ক্রিস্টাল আঁধার

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১০
বোধ ও মনের ভাব—এই দুই সত্যকে অতিক্রম করে আত্মসত্য বা নিজসত্য। সাঁইজীর ভাষায় এটি ‘অধর’; বলেছেন, ‘মনাতীত অধর চিনতে ভাষাবাক্য নাহি পারে’। রফিক রনির ‘আঁধারময়তার গল্পকথা’ হচ্ছে নিশ্চিন্তেই ‘অধর’ ধরার একটা খসড়া বয়ান। অন্ধকার ও আঁধার—এই দুই শব্দের মধ্যে ভেদ আছে, অর্থের দিক থেকে, মূলের দিক থেকেও। আঁধারকে উপজীব্য করেছেন বলে রনির ছবিতে আঁধার থাকবেই—এমন কথা নয়। আঁধার মানে হচ্ছে, সেখানে যা-কিছু ঘটছে, সেই সেই ঘটনা বা প্রতীকগুলোর বয়ান। বিবৃতিমূলক নয়, সাংকেতিক। আমরা যদি তাঁর ‘মুড অব সাইলেন্স’, ‘ইমোশন অব ব্ল্যাঙ্ক মেমোরি’ বা এই ধারার কাজগুলো দেখি, তাহলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। রনি তাঁর বর্তমান প্রদর্শনীতে মোট ৭১টি কাজ প্রদর্শন করেছেন দুটি স্থাপনাশিল্প সমেত। আমরা জানি, ৭১ এই সংখ্যাটির একাধিপত্যিক মানে হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু রনি এখানে খুব সচেতনভাবেই আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিতে ৭১-এ যে চিত্রায়ণ হয়েছে, তা পাশ কটিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘শিল্প দেখতে এসে যেন মানুষ সামান্য আনন্দ পায়, চিন্তার সুযোগ পায়। যুদ্ধের বা স্বাধীনতার মরবিড উপাস্থাপনা আমার লক্ষ্য নয়, নান্দনিক বোধ জাগ্রত করাই মুখ্য।’ রনির ৭১টি কাজের ধরন একপাক্ষিকতায় বিন্যাসিত নয়। বিষয়ের দিক থেকে যেমন বৈচিত্র্য এসেছে, ছন্দ তথা প্রকাশভঙ্গিমায় এসেছে নানামাত্রিকতা। মোটাদাগে, তিনটি এক্সপ্রেশনে যার বিভক্তি করা চলে। ‘অনস এ ড্রিমি নাইট’, ‘দ্য অ্যাডাম অ্যান্ড ইভস ইনসাইড দ্য লিরিক্যাল ওয়ার্ল্ড’, এবং ‘সাধকগণ’—এ ধারার কাজগুলোতে তিনি ফিগার ও নৈব্যাক্তিকতার সাথে যুক্ত করেছেন লেখা বা টেক্সট। টেক্সেটের অনুষঙ্গ এসেছে দুটি কারণে। শিল্পী যখন তাঁর সারফেসে বোধসম্পৃক্ত নকশা সমাপ্ত করে বেরিয়ে আসছেন, তখনই তিনি অনুধাবন করছেন বক্তব্য বা যে ইমোশনটা কাজ করছিল, সেটা এখনও পটে চূড়ান্তভাবে ধরা দেয়নি। এমতাবস্থায় তিনি টেক্সট জুড়ে দিচ্ছেন। সেই টেক্সট প্রথমত প্রকাশ্য, অর্থাত্ পাঠযোগ্য হলেও অবশেষে আমরা দেখি, বাক্যগুলো অস্পষ্ট। অর্থাত্, শিল্পী এখানে বোধের দেখা নামক ক্রিয়াটি চান, পাঠ বা পাঠোদ্ধারের পরিণতি আশা করেন না। রঙের ব্যবহারের দিক থেকে উজ্জ্বলতা যেমন আছে, তেমনি ফিগারগুলোর ড্রইং, প্রকাশভঙ্গিমা সাত্ত্বিক। ‘অনস এ ড্রিমি নাইট ৪’ ছবিটির টোনাল ভলিউম জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট এডওয়ার্ড মুঙ্কের ‘স্ক্রিম’ ছবিটির নকশা এবং উডকাট ব্লকের কাটাকুটি টেক্সচারের প্রসঙ্গটি নিয়ে এল। দ্বিতীয়ত, ‘সিটি অব মেমোরি’, ‘মিস্টিরিয়াস সিটি’, ‘দ্য মিস্টিরিয়াস ব্লু মাউন্টেন’, ‘মিডনাইট ফরেস্ট’, ‘দ্য মিস্টিরিয়াস মাউন্টেন-৩’, ‘দ্য হলি লাইট নাইট’, ‘দ্য লিরিক্যাল ফরেস্ট’, ‘এ সেইন্ট অ্যান্ড হিজ নেচার’, ‘দ্য হলি প্যালেস’—এই ছবিগুলো ব্যক্তিক থেকে নৈর্ব্যক্তিকতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। ধর্মীয় স্থাপনা ও ব্যক্তিবর্গের পারস্পরিক সম্পর্কচর্চার দিকটি ফুটে উঠেছে। রং-রেখা ও টোনাল অ্যাপ্রোচ অনেকটাই এক্সপ্রেশনিস্ট হলেও অর্থময়তা সৃষ্টির যে তাগাদা আছে, সেখানে রনি পুরোমাত্রায় উত্তর-অন্তমুদ্রাবাদী। এই সিরিজের রয়েছে আরেক ধরনের আবেদন, যেখানে মাতৃত্ববোধের অলিখিত বয়ান ফুটে ওঠে। ‘সকল জাতি ছিল আদতে এক’ অতএব মাতৃত্বের দিক থেকেও সেই ‘একক’ সকল শিশুর অভয়আশ্রম। ‘গ্রিন মাদার অব হার গ্রিন চাইল্ড’ রৈখিক ও সাংগঠনিক সবুজের ঐক্যে গড়ে উঠলেও নারীর ভিন্নতর উপস্থাপনা আছে ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড-৩’ কিংবা ‘দি অ্যাওয়েটিং হলি বোরাক’ ছবিতে। নারী এখানে সামাজিক বা পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকে গড়ে ওঠা ললনা নয়। নারী এখানে শক্তির রূপক। এই শক্তি অবতরণ করেন বা আবির্ভূত হন। কখোনো সাধকের সঙ্গিনী হিসেবে, কখনও বা সকল শিশুর পুষ্টি বা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে। কিন্তু কোনোভাবেই ভারতীয় পৌরাণিকতার দুর্গতিনাশীনী-রূপে নন। বোরাক যদিও উর্দ্ধগামীতার প্রতীক। কিন্তু রনির ছবিতে এই বোরাক পৃথিবীমুখী। স্পষ্ট কোনো কৌতূহল নেই। অপলক দৃষ্টিভঙ্গি সমেত পার হয়ে যাচ্ছে ভূগোলের সীমারেখা। রনির আরেক প্রকার এক্সপ্রেশন আছে, ‘ইনসাইড এ ব্ল্যাক স্টোরি’, ‘কনভারসেশন বিটুইন ইয়োলো অ্যান্ড রেড’—সিরিজের কাজগুলোতে। ধর্মীয় প্রতীকের বিমূর্তায়ন ঘটেছে এসব ছবিতে। ছবিতে ব্যবহূত রং আমাদের এখানকার বৈষ্ণব, বৌদ্ধ ও সহজিয়াদের ব্যবহূত নানান অনুষঙ্গ থেকে নেওয়া। আঙ্গিকগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সকল ছবিই যেন শিল্পীর ভাষায়, ‘আত্মভুবনের কোনো এক রহস্যময়ী পাঠশালা’য় অধ্যায়নরত। ২১ ডিসেম্বর জয়নুল গ্যালারিতে শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ২৫ ডিসেম্বর।