজে খুঁজে’ তিনটি আলোচিত গান তার লেখা। জাহিদ আকবর আরুফিন রুমী-ন্যান্সির ‘ভেজা ভেজা হাওয়া’, নির্ঝর-ইমরানের ‘আরাধনা’, কাজী শুভর ‘মন পাঁজর’ গানের জন্য আলোচনায় ছিলেন। ‘ঝরাপাতা’, ‘অন্তহীন’ গানটির গীতিকার শারমিন সুলতান সুমী। রিজভী ওয়াহিদের ‘চোখেরই পলকে’, বেলাল খানের ‘এক মুঠো স্বপ্ন’ গান দুটি লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন। ঝিলিকের ‘নীলাকাশ’ গানটির জন্য ফয়সাল রাব্বেকীন ও তানভীর শাহীনের ‘সখিরে’ গানটির জন্য পঙ্কজ ছিলেন আলোচনায়। বছর শেষে অডিও বাজার অন্যান্য বছরের তুলনায় মোটামুটি ভালো অবস্থানে থাকলেও ‘মুখে মুখে ফেরা গান’ বলতে যা বুঝায় সে অর্থে তেমন কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে সংগীতাঙ্গনে নতুনদের আগমনী বার্তা এই শিল্পকে আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার পূর্বাভাস মনে করছেন অনেকে।