সৃষ্টির আলোয় দশ শিল্পী

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১০
‘কায়া’র অভিধানিক অর্থ দেহ বা শরীর। এক দশক ধরে সশরীরের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে গ্যালারি কায়া। সম্প্রতি ‘বর্ন ইন দ্য ফিফটিজ’ বা ‘প্রজন্ম ৫০’ শিরোনামের যৌথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী উপস্থাপন করল গ্যালারি কায়া। পঞ্চাশের দশক মানেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে স্বাধিকার আন্দোলন, মাতৃভাষার জন্য লড়াই, দেশভাগের আর্তনাদ, সংগ্রাম-সাধনা—ইত্যাদি। কাজেই পঞ্চাশের দশক বিশেষ একটি জায়গা দখল করে আছে আমাদের দেশের আমজনতার কাছে। সেই উত্তাল সময়কার ‘তরুণ তুর্কিস’ দল আজ স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। প্রদর্শনীটিতে যে শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন, তাঁরা হলেন—চন্দ্র শেখর দে (১৯৫১), দিপা হক (১৯৫৩), ফরিদা জামান (১৯৫৩), আফজাল হোসেন (১৯৫৪), মোহাম্মদ ইউনুস (১৯৫৪), নাসিম আহমেদ নাদভী (১৯৫৪), তরুণ ঘোষ (১৯৫৪), জামাল আহমেদ (১৯৫৫), কাজী রাকিব (১৯৫৫) ও রণজিত্ দাস (১৯৫৬)—এই দশ জন। প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো জলরং, তেলরং, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্রণমাধ্যমে আঁকা। এ ছাড়া দুটি ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছে দারু ও মেটালের। শিল্পকর্মগুলোতে উদ্ভাসিত হয়েছে শিল্পীদের স্বকীয় ধারা। শিল্পকর্মগুলোতে চলমান জীবন যেমন আছে, তেমনি আছে অন্ত্যজ মানুষ,লোকজ সংস্কৃতি, পাহাড়, নদীসহ বৈচিত্র্যময় ধারা। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়, এ প্রদর্শনীর বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী চন্দ্র শেখর দের কথা। তিনি এঁকেছেন শিরোনামহীন ১, ২, ৩ নামের সিরিজ। সিরিজগুলো অ্যাক্রিলিকে আঁকা। চন্দ্রশেখর দে আমাদের দেশের শিল্পজগতে একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি ছবি আঁকেন গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে; শিল্পে শুদ্ধবাদী। ছবিতে কোনোরকম বাড়তি বুনোট ছাড়াই শুধু রং-তুলি, মনন দিয়ে বুনোট তৈরি করেন। প্রদর্শিত ছবিতে অরগানিক-ইনরগানিক ফর্ম দিয়ে ডেকোরেটিভ স্টাইল তৈরি করেছেন। দিপা হক অকালপ্রয়াত শিল্পী। তাঁর অকাল প্রয়াণ বাংলাদেশের চিত্রকলার জগতে অপূরণীয় ক্ষতি। অত্যন্ত মেধাবী এই শিল্পীর শিল্পকর্মগুলো হলো শিরোনামহীন ২, ৩। ছবিগুলো ক্যানভাসে তেল রঙে আঁকা। ছবিতে প্রাচ্য শিল্পরীতির প্রভাব লক্ষ যায়। শিরোনামহীন অপর ছবিগুলো জলরঙে আঁকা ফিগারেটিভ কাজ। ফরিদা জামান এঁকেছেন মনসুন ২, ৩; ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক। নিজস্ব শৈলীতে পাখি, আকাশ, নদী এঁকেছেন। এ প্রদর্শনীতে অভিনব সংযোজন হচ্ছেন শিল্পী আফজাল হোসেন। তিনি একাধারে অভিনেতা, গল্পকার, প্রচ্ছদশিল্পী। বিচিত্র তাঁর কর্মকাণ্ড। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হচ্ছে নেচার ১, ২, ৩; কাগজে কালি দিয়ে আঁকা। ভাঙাচোরা, লম্বা-কৌণিক বিচিত্র রেখা ও বিন্দু দিয়ে মনোমুগ্ধকর ডিজাইন তৈরি করেছেন মোহাম্মদ ইউনুস। শিল্পের জগতে অতি পরিচিত নাম। তাঁর ‘ইমেজ ফ্রম ৭১’ শিরোনামের ছবিটি পেইন্টিং কোয়ালিটির বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ছবিটি ক্যানভাসে তেল রঙে আঁকা। তিনি দক্ষ বুনোটের শিল্পী; ছবির জমিনে নানান বুনোট তৈরি করে ফর্ম, স্পেস ও শেপ বিভাজন করেন। তাঁর মিশ্রমাধ্যমের অন্য ছবি দুটিও মনোমুগ্ধকর। শিল্পী নাসিম আহমেদ নাদভি সাদাকালোর ক্ল্যাসিক আমেজে জলরং ও কালি দিয়ে প্রকৃতি, বন্যা ও চা-বাগানের ছবি এঁকেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। তরুণ ঘোষের আঁকা বেহুলা সিরিজ ২৩, শিরোনামহীন ৬ ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকা। এ ছাড়া তাঁর দুটি ভাস্কর্য আছে—একটি দারু ও মেটালে করা; মেটাফরিক ফিগারের অত্যন্ত কাব্যিক কাজ। জামাল আহমেদ ল্যান্ডস্কেপ ও ফিগারের অত্যন্ত বলিষ্ট একজন শিল্পী। তাঁর ফ্রিডম নামের প্রতীকী ছবির কথা না বললেই নয়। শান্তির প্রতীক পায়রা মুক্ত আকাশে শান্তির দ্যুতি ছড়াতে চাচ্ছে কিন্তু সে জানে না পাশেই হয়তো লুকিয়ে আছে গুপ্তঘাতক! এ যেন আমাদের স্বাধীনতার সময়কারই প্রতিচ্ছবি। কাজী রাকিব পাখি ও চিঠি শিরোনামে অ্যাক্রিলিকে এঁকেছেন লোকজ ধারার ছবি। রণজিত্ দাস এঁকেছেন ধ্যানমগ্ন মুখচ্ছবি, গ্রামীণ কিশোর-কিশোরী, জীবজন্তু—ইত্যাদি। ছবির জমিনে জ্যামিতিক রেখা ছড়ছড়ে অক্ষরমালা দিয়ে টেক্সচার তৈরি করেছেন। প্রদর্শনীর ক্যাটালগটি অত্যন্ত সুন্দর। তবে প্রদর্শনীতে শিল্পকর্ম দর্শনের পর কোথায় যেন একটু না দেখার আফসোস থেকে যায়—বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ওপর তেমন কোনো ছবি দেখা গেল না বলে। তবে ভবিষ্যতে গ্যালারি কায়া সেই আশা পূরণ করবে—এ প্রত্যাশা রইল।