লালনের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের কালের মিল না থাকলেও স্থানের মিল কিছুটা রয়েছে। দুজনই পদ্মাবিধৌত দক্ষিণপ্রান্তীয় পলিমাটির সন্তান। ভৌগোলিক অবস্থানও খুব দূরে নয়। লালন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। জসীমউদ্দীনও যুগস্রষ্টা পল্লিকবি। দুজনই লোকজীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সাধারণের কাছে গ্রহণীয় করে তা গানে গানে প্রকাশ প্রকাশ করেছেন। জসীমউদ্দীনের কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক পরিচয় ছাপিয়ে গীতিকার পরিচয়টিও কম গৌরবের নয়। জসীমউদ্দীনের গানে আছে লোকজীবনের রূপায়ন ও লোকদর্শনের প্রকাশ। সেখানেই লালনের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের মিল খোঁজা যেতে পারে।
লালনের গানের ভক্ত ছিলেন জসীমউদ্দীন। লালনকে অনুভব করেছেন পল্লিকবির কোমল হূদয় নিয়ে। জসীমউদ্দীনের গান চেনার পেছনে সরাসরি লালনের প্রভাব রয়েছে কি না, তা হয়েতো নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু পরোক্ষ প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে জসীমের রচনায় ব্যক্তিলালনকেও গুরুত্ব পেতে দেখি।
গান গাওয়ার অপরাধে হাজেরা বিবি এবং তাঁর স্বামীকে যখন গ্রামবাসী একঘরে করে রেখেছিল, তখন তাঁরা এসেছিলেন কবি জসীমউদ্দীনের কাছে দেখা করতে। তাঁরা ‘ছোটগাঙের ওপারে হিন্দুপাড়ার কাছে একখানা কুঁড়েঘর তুলিয়া এই গ্রাম হইতে চলিয়া’ যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন কবির কাছে। তখন কবি তাঁদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার গ্রামবাসীরা অন্যায়ভাবে তোমাদিগকে একঘরে করিয়াছে। তোমরা চুরি কর নাই, ডাকাতি কর নাই। শুধুমাত্র গান কর। সে গানও আল্লা-রসুলের কথায় পয়গম্বরদের কথায় ভরপুর। এই গান গাহিয়া তোমরা নানা দুঃখতাপগ্রস্ত গ্রামবাসীদের মনে সান্ত্বনার বাণী আনিয়া দাও। এজন্য যাহারা তোমাদিগকে একঘরে করিয়াছে জনসাধরণকে তোমাদের গানের আনন্দ হইতে বঞ্চিত করিতে চাহিতেছে। আজ যদি তোমরা আমাদের এই গ্রামকে ছাড়িয়া যাও তবে এই অন্যায়কে স্বীকার করিয়া লওয়া হইবে। হাজেরা! তুমিই ত গানে বল, রসুলউল্লাকে লোকে প্রথম একঘরে করিয়াছিল। লালন ফকির, সাল্লাল ফকির, এঁরাও সমাজের হাতে বহু লাঞ্ছনা পাইয়াছেন। হাজেরা তুমিই ত গানে বলে, “লোকের মন্দ, পুষ্পচন্দ অলঙ্কার পইরাছি গায়”। আজ লোকের মন্দ পুষ্পচন্দনের মতো তোমাদের গায় অলঙ্কার হইয়া থাক।’ (জসীমউদ্দীন, হাজেরা বিবি একঘরে হইল, ‘জসীমউদ্দীন : স্মৃতিকথাসমগ্র’ [পুলক চন্দ সম্পাদিত], দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১২, পৃ. ৪৩৬)
লালনের প্রতি লাঞ্ছনার কথা উল্লেখ করে তিনি হাজেরা বিবিকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। লালনকে এখানে তিনি আদর্শ মেনেছেন। লালনের প্রতি এটি জসীমউদ্দীনের প্রবল শ্রদ্ধার প্রকাশ। আমরা বেশ কয়েকটি বিশ্লেষণ করে লালন ও জসীমের সখ্য ও সাম্য বিবেচনা করতে পারি। তাঁদের সখ্য—চেতনা, সাম্য ও আদর্শে। বাণী ও সুরে তা হয়তো স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। এবং সেখানেই দুজনের স্বকীয়তা।
আমরা জানি, ‘তরী’ প্রতীকটি লোকগানে খুব প্রিয় অনুষঙ্গ। বিশাল সংসারসমুদ্রে প্রবল ঢেউ, সেখানে একমাত্র কান্ডারি মুরশিদকে স্মরণ করে জীবনতরী ভাসানোর কথা বলা হয়েছে। তরীকে জীবনের প্রতীকরূপে প্রতিস্থাপন করে লালন লিখেছেন, ‘সামনে তরঙ্গ ভারি/ মুরশিদ বিনে নাই কাণ্ডারী/ লালন বলে ভাসাও তরী/ যা করেন সাঁই কৃপাতে\’ আর একই প্রতীকে কবি জসীমউদ্দীন বলেছেন নদীর ছলছল-কলকল জলের কথা। নদীতে ঢলের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। মৃত্যুর হাত ধরে সর্বনাশা এই তরী বাইতে মাঝিকে সাহস দিয়েছেন। এই উপলব্ধি ধরা পড়েছে সুর ও বাণীতে। জসীম লিখেছেন, ‘ও নাও বাইও বাইও ভাই মাঝিয়ারে।/ ছল ছল কল কল, সুষায় নদীর জল,/ কি করবে শাঙইনা ঢল/ বাও বাও হেইয়া হেইয়ারে।/ ...সর্বনাশা এই তরী, মৃত্যুরে হাতে ধরি,/ আমার এ ভাঙ্গা নাও বাইওরে।’
আবার দুরন্ত তরঙ্গে তরী ডোবার কথা বলে মুরশিদের কাছে লালন আত্মবিলাপ করেছেন। তিনি দেখেছেন চারিদিকে শূন্য, ঘূর্ণিত পাকের জলে তরী দেখা যাচ্ছে না। তারই বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে ভিন্ন ব্যঞ্জনায়—কোথায় এনে আমায় পথ ভুলালে/ দুরন্ত তরঙ্গে তরীখানি ডুবালে\/ তরী নাহি দেখি আর/ চারিদিকে শূন্যকার/ প্রাণ বুঝি যায় এবার/ ঘূর্ণিত পাকের জলে\/ কোথায় রইলে মাতাপিতা/ কে করে স্নেহমমতা/ আমার মুর্শিদ রইল কোথা/ দয়া কর বন্ধু সকলে\
জসীমউদ্দীন বলেছেন, সাবধানে তরী চালাতে বলা হয়েছে মাঝিকে। তরী যে ভাঙা, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে নদীকে বেসামাল করা হয়েছে। আকাশ যেন নেমে এসেছে ঢেউয়ের কাছে। কী অসাধারণ চিত্রকল্প সৃষ্টি হয়েছে জসীমের গানেও। ওপরে আসমান নিচে দরিয়া, তার কূল-কিনারা দেখা যাচ্ছে না, কূলের জন্য কবি কেঁদে আকুল হচ্ছেন। অকূল দরিয়ায় কবি তরী ভাসানোর কথা বলেছেন—তুমি সাবধানে চালাইও মাঝি আমার ভাঙা তরীরে।/ ঢেউয়ের উপর ঢেউ ছুটেছে ঢেউয়ে করি ভর,/ গগন নামিয়া নাচে সেই না ঢেউয়ের পররে।/ আসমান চাইয়া দইরার পানে দইরা আসমান পানে,/ লক্ষ বছর পার হইল কেউ না কারে জানেরে।/ উপরে আসমান নীচে দইরা কারো নাইরে কূল,/ এ ওর কূলের লাইগা কান্দিয়া আকুলরে।/ আমি দেশ হারা কূল হারা হইয়া পরবাসে,/ অকূল দরিয়ায় আমার ভাঙা তরী ভাসেরে।
তরীর প্রসঙ্গ এলে মাঝিও এসে যায় সংলগ্নভাবে। তরী থাকলে মাঝিও থাকে। খুব কাছাকছি হলেও প্রতীকের ভিন্নতায় তরী হতে পারে অবলম্বন আর মাঝি হতে পারে নিয়ামক। লালন লিখেছেন—অকুল পাড় দেখে মোদের লাগরে ভয়/ মাঝি বেটা বড় ঠেঁটা/ হাল ছেড়ে দিয়ে বগল বাজায়\
আর জসীমের মাঝি হলেন রঙিলা নায়ের মাঝি। মেঘের পিঞ্জিরায় পুরে বিজলি পাখি পোষার কথা বলেছেন। জসীমের গানের ভাষায় তারই কাব্যিক প্রকাশ—তুমি কবে খুলিয়া নাও/ আমি যেন জানি রে রঙিলা নার মাঝি!/ ও রঙিলা নার মাঝি!/ মেঘের পিঞ্জিরায় পুরে পুষলাম বিজলী পাখিরে/ পুষলাম বিজলী পাখি,/ আমি আর কতকাল রাখব অনল অঞ্চলেতে ঢাকি।
বাতাস প্রতীকেও দুজনে রচনা করেছেন অনেক গান। লালন লিখেছেন, সাধুর বাতাসে বনের সাধারণ কাঠও সুগন্ধি কাঠ হয়ে যায়। বাতাস এখানে স্পর্শ ও কৃপা অর্থে ব্যবহূত। তিনি বলেছেন—সাধুগুরু কী মহিমা/ দেবে দিতে নাইরে সীমা/ হেন পদে যার, নিষ্ঠা না হয় তার/ না জানি কপালে কী আছেরে\/ সাধুর বাতাসেরে মন/ বনের কাষ্ঠ হয়রে চন্দন/ লালন বলে মন, খোঁজ কী আর ধন/ সাধুর সঙ্গে রঙ্গে দেশ কররে\ বাতাসের একই অর্থে অর্থাত্ স্পর্শ অর্থে ব্যবহার করে কবি জসীমউদ্দীনও গান লিখেছেন। ললিতা সখিকে উদ্দেশ করে কবি জানতে চেয়েছেন, লিলুয়া বাতাসে কেন প্রাণ জুড়ায় না। অর্থাত্, সখির স্পর্শ দিয়ে প্রণয়াস্পদের প্রাণ জুড়ানোর কথা বলা হয়েছে। গানের ভাষায়— ও সখি ললিতে,/ পারবা না বলিতে/ কেন লিলুয়া বাতাসে প্রাণ/ জুড়ন না যায়।
লালন ও জসীমের সংগীতে প্রতীকে-রূপকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাজুয্য আবিষ্কার করা যায়। চেতনাগত ও আদর্শগত সাম্যের কারণেই এই মিল পরিলক্ষিত। দুই যুগের দুই স্রষ্টার এই সাংগীতিক সখ্য ও সাম্য আমাদের সংগীতের ভুবন সমৃদ্ধ করেছে।
