হিমুর বন্ধু হিরু
দেলোয়ার হাসান
প্রকাশক : আবিষ্কার, প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠা :৮০, মূল্য :১৪০ টাকা
সচরাচর উপন্যাস এক নিঃশ্বাসে পড়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। কিন্তু হিমুর বন্ধু হিরু উপন্যাসটি এক নিঃশ্বাসেই পড়ে ফেলতে পারেন যেকোনো পাঠক। উপন্যাসের গর্ভসঞ্চারে নেত্রকোনার হিরু, হিমু—দুটো চরিত্রের আন্তরিক টান ও প্রেক্ষিত নিমগ্নচিত্তের আসর ছেড়ে গাজীপুরের পথ ধরা, পথিমধ্যে কতিপয় ঘটনা। ঘটনার বাড়াবাড়ি, অতিরঞ্জন নেই। আছে কথার শিল্প, যুক্তির ছকে বাঁধা দৌড়। সরল গল্পের আল ধরে হেঁটে যাওয়া, নদীর মতো ভূমি-সমান্তরালে এগোনোর প্রয়াস।
খণ্ড খণ্ড চিত্র এঁকে দেলোয়ার হাসান নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির পরিচয় দিতে সচেষ্ট। মাজার সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার নিয়ে এই এলাকার মানুষ ব্যস্ত থাকে জীবনের কুটিলতা থেকে রেহাই পেতে। ভালো ছাত্র হিমু অভিবাসী জীবনের একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঠাঁই নিয়েছে। তারই টানে বাল্যবন্ধু হিরু ছুটে চলেছে রাতের ট্রাকে মুরগির খাঁচার ওপর বসে। কয়েক ঘণ্টার জার্নি, কিন্তু এরই মধ্যে হিরুর মনপাখী কখনো আকাশে, কখনো মাটিতে উড়ছে। স্তরে স্তরে বিভক্ত চিন্তাশক্তি ছাড়িয়ে গেছে বিদেশের মাটিতে। ঘুড্ডির মতো গোত্তা খেয়ে কখনো পড়ে স্বদেশের সোঁদা মাটির গর্তে, আবার উড়ে চলেছে মেঘবল্লরীর ভাঁজে।
অস্থির রাজনীতি, বিধ্বস্ত যৌবনের মহড়া, অর্থনীতির ধ্বংসাবস্থা, শিক্ষার পঙ্গুত্ব, সংস্কৃতির পচনে বিপর্যস্ত সমাজ লেখককে আলোড়িত করেছে। পিলখানার বি.ডি.আর ট্র্যাজেডি, ১/১১-এর পরিবর্তন; শেয়ারবাজারের অধঃগামিতা, হলমার্ক কেলেঙ্কারী, পদ্মাসেতু, সাগর-রুনি দম্পতি—খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সাম্প্রতিক আবহাওয়া। লেখকের নিজ বাসভূমি শ্যামগঞ্জ কাজলা-কান্দুলিয়ার তৃণমূলে লেপ্টে থাকা সবুজ প্রকৃতির স্পর্শ অনুভব করাতে চেয়েছেন সবাইকে—নেত্রকোনার হাওর-বাওড়ের চারণকবি ও লেখকদের গান, উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন নৈপুণ্যের সাথে। এসবের ভেতর থেকে উদ্ভিন্ন চরিত্র ইসাকের মতো মানুষগুলো বাবার মৃত্যুর পর জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়। সে টিনের ঘর, ভিটেমাটি বিক্রি করে নাপিতে পরিণত হয়। এভাবেই বিলীন হতে দেখা যায় শ্রেণি-চরিত্রগুলো—সংগ্রামের পাথরে মাথা ঠুঁকে আত্মহননের পথ ধরে কেউ কেউ। লেখক আয়নায় দেখেন নুহাশপল্লির মানুষের আকুতি হিরুর বন্ধু হিমুর জন্য। হিমুর ‘চান্নিপসর রাইতের’ আবহে হিরুর সাধারণ জীবনের ‘চান্নিপসর রাইত’ কিংবা ‘বৃষ্টি বিলাসে’ কোনো পার্থক্য নেই। গল্পের কুঁশিকাটার বুননে দেলোয়ার হাসান কখনো প্রবাদ, কখনো গান, কখনো হেঁয়ালীর অনুরণনে পাঠকের ভেতর নাড়াতে বেশি চেষ্টা করেছেন। বন্ধুর জন্য খাক হয়ে যাওয়া বুকের রোদন যেন শ্রাবণের এক একটা নির্ঘুম প্রহর। শেষপ্রান্তিকে হিমুর কবর নুহাশপল্লিতে হবে—এমন তৃপ্তি নিয়ে সোমেশ্বরীর নায়িকামনের দিকে নৌকার হাল ঘুরিয়ে চলেছে, ভালোবাসার টানে।
বইটির ভেতরে আঞ্চলিকতার ছাপচিত্র ব্যবচ্ছেদ করলে শ্যামগঞ্জ অঞ্চলে একদম মাটির ভাষার রূপক, শব্দকল্প, ভাষাশৈলী লক্ষ করা যাবে সহজেই। তবে লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, উপন্যাসের ধারাবাহিকতা ও শব্দচয়নে লেখক আনাড়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বইয়ের শুদ্ধ বাংলার ভেতরে ঢুকে পড়েছে কথ্যভাষার অনাকাঙ্ক্ষিত রূপভেদ। যেমন—‘কাঁদতে কাঁদতে রমিজ বলে, “স্যার—বাগান করতে গ্যা কোদাল ও দা দিয়া তিন চাইর বার হিমু স্যারের পা ও হাত কেটেছে, এই মাটিতে টপটপ কর্যা রক্ত মিশেছে।”’ (পৃ:৪০-৪১)
নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জের কিছু আঞ্চলিক ঠিকানা, ব্যক্তির নাম সরাসরি এসেছে অনেকটা ফিচারের মতো। গাঁজাখোর, নিম্নশ্রেণীর পেশার লোকজনের মধ্যে উপন্যাসে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। পাশাপাশি লেখকের নিজের রক্তে-মাংসে গড়া একখণ্ড মৃত্তিকায় ঘুমানোর আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে হিরুর স্নায়ুবিক যুদ্ধের সাথে হুমায়ূন আহমেদের প্রাণাধিক শাওনের অটলচিত্তের প্রতিবাদের সমিল প্রয়াস লক্ষণীয় বলে ‘হিমুর বন্ধু হিরু’কে খুবই চেনাজানা কাহিনি বলে মনে হয়েছে। রূপক গল্পের মতো উপন্যাসটির ভেতর-বাহির কেবল এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সামনে দুরন্ত মাঠ। সাহিত্য-অঙ্গনের সেই মুক্তমাঠে লেখককে দৌড়াতে হবে দক্ষ দৌড়বিদের মতো।
সবশেষে লেখকের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে উইলিয়াম রাদিচের ভাবনা থেকে বলা যায়—একজন লেখক তখনই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন, যখন তাঁর যেকোনো লেখা, যেকোনো কাজ পাঠককে ভাবিত করে, নাড়া দেয় যেকোনো কারণে—নান্দনিক, আবেগ, অনুভূতি, আধ্যাত্মিক, আদর্শিক বা রাজনৈতিক। আশা করা যায়, ‘হিমুর বন্ধু হিরু’ কিছুটা হলেও পাঠককে নাড়া দিতে সক্ষম হবে। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ গ্রন্থটির সৌকর্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পাঠককে মুগ্ধ করবে।
