শরিফুনের ভেতর কাল থেকে একটা দুরন্তপনা শুরু হয়েছে। সোবাহান সর্দারের কাছে সে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারে না। এক দৌড়ে পানিভর্তি মাটির হাঁড়িটা চুলোয় তুলে দেয়। মেজো মেয়েটা এ নিয়ে তিনবার খালাস হতে এল। দুই মেয়েকে জন্ম দিতেই শরীরের জাঁহাবাজ অবস্থা। এবার তৃতীয় জন নামাতে গিয়ে একবারে বিছানায় নেতিয়ে পড়েছে। নিজে তো কাবু হয়েছে, সাথে পুরো বাড়িটাকে কাবু করে দিয়েছে সে। বেদনা উঠেছে দুপুরে। ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার কথা এতক্ষণে। আগের দুবার বুঝতেই পারেনি সে। এবার তা হচ্ছে না। দুুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল ছুটে সন্ধ্যা। ব্যথা বেড়েই চলেছে। ডেলিভারি আর হয় না। সোবাহান সর্দার এখনও তেমন ভয় পায়নি। ভয় পাবার কারণও নেই। তার বাড়িটা এমনিতেই একটা ক্লিনিক হয়ে গেছে। ভালো ডেলিভারি হয় এখানে। ছয় মেয়ে। বছরে কম করে হলেও দুজনের ডেলিভারি হয় তার বাড়িতে। জামাইগুলো সব ছোটলোক। কীভাবে যে সব মিলে গেল! সোবাহন ঠিক বুঝতে পারে না। একজন তো অন্তত অন্যরকম হতে পারত। ভাগ্যের গেঁরো ছাড়া আর কী? বউ সন্তানসম্ভবা হলেই রুটিন হয়ে যায়। ডেলিভারির ঠিক তিন মাস আগে জামাই বাবাজি এক কেজি রসগোল্লা পলিথিনে ঝুলিয়ে গর্ভবতী বৌকে নিয়ে সোজা শ্বশুড় বাড়ি চলে আসে। হারামজাদারা প্রত্যেকেই মাথামোটা। গায়ে খাটা ছাড়া বুদ্ধির কোনো কাজ করতে পারে না কেউ। তাতে কী! ভুস ভুস করে বিড়ি টানা আর তিন-তাস খেলার ওস্তাদ। ডাহাবাজ জামাইদের কথা মনে হলেই সোবাহান সর্দারের মেজাজ-মর্জি খারাপ হয়ে যায়। শরিফুনের জন্য বেশি দূর যেতে পারে না। হাজার হলেও জামাই বলে কথা। শরিফুন তো শরিফুন। মেয়েদের ডেলিভারির সময় এলে ওর ঈদ লেগে যায়। বোকা মহিলা কোথাকার! বাচ্চা নামাতে নামাতে হাত পাকা হয়ে গেছে তার। দুনিয়া বলতে ওই ঘর আর আঙিনা। শরিফুন নামের অশিক্ষিত মহিলাকে দেখে সোবাহানের অবশ্য আফসোসই হয়। কম করে হলেও নির্ঘাত একজন জাঁদরেল নার্স হতে পারত সে। সে যা-ই হোক, সন্ধে যত গাঢ় হতে যাচ্ছে, মেয়েটার বেদনা তত বাড়ছে। সমানে কাতরে চলেছে সে। আর ওদিকে বেলা ডোবার পর থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন আবার বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা ভেবে সোবাহানের কপালের ভাঁজটা আরও গভীর হয়ে যায়। একেই বুঝি কালী সন্ধে বলে! রাত না নামতেই কুটকুটে কালোতে ঢেকে গেছে। এক হাত দূরের জিনিস পর্যন্ত ঠাওর করা যাচ্ছে না।
শরিফুন প্রায় হনহনিয়ে আঁতুড় ঘর থেকে বেরিয়ে এল—কী করবা একন! আতঙ্কিত মুখপানে চেয়ে সোবাহান পরিষ্কার হতে পারে না। শরিফুন দম ছেড়ে ফের হড়বড় করে বলতে থাকে—দাঁইড়ে থাক্যে কী দেকিচ্ছ! মিয়ের অবস্থা তো ভালো না, সমানে রক্ত ভাঙতিছে। অ্যাভাবে রক্ত-পানি ভাঙবের থাকলে চরাত পড়ে মা-ছোয়াল দোনোজনাই মরবি। পিত্ত থেকে উঠে আসা রাগটা সোবাহান চাপা দিতে পারল না। প্রায় চেঁচিয়ে উঠল—হারামজাদা ব্যাক্কলের বাচ্চা, বউওক দিয়ে খালাস হয়া গ্যাছে। শালাক খালি একবার পাই! পরের কথাটা বলতে গিয়ে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল সে। জামাইকে শালা বলা উচিত হচ্ছে না তার। বেফাঁস কিছু বলার পর মানুষ যেমন আশেপাশে তাকিয়ে দেখে নেয়, ফালতু কথাটা কেউ আবার শুনল কি না, সোবাহানও সেই রকম মনে করে কাউকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু শরিফুনকে পেল না। শরিফুন নিশ্চয়ই আবার আঁতুড় ঘরে ঢুকেছে।
এখন কী করবে সোবাহান! ওদিকে হামলে পড়ছে আকাশ। আর দেরি করা যায় না। ভ্যানওয়ালা রমজানকে পেতে হবে। কোনোমতে পাঞ্জাবি গায়ে ঠেলে দিয়ে পঞ্চাশ টাকার একটা কমলা রঙের নোট পকেটে ঢুকিয়ে কাঁচা উঠোন মাড়িয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটা দেয় সে। হাত পঞ্চাশেক যাবার পর বিরাট শব্দে বাজ পড়ল। শব্দের দমকে সে খানিক কেঁপে উঠল বটে; কিন্তু থামল না। রমজানের বাড়ি পেতে পেতে তুমুল ঝড় শুরু হয়ে গেল। পড়িমরি করে দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধামাধাম কিল বসাতে লাগল সে। দরজা খুলল রমজানের বউ। ভয়ে প্রায় ডুকরে উঠল সে—ইঙ্কে বাদলার মদ্দে ভাইজান, আপনে! সোবাহান ব্যাখ্যায় যাবার কূল পেল না, গলা তুলে হাঁক ছাড়ে—ভ্যান লাগবি, মিয়ের অবস্তা খারাপ, রমজান কুন্টি? রমজানের বউ হইহই করে ওঠে—হায় আল্লাহ, মতিনের বাপ তো বাড়িত নাই। রাতত গ্যারেজে থাকপি, ভ্যানের কাম করপি। এবার সত্যি সত্যি সোবাহানের মাথায় বাজ পড়ল। আর কোনো কথা নাই। রমজানের বউ হায় হায় করতেই থাকল। সোবাহান সেদিকে তাকানোর সময় পেল না; অনেকটা নেড়ি কুকুরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে কাঁদা-জল ভেঙে আকাশ থেকে নামা চমকের আলো-আধারিতে জেগে ওঠা পথ ধরে বাড়ির দিকে ফিরতে থাকল।
ফেরত আসার পর সে যা জানতে পারল, তা হলো—এর মধ্যে মেয়ে একবার জ্ঞান হারায়ে ফেলেছিল। এখন আবার চোখ মেলে তাকাইছে। সোবাহান এবার আর মানাছিনা মানতে পারল না। সোজা আঁতুড় ঘরে ঢুকে গেল। মেয়েটা কুণ্ডলী দিয়ে কোঁকাচ্ছে। শ্যামলা রঙের কাঁথাটা রক্ত-পানিতে চাপ চাপ হয়ে গেছে। মেয়েটার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে। সোবাহান কাউকেই কিছু বলতে পারল না, ঘর থেকে বেরিয়ে সটান কলতলায় চলে গেল। তারপর ফরজ গোসল সেরে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল। এমনিতেই সে নামাজি লোক, কিন্তু আজ এসব টানাটানির মধ্যে পড়ে নামাজ কাজা হয়ে গেছে। দুই রাকাত নফল আদায় করে সে আবার আঁতুড় ঘরে ঢুকল। নাহ, কোনো পরিবর্তন নেই। মেয়েটা আগের মতোই কুণ্ডলী দিয়ে কোঁ কোঁ করছে। পরিবর্তন যা হয়েছে, তা হলো, শরিফুন জয়তুন বেওয়াকে ডেকে এনেছে। এই বুড়ি হাতে করে টাকি মাছের ভর্তা মতন সবুজ রঙের গাছান্ত পয়াম নিয়ে এসেছে। সোবাহানের মাথায় কিছুই কাজ করছে না। এই ভর্তা গেলালে কী হবে, কে জানে। অগত্যা হনহন করে বারান্দায় চলে গেল সে। তারপর টংয়ে বসে বেখেয়ালিতেই বিড়ি ধরাল, যা হবার হোক, বাউড়-বাদলার মদ্দে কেছো তো করবের নাই, আল্লাহ ভরসা। খামোখা দৌড়াদৌড়ি না করে লাগোয়া বেড়ায় ঠেস দিয়ে ক্ষণেকের জন্য ঝিম মেরে গেল সে। মিনিট বিশেক হয়নি। এর মধ্যেই শুনতে পেল, মেয়ের স্রাব বন্ধ হয়েছে। সোবাহান বিড়বিড় করে উঠল, আল্লাহ তোক ধন্যবাদ, রাইতটা কোনো মতে পার করে দে, খোদা। খোদার দরগায় ভরসা রেখে সোবাহান আর নতুন করে কোনো উত্তেজনা দেখাল না। এতক্ষণে ঝড় কমলেও বৃষ্টির তোড় বেড়েছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন বিরাট পুকুর উপুড় করে ঢেলে দিচ্ছে তার চালের ওপর। সোবাহান বুঝতে পারছে, এ বৃষ্টি সহজে ছাড়বে না। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর যা-ই হোক, রাতটা তাঁকে জেগে জেগেই পার করতে হবে। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে কেবল সে-ই। আজ যদি হামার অ্যাডা পোলা থাকত, আহ। হাহাকার ভাবটা বেশি দূর উঠতে পারল না। নিজের প্রতি এক ধরনের অভিমান জমতে শুরু করল। এই পোলা পোলা করে আজ ছয়টা মেয়ে হয়েছে। আসলে সোবাহান সর্দারের পুরো জীবনটাই কেটেছে অভাবের মধ্যে দিয়ে। নিজের জীবনের গল্পে সে যেতে চায় না। আপনিতেই গল্প এসে ঘুরঘুর করতে থাকে মাথায় চারপাশে। আরও একটা বিড়ি ধরায় সে। তারপর কষে টান দিয়ে ভাবতে থাকে। সত্যিই তো, একটা মানুষের সারা জীবন অভাব থাকার কথা নয়! অভাব দিয়ে জীবন শুরু হলেও একসময় অভাব থাকে না। কিন্তু সোবাহনের! তাঁর বাবাও অভাবী ছিল। কপাল না কর্মের দোষে আজ এই অবস্থা, তার হিসাব মেলাতে পারে না সে। আজ যে পরিবারে এত খানেওয়ালা, এই বুড়োবয়সেও যে তাকে নাকাল হয়ে দৌড়ে বেড়াতে হচ্ছে। এর জন্য দায়ী কে? যুক্তি খুঁজতে গিয়ে আবার সেই পূর্বপুরুষের কথা মনে পড়ে তার। সোবাহানরাও আট ভাই-বোন ছিল। বাপের জমিজমাও বেশি ছিল না। টানাপোড়েনে সংসার চলেছে। জমি ছিল দাদা লোকমান সরদারের। জমি থাকলে কী হবে, আলগা শখ ছিল ব্যাটার। গ্রামে গ্রামে যাত্রা করে বেড়াত। এদিকে দুই বউ মিলে আঠারো জনের হাতীর সংসার। তবুও কিছুটা সামাল দেয়া যেত, কিন্তু সে নিজে তো ফুলবাবু ছিল! বাপের জমি বেঁচে পোদ্দারি করা ছাড়া খড় ছিড়ে দুই ভাগ পর্যন্ত করত না সে। ফলে দুশ বিঘা কমতে কমতে পঁয়ত্রিশে ঠেকল। তবুও ভালো যে, বুড়ো ইন্তেকাল ফরমাইছিল। আরও কিছু দিন বেঁচে গেলে কিছু অবশিষ্ট থাকত না। ভাগে ভাগে যেতে যেতে সোবাহানের পাতে পড়েছে দেড় বিঘা। তিন মেয়ের বিয়ে দিতে এক বিঘা শেষ। সোবাহান থেকে ওপরের দিকে উঠে গেলে কারও কোনো অক্ষরজ্ঞান পাওয়া যাবে না। সোবাহান মক্তবে গিয়ে ক-ব কিছু শিখেছিল। এখন নাম সই ছাড়া আর কিছু জানে না।
পূর্বপুরুষের দোষ দিয়ে কী লাভ! নিজেকেই দুষতে থাকে সোবাহান। কী দরকার ছিল পনেরো বছর বয়সে বিয়ে করার। বাপের শখ হয়েছে, তাতে কী! আর বউও একখান উর্বরা পাইছিল সে। বছর মিস নাই। নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিতে থাকে সে—ছাগল কুণ্ঠেকার, একন মাথা চাবাও ক্যা, কুঁতে কুঁতে ছোল জম্ম দিবের সোময় হুঁশ ছিল না? শরিফুনকেই কী বলা যায়! সোবাহানের চেয়েও কম বোঝে। সন্তান জন্ম দেয়া আর বছর বছর মেয়েদের সন্তান খালাস করার জন্যই সে এ পৃথিবীতে এসেছে। বারবার এক কাজ করতে গিয়ে সে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে গেছে। শরিফুনের জ্ঞান-বুদ্ধি যতই হাঁটুর সমান হোক না কেন, ওর ওপর কোনোভাবেই রাগতে পারে না সোবাহান। মনে মনে বরং একধরনের মমতাই বোধ করে সে। অভাব মেটাতে গিয়ে সে-ও তো কম নিচে নামেনি। মনে আছে, দুবেলা খাবার জোগাতে শরিফুন মাঝেমধ্যেই পরের বাড়িতে ধান সেদ্ধ করে, কাপড় কেঁচে, মাড়াই করে এক-আধ কেজি চাল জোগাড় করে আনত। অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, কথাটা খাঁটি। এমনও হয়েছে যে, শরিফুন পরের জমি থেকে সুযোগ বুঝে আবডালে লাউ পেঁপে কাঁঠাল ইত্যাদি আঁচলের তলে করে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কথায় আছে, দশ দিন চোরের এক দিন গেরস্থের। দু-তিনবার ধরাও পড়েছিল সে। ক্ষুধার মধ্যে থাকতে থাকতে সোবাহান একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে যে, অভাব বাড়লে ক্ষুধা বেড়ে যায়, আর মনটা ক্রমে ক্রমে ছোট হয়ে যায়। একসময় লজ্জাটাও হয়তো কমে যায়। সে নিজেও তো লজ্জার সাথে আপোস করেছে! সংসারের পেটে ভাত দিতে সে-ও তো এক রাতে মোকাব্বরের খুলিতে ঢিবি দিয়ে রাখা ধানের পালা থেকে কেজি বিশেক সরিয়ে এনেছিল। ভাগ্য ভালো যে, সে শরিফুনের মতো ধরা খায়নি। ধরা পড়লে কী যে হতো! জামাইদের সামনে এ বয়সে মুখ দেখাত কেমন করে। আর বেশি দূর ভাবতে পারল না সে। লজ্জার ব্যাপারগুলো মনে হলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভাবনা থেকে মুখ তুলে সে আবার বিড়ি ধরায়। লম্বা টান দেয়। অন্ধকারে বিড়ি টেনে মজা পায় না সে। ধোঁয়া ছাড়ার সময় যদি দেখাই না গেল, তাহলে কী খাচ্ছি, বুঝব কী করে? আলো জ্বালাবার উপায় নাই। একটা হারিকেন জ্বলছে কেবল আঁতুড় ঘরে। ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডবে এ কয় ঘণ্টা কিছুই শুনতে পায়নি সে। এক দিক থেকে ভালোই হয়েছে। শুনতে পেলেও কিছু করার ছিল না। খামোখা টেনশন বাড়ত। এমনিতেই এলোমেলো ভাবনায় মাথাটা ভরে আছে তার। এখন আর আগের মতো বৃষ্টি নেই। চানাচুরের মতো হালকা তালে চলছে। সোবাহান অবশ্য উঠে গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসতে পারে। সে ওঠে না। কাছাকাছি থেকেও সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার একটা আলাদা নেশা আছে। সেই নেশাটাকে এখনই ছাড়তে চায় না সে।
কখন যে ঝিমুনি ধরেছিল, বুঝতেই পারেনি সোবাহান। ঢলে পড়তে গিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে সামলে নেয় সে। তন্দ্রাকালটাও সে ঠিক নির্ণয় করতে পারে না। চারদিক খুব নীরব হয়ে আছে এখন। বৃষ্টি থেমে গেছে। আবছা অন্ধকারের ভেতরেই সোবাহান টের পাচ্ছে কলতলার পেয়ারাগাছটা কলাগাছকে সাথে নিয়ে উপুড় হয়ে পড়েছে। আঙিনা ভর্তি হয়ে গেছে গাছগাছালির পাতায়। আঁতুড় ঘরে থেকে ভেসে আসা সামান্য টুংটাং ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। কত রাত হতে পারে? সোবাহান আন্দাজ করতে চায়, পারে না। অন্ধকারের সাথে মিশে থাকে সে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে দেশলাই বের করে বিড়ি ধরায়। আগের মতো লম্বা টান দিতে থাকে। ওদিকে নীরবতা ভেঙে মোরগ ডেকে ওঠে। তার মানে সকাল হতে বেশি বাকি নেই। এবার ওঠা দরকার। মেয়েটার খোঁজ নেয়া দরকার। ভাবলেও মনটা সায় দেয় না। একটা জোলাপ টাইপের আলস্য গায়ে-হাতে-পায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আধবোঁজা চোখে সে একমনে উত্তর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের সামনেই দৃশ্য পাল্টাতে শুরু করে। আস্তে আস্তে অন্ধকারের পর্দা উঠছে। পরিবর্তনের ছায়াছবিটা সত্যিই অন্যরকম। বালি গোলানো পানি যেমন ধীরে ধীরে থিতিয়ে যায়, আর ক্রমেই পরিষ্কার হতে থাকে ওপরের জল—তেমন। ভোর হবার ব্যাপারটাও তা-ই। অন্ধকার যেন রাত্রির শরবত থেকে নেমে যাচ্ছে। ধীরে, তারপর অন্ধকারটা দ্রুত সরতে থাকে। প্রথমে ঝাপসা পাহাড়ের মতো সুপারির বাগানটা জেগে ওঠে। বাগানকে ফলো করে বাড়িঘর, গাছগাছালি, মসজিদ—সবকিছু একের পর এক জাগতে থাকে। সোবাহানের কাছে মনে হয়, সবকিছু যেন পানির মধ্যে ডুবে ছিল। এখন আলো পেয়ে জেগে উঠছে। রোজ ফজরের নামাজ পড়লেও আজ পর্যন্ত ব্যাপারটা নজরে এল না কেন, নিজের বোকামির সাথে ভোরের এই মাধুর্যময় সৌন্দর্য মেলাতে গিয়ে সে মুগ্ধ হয়ে গেল। মুগ্ধমুখেই সে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল। সে যেন মৃত, এবং শরিফুনকে খুঁজতে গিয়ে দেখল সে-ও তার মতো মারা গেছে অনেক আগেই। কিন্তু কী আশ্চর্য! তারা দুজনেই স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেয়েদের বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছে। মেয়েরা তো দেখা যাচ্ছে খুব সুখী হয়েছে। ইতিমধ্যেই তারা তাদের মেয়েদের বিয়ে-শাদিও দিয়েছে। শুধু কী তাই, নাতনিরাও কেউ কেউ সন্তানের মা হয়ে গেছে। ছয় মেয়েই শরিফুনের মতো কন্যাসেবিকা হয়েছে। এত জনগোষ্ঠী দেখে দুশ্চিন্তার পরিবর্তে বেশ আনন্দই লাগছে সোবাহানের। নিজকে এখন তার তালগাছের মতো একাকী মনে হচ্ছে না। বরং সে যেন ডালপালামণ্ডিত পল্লবিত বিশাল কোনো ছায়াবান বৃক্ষ, যার শাখায় শাখায় ফুল ফুটে আছে, ফল ধরে আছে। স্বপ্নের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে সে সেই পল্লবিত বৃক্ষতলায় এসে দাঁড়াল। খুব ক্লান্ত লাগছে এখন তার। পা-জোড়া পাথরের মতো ভারী। ঠিক করল, গাছের নিচেই আরাম করে শুয়ে পড়বে সে। কিন্তু শুতে গিয়েও পারল না। একটানা ঝাঁকুনি হতে লাগল। ধাক্কার চোটে গাছটাও একসময় উধাও হয়ে গেল। শরিফুন হাত ধরে একনাগাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে চলেছে—কী হছে তোমার, ঘুমত থাকলে চলবি? তোমার নাতনি হছে, যাও দ্যাকো। কী সোন্দর চান্দের লাগান। শরিফুনের হাতে যেন সময় নেই। স্বামীকেও সে পরোয়া করে না বরং কথাগুলো কানে ঢুকিয়ে চঞ্চলা হরিণীর মতো দ্রুতপায়ে রাস্তা পার হয়ে উত্তর পাড়ার দিকে খবরটা ছড়িয়ে দিতে চলে যায়। সোবাহানের স্বপ্নের ঘোর পুরোপুরি কাটে না। ঘোরের মধ্যেই সে শুনতে পায় সদ্যোজাত নাতনির কান্না।
